Main Menu

সিলেটে দুই বোনের মৃত্যুর ঘটনায় মা-ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ, অপমৃত্যু মামলা

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: সিলেট নগরীর মজুমদারীর কোনাপাড়ার ৩১ নম্বর বাসার ছাদ থেকে দুই বোনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) এয়ারপোর্ট থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

এ ঘটনায় নিহত দুই বোনের মা ও দুই ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এয়ারপোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির এ তথ্য জানিয়েছেন।

খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে আরো সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। পুলিশ কাউকে আটক না করলেও নিহতদের মা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে জানান ওসি।

এদিকে, ময়নাতদন্তের পর মঙ্গলার রাত ১০টার দিকে মজুমদারিতে নিহত দুই বোনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নগরের হযরত মানিকপীর (রহ.) গোরস্তানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় তাদের আত্মীয় স্বজন ছাড়াও এলাকাবাসী অংশ নেন। এ ঘটনায় নিহতদের স্বজন ও পরিচিত মহল এখনো শোকাহত।

গত মঙ্গলবার ভোরে পুলিশ নগরীর মজুমদারি কোনাপাড়ার ৩১ নম্বর বাসার ছাদ থেকে দুই বোনের লাশ উদ্ধার করে। তারা হলেন, মজুমদারি এলাকার মৃত কলিম উল্লার মেয়ে রানী বেগম (৩৮) ও ছোট বোন ফাতেমা বেগম (২৭)। তারা একই পিলারের আলাদা দুটি রডে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ঝুলছিলেন বলে জানায় পুলিশ।

নিহত দুই বোনের মধ্যে রানী বেগম বড় ও ফাতেমা বেগম ছোট। এর মধ্যে রানী বেগম নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা এবং ফাতেমা বেগম অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এই বাসায় তাদের মা, দুই ভাই ও তারা তিন বােন থাকতেন। এক বােন বিয়ের পর যুক্তরাজ্যে চলে যান। প্রবাসী ওই বোনের টাকায় চলতো তাদের সংসার।

স্থানীয়রা জানান, তাদের পরিবারের সব সদস্যই চাপা স্বভাবের ছিলেন। তাদের সঙ্গে আত্বীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের যােগাযােগ কম ছিল। তাছাড়া তাদের পরিবারে কলহ লেগেই থাকতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ পিপিএম বলেন, দুই বােনের লাশ উদ্ধারের পর প্রতিবেশী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানা গেছে, তাতে বিয়ে শাদি নিয়ে তাদের মধ্যে একটা হতাশা থাকতে পারে। তাদের অনেক বয়স হলেও বিয়ে হচ্ছিল না।

আজবাহার আলী শেখ আরও বলেন- তাছাড়া, তারা নানা কারণে অনেকটা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। দু’বােনের মৃত্যুর পেছনে ভূমি সংক্রান্ত কারণও থাকতে পারে। তবে, আমরা এখনই কোনো বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। বিষয়টি নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত প্রয়ােজন।

এদিকে, মঙ্গলবার রানী ও ফাতেমার লাশ উদ্ধারের পর তাদের ভাই শেখ রাজন সাংবাদিকদের বলেন, বিয়ের আলাপ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ‘রাগ ও ক্ষোভ’ থেকে এই চূড়ান্ত পথ বেছে নিতে পারেন তারা। এর মধ্যে রাণীর প্ররোচণায় ফাতেমা আত্মহত্যা করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রানী ও ফাতেমা ঘরে দরজা লাগিয়ে শুধু ক্রাইম পেট্রলসহ বিদেশি টিভি চ্যানেলের সিরিয়ালগুলো দেখতেন- এমনটি উল্লেখ করে রাজন বলেন, ‘একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল গত রোববারে। বরের বয়স একটু বেশি, পঞ্চাশ। লন্ডনি, দুই বাচ্চার বাবা। সে (রানী) বিয়েতে রাজি নয়, ঘরে ঝগড়া করছিল। আমরা তাকে বলি- বিয়ের প্রস্তাব মাত্র এসেছে, বিয়ে তো আর হয়ে যায়নি। আস্তে আস্তে কনে দেখাবো; হলে হলো, না হলে নাই।’

রাজন বলেন, ‘এ নিয়ে সে ঝগড়া করে মায়ের সাথে। বোনের সাথেও ঝগড়া করে। পরে রাতে (সোমবার) ঝগড়া করে সে চাচার বাসায় (একই এলাকায়) চলে যায়। প্রায়ই ঝগড়া হলে এভাবে চাচার বাসায় চলে যায়, সেখানে থেকে আসে। আমরা ভেবেছি, চাচার বাসা থেকে সে সকালে আসবে। এইপর্যন্ত আমাদের শেষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) ভোর ৫টায় পাশের বাসা থেকে ডাকাডাকি করে বলে, আমাদের ছাদে মানুষ লটকে আছে। তখন আমরা দৌড়ে ছাদে যাই। গিয়ে দেখি দুজনের ঝুলন্ত মরদেহ। আমি মরদেহ নিচে নামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবাই বলেন, পুলিশ আসুক।’

এক প্রশ্নের জবাবে রাজন বলেন, ‘তারা রাগ করে এমন কাজ করেছে। আমার যে বড় বোন রানী, তার খুব বেশি রাগ। তার মাথায় সমস্যা আছে। সে ভালো মানুষ এলেও ঝগড়া করে, আত্মীয়স্বজন এলে ঝগড়া করে। ডাক্তার বলেছে- তার মাথায় সমস্যা, তাকে নিয়ে কেউ কোথাও যেও না।’

‘সে (রানী) আমার আরেক বোনকে (ফাতেমা) নিয়ে মরার কথা বলেছিল। সে বলেছিল, মরবো যখন গা-ঘর জ্বালিয়ে মরবো। বিয়ের আলাপ আসায় তার হিংসে ঢুকেছে যে, আমি বিয়ে করবো কেন। তার মাথা গরম হয়ে যায়। সে নিজে নিজে ফাঁসি লাগিয়ে আমার বোনকে নিয়ে মরেছে।’

রানী-ফাতেমার ‘আত্মহত্যার’ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের চাচাতো ভাই আমাকে যেটা বললেন যে, সোমবার রাতে নাকি দুই বোন দা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে চাচার বাসায় যান। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, তাদের সমস্যা কী হয়েছে? চলো, আমিও তোমাদের বাসায় যাবো। তখন ওই দুই বোন নাকি বলেছে, তুমি যেও না; গেলে তোমাকেও তারা মারবে। এই ‘তারা’ আসলে কারা? কে তাদেরকে মারতে চেয়েছিল?”

লোদী বলেন, ‘এই বাসায় সোমবার রাতে আসলে কী হয়েছিল, কেনইবা তারা আশ্রয়ের জন্য বেরিয়ে গিয়েছিল, তাদের হাতে দা কেন ছিল, এরপর আশপাশের লোকজন মঙ্গলবার ভোরে তাদেরকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছাদে দেখতে পায়। বিষয়টি নিয়ে আসলে আমি বলতে পারবো না, বলাটা সমীচীনও হবে না। ময়নাতদন্তের পরই জানা যাবে, আসলে কী হয়েছিল। তদন্তসাপেক্ষে বেরিয়ে আসবে, এই ঘটনার সাথে কারা জড়িত, কী কারণে ঘটনাটি ঘটেছে, কারাইবা তাদেরকে সোমবার রাতে বাসা থেকে বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, কেনইবা তাদের হাতে দা ছিল, তা পরিষ্কার হবে।’

কাউন্সিলর লোদী বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে। তারা তাদের বক্তব্যে একই জায়গায় থাকছেন না। তারা এই এলাকার আদি বাসিন্দা, কিন্তু এলাকায় তাদের সেরকম কোনো সামাজিক সম্পর্ক নেই। একধরনের আইসোলেটেড জীবনযাপন করে তারা। ঘটনাটি শুনে আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।’

 

Share





Related News

Comments are Closed