Main Menu

রায়হান হত্যা: এসআই আকবরসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বরখাস্তকৃত ইনচার্জ পুলিশের উপ পরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে রায়হান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।

বুধবার (৫ মে) সকাল ১১টায় পিবিআই তদন্তকারী দল সিলেট কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাসের কাছে মামলার অভিযোগপত্রটি হস্তান্তর করে। অভিযোগপত্রে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ ৫ পুলিশ ও আকরকে পালাতে সহযোগীতাকারি কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল্লা আল নোমান নামের এক যুবকসহ ৬জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। নোমানের বিরুদ্ধে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সিসিটিভির হার্ডডিস্ক বদল করার অভিযোগ রয়েছে। নিহত রায়হান আহমদ (৩৩) নগরীর জালালাবাদ থানাধীন নেহারিপাড়া এলাকার বাসিন্দা।

চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদ উজ জামান জানান কোর্ট পুলিশ মামলাটি ভার্চুয়াল আদালতে উপস্থাপন করবেন।

চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, টুআইসি এসআই হাসান আলী, এএসআই আশেকে এলাহী, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও আব্দুল্লাহ আল নোমান। এদের মধ্যে নোমান ছাড়া সবাই কারাগারে রয়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেন কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাস। তিনি বলেন, বহুল আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র পিবিআই পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। করোনাভাইরাসের কারণে আদালতের কার্যক্রম ভার্চ্যুয়াল পদ্ধতিতে চলার কারণে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হচ্ছে না। পিবিআই দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে এসআই আকবরসহ ৫ পুলিশকে অভিযুক্ত করেছে। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জের আব্দুল আল নোমান নামের আরেকজন যুবককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৫জন কারাগারে থাকলেও নোমানকে পলাতক দেখানো হয়েছে অভিযোগপত্রে।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম এ ফজল চৌধুরী জানান, পিবিআই দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে আপাতত কোন অসংঙ্গতি চোখে পড়েনি। তবে অভিযোগপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র তুলার পর বিস্তারিত জানা যাবে। এরপর অভিযোগপত্র নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

জানা যায়, গত বছরের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে টাকা আদায়ের লক্ষ্যে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে বর্বর নির্যাতন চালানো হয় রায়হান আহমদের ওপর। এসআই আকবরের নেতৃত্বে তার হাতের নখ তুলে নেওয়া হয়। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টে রায়হানের শরীরে ১১১টি আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমন বর্বর নির্যাতনে মারা যান রায়হান। মৃত্যুর পর ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা চালায় বন্দর ফাঁড়ির পুলিশ। রায়হানের পরিবারের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও আদালতে আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিতে টাকার জন্য ফাঁড়িতে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি উঠে আসে। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে হেফাজতে মৃত্যু নিরোধ আইনকে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন।

যেভাবে হত্যা করা হয় রায়হানকে
সিলেট নগরীর আখালিয়া নিহারিপাড়ার বাসিন্দা রায়হানকে গত বছরের ১০ অক্টোবর রাতে নগরীর বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। কাষ্টঘর সুইপার কলোনি থেকে তাকে ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে যান এই ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ও তার সহকারীরা। এরপর কয়েক ঘণ্টা চলে নির্যাতন। শেষ রাতে এক পুলিশ সদস্যের মোবাইল থেকে নিজের চাচাকে ফোন করে রায়হান। এসময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে দ্রুত ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে আসার জন্য চাচাকে অনুরোধ করে। ১১ অক্টোবর ভোরে ফজরের নামাজের পূর্ব মুহূর্তে টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে হাজির হন চাচা। তবে তখন তাকে রায়হানের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এরপর সকালে আবার চাচা ফাঁড়িতে গেলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসুস্থ হয়ে পড়ায় রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরে হাসপাতালের মর্গে গিয়ে রায়হানের মরদেহ দেখতে পায় পরিবার।

রায়হানের মৃত্যু জানাজানি হওয়ার পর পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন রায়হান। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে। বন্দর বাজার ফাঁড়ির কর্মকর্তা ও সিলেট মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ১১ অক্টোবর সকাল থেকে গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশ হয়।

রায়হানের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যখন খবর প্রকাশ হয়, তখন ভিন্ন তথ্য নিয়ে সামনে আসে নিহত যুবক রায়হান আহমদের পরিবার ও আখালিয়া এলাকাবাসী।

রায়হানের বাসার সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে তারা জানান, ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে টাকার জন্য নির্যাতন চালিয়ে রায়হানকে হত্যা করেছে পুলিশ।

পরিবারের এমন বক্তব্য গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ হয়। এতে পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন। আর পরিবার ও এলাকাবাসীর মাধ্যমে শুরু হওয়া রায়হান হত্যার বিচার দাবিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো সিলেটজুড়ে।

এদিকে, ফাঁড়িতে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর মহানগর পুলিশের পক্ষে থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ ৪ পুলিশ সদস্যকে ১২ অক্টোবর সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। এর আগে ১১ অক্টোবর রাতেই হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। এরপর আরও চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর কোতোয়ালি থানা থেকে এই মামলা তদন্তের ভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই তারা রায়হানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্তের উদ্যোগ নেয়। দুই ময়না তদন্ত রিপোর্টেই রায়হানের শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

এরপর পিবিআই বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করে বন্দরবাজার ফাঁড়ির কর্মকর্তা এসআই হাসান আলী, এএসআই আশেকে এলাহি, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, কনস্টেবল তৌহিদ মিয়া ও কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস। এদের সকলকেই আগে বহিষ্কার করে সিলেট মহানগর পুলিশ।

এদিকে, সাময়িক বহিষ্কার হওয়ার পর পুলিশ, লাইনে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় পালিয়ে যান বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই (বহিষ্কৃত) আকবর হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ ওঠে।

নানা সমালোচনা ও তীব্র আন্দোলনের মুখে গতবছরের ৯ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত থেকে আকবরকে গ্রেপ্তার করে সিলেট জেলা পুলিশ। ভারতে পালানোর সময় সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে আটক করে বলে সেসময় জানিয়েছিলেন সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন।

তবে আরেকটি সূত্র জানায়, ভারতের সীমান্তের ভেতরে স্থানীয় খাসিয়ারা আকবরকে আটক করে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে এসে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। আকবরকে কানাইঘাট সীমান্তের ওপারে ভারতের একটি খাসিয়া পল্লীতে আটকের একটি ভিডিও ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়ে।

আকবরকে গ্রেপ্তারের পরদিন ১০ নভেম্বর তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পিবিআই। এরআগে এই ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য পুলিশ সদস্যদেরও রিমান্ডে নেওয়া হয়। তবে রিমান্ড শেষে তারা কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি।

হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত মাস পর আজ বুধবার এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র পুলিশের প্রসিকিউশন শাখার কাছে অভিযোগপত্রটি দাখিল করে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদ-উজ জামান বলেছেন, অভিযোগপত্রটিতে যাতে কোনো খুঁত না থাকে, যাতে তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে এজন্য তদন্তে সবগুলো দিক খতিয়ে দেখা হয়েছে। এ কারণে কিছুটা সময় লেগেছে।

তিনি বলেন, আলোচিত এ মামলাটির আসামি পুলিশ হওয়ায় একটি নির্ভুল, ত্রুটিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য চার্জশীট তৈরি করতে কিছুটা সময় লেগেছে। এছাড়া করোনার বিরূপ পরিস্থিতির কারণেও কিছুটা দেরী হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ অক্টোবর রাতে রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে মারধরের এক পর্যায়ে রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়লে ১১ অক্টোবর ভোরে সিএনজি অটোরিকশায় করে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রায়হানের শরীরে একাধিক লাঠির আঘাত পাওয়া যায়।

Share





Related News

Comments are Closed