Main Menu
শিরোনাম
জামালগঞ্জে সড়কের পাশে চালকের লাশ!         মৌলভীবাজারে বিএনপি নেতা মাতুক গ্রেফতার         সিলেটে করোনায় আরও ১ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৫১         সিলেটে মোটরসাইকেল খাদে পড়ে কলেজ ছাত্রের মৃত্যু         ছাতকে পুকুর থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার         বিশ্বনাথে এক প্রেমিকার সাথে ২ প্রেমিকের বিয়ে!         কুলাউড়ায় প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় প্রবাসী নিহত         আজমিরীগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষে যুবক নিহত         কানাইঘাটে ট্রাক্টর উল্টে দুই শিশু নিহত         সিলেটে করোনায় আরো ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৬২         ঈদের ছুটিতে চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন ৩দিন বন্ধ         সিলেটে করোনায় আরও ২ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ৭৪        

কোভিড যোদ্ধা ডা: মঈন উদ্দিনের মৃত্যুর এক বছর

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাসের আগ্রাসনের শুরুতে দেশে চিকিৎসকদের মধ্যে এবং সিলেটে করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যুবরণ করেন ডা. মো. মঈন উদ্দিন।

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্তের খবর দেয় সরকার। পরের মাসে ৫ এপ্রিল বিকেলে জানা যায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। সিলেটে করোনা আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। শুরুতে তাঁকে বাসায় রেখেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ৭ এপ্রিল তাঁর অবস্থার অবনতি হলে সিলেটে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। পরিবারের সিদ্ধান্তে পরদিন বিকেলে তাঁকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ১৫ এপ্রিল সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে তিনি মারা যান।

ডা. মো: মঈন উদ্দিন ১৯৭৩ সালের ২ মে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুল থেকে পাঠশালা পাশের পর তিনি ধারণ নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৯০ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। একই বছর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে ১৯৯৮ সালে কৃতিত্বের সাথে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন।

মেডিসিন বিষয়ে এফসিপিএস, কার্ডিওলজি বিষয়ে এমডি ডিগ্রিধারী ডা. মঈনের বাবা মুনশি আহমদ উদ্দিন ছিলেন একজন পল্লী চিকিৎসক।

২২তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি ওসমানী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

ডা. মঈন উদ্দিন সিলেটে করোনা যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা ছিলেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উদ্যোগে গঠিত সিলেট করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। এর আগে তিনি এ হাসপাতালের ডেঙ্গু প্রতিরোধ কমিটিসহ আরো কয়েকটি কমিটির দায়িত্ব পালন করেন।

ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী চৌধুরী রিফাত জাহানও একজন চিকিৎসক। সিলেট নগরীর পার্কভিউ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক। তাঁদের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলের বয়স ১১ বছর ও ছোট ছেলের বয়স ৮ বছর।

এদিকে, ডা. মঈন উদ্দিনের মৃত্যুর পর সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণের ৫০ লাখ টাকা পায় তাঁর পরিবার। গত ঈদুল আযহার পরপরই সে টাকা ডা. মঈন উদ্দিনের স্ত্রী চৌধুরী রিফাত জাহানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডা. মইন উদ্দিন মারা যাওয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি স্থানীয় এক সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে স্বামী সম্পর্কে তার স্ত্রী ডা: রিফাত অনেক স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি জানান, শহীদ ডা: শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তির পর সেখানে তার এক্সরে করানো হয়। এরপর তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করতে না পারায় তারা অ্যাম্বুলেন্সযোগেই তাকে নিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা দেন। অ্যাম্বুলেন্সে স্বামীর পাশেই ছিলেন তিনি। এমনকি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তিনি ছিলেন স্বামীর পাশে। স্বল্পভাষী ডা: মঈন হাসপাতালের বেডে স্ত্রীর সাথে তেমন কথা না বললেও তাকে কেবল মাথায় হাত বুলাতে বলতেন। জানালেন, মারা যাওয়ার আগের দিন তিনি বাথরুমে যান। বাথরুম থেকে ফেরার পর তিনি কিছুটা অস্থিরতা করতে থাকেন। এরপর ১৫ এপ্রিল ভোরে মারা যান তিনি।

ডা: রিফাত জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার দিন-ডা: মঈনের খাটে (বিছানায়) যে বিছানার চাদর ছিল, সেই চাদরটি আজো বিছানায় বিছিয়ে রেখেছেন ডা: রিফাত। পাশাপাশি তার নামাজের স্থানটিও রাখা হয়েছে অবিকল। তিনি (ডা:) যে স্যান্ডেল ব্যবহার করতেন-সেই স্যান্ডেলটিও রাখা হয়েছে তার বিছানার নিচে। অশ্রæভেজা কণ্ঠে ডা: রিফাত জানালেন স্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থেই তার এমন পদক্ষেপ।

সিলেটের বেসরকারি পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (চলতি দায়িত্ব) ডা: রিফাত জাহান অশ্রুসিক্ত নয়নে জানান, বাবার অনুপস্থিতিতে তার দুটি অবুঝ সন্তান জিহাদ ও জায়ান সবচাইতে বেশী কষ্ট পাচ্ছে। ছোট ছেলে জায়ান একটিবারের জন্য হলেও বাবাকে দেখতে চায়। কিন্তু, মা হিসেবে তিনি অনেক সময় তাদেরকে সান্তনা দেয়ার ভাষাটিও হারিয়ে ফেলেন।

ডা: রিফাত জানান, মৃত্যুর পর সবাই তার স্বামীর প্রশংসা করেছে। একটি লোকও তাকে খারাপ বলেনি-এটাই তার সান্তনা বলে যোগ করেন তিনি।

গত বছরের ৫ এপ্রিল আইইডিসিআর থেকে তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। এরআগে ৩০ মার্চ থেকে তিনি তার বাসায় কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে ৭ এপ্রিল সিলেট নগরীর শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে করোনা আইসোলেশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। ৮ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে এ্যাম্বুলেন্সযোগে দ্রত ঢাকায় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)-এ নেয়া হয়। আইসিইউতে থাকা অবস্থায় ১৫ এপ্রিল বুধবার সকালে পৌনে ৭টায় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রথমে ঢাকায় দাফন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও পরিবারের ইচ্ছায় তা পরিবর্তন করা হয়। ঢাকার লাশ দাফনকারী প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পক্ষ থেকে ডাক্তার মঈন উদ্দিনকে গোসল দেয়া এবং মরদেহে কাফন পরানো হয়। ওইদিন রাত ৮টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে ডা. মঈনের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি ছাতক উপজেলায় নেওয়া হয়। রাত সাড়ে আটটায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধিমালা অনুসরণ করে জানাজা শেষে নিজ গ্রামে বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় ডা. মঈন উদ্দিনকে।

তার মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক ডা: আবুল কালাম আজাদ তাকে দেশের প্রথম কোভিড যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়।

 

0Shares





Related News

Comments are Closed