হত্যাচেষ্টার এক বছর: এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরেনি খাদিজা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: আজ ৩ অক্টোবর। ২০১৬ সালের এদিন বিকেলে সিলেটের এমসি কলেজে ডিগ্রী (পাস) পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে আসার পথে পুকুরপাড়ে হামলার শিকার হন খাদিজা। এসময় চাপাতির এলোপাতাড়ি আঘাতে খাদিজার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার সময় স্থানীয়রা বদরুলকে আটক করে গণধোলাই দেন। পরে শাহপরান থানায় সোপর্দ করেন। এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে ওই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায়ই বদরুলকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়। এবছরের ৮ মার্চ সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের চিারক আকবর হোসেন মৃধা আসামি বদরুলকে অভিযুক্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। বদরুল এখন কারাগারে আছেন।
মামলা দায়েরের পর বিচারিক প্রক্রিয়ার ১৩২ দিনের মাথায় আলোচিত এ রায়টি ঘোষণা করেছিলেন বিচারক। এমনকি ৩০ পৃষ্টায় পুরো রায়টি আদালতের বিচারক মামলায় লিখে ঘোষণা করেন।
কারাগার সূত্রে জানা যায়- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত হওয়াতে বদরুল আলম কারাগারে সেই সাজা ভোগ করে যাচ্ছেন। সাজা অনুযায়ি বদরুল কারাগারে বাগানে মালির কাজের পাশাপাশি উৎপাদন শাখায় কাজ করছেন নিয়মিত। এছাড়াও কারাগারের রাইটারের কাজও করছেন বদরুল।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল জানান- যাবজ্জীবন আসামী হয়ে কারাগারে যেভাবে বদরুলের থাকার কথা সেভাবেই বদরুল রয়েছেন।
বদরুলের সিলেটের আইনজীবী সাজ্জাদুর রহমান বলেন- হতে পারে মামলাটি উচ্চ আদালতে আপিলে রয়েছে। তবে এ সম্পর্কে কোন তথ্য আমার জানা নেই।
সিলেট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন- শুনেছি আলোচিত এ মামলাটির রায়ের ব্যাপারে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। উচ্চ আদালতেও যেন বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে এই প্রত্যাশা রাখি। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে খাদিজা হত্যা চেষ্টা মামলায় রায় ঘোষণা একটি দৃষ্টান্ত। এমনকি সেই আলোচিত মামলার রায়ও বিচারক মামলায় লিখে ঘোষণা করে আরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর খাদিজাকে যখন চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছিলেন বদরুল তখন সকলের মনোযোগ ছিল খাদিজার দিকে, কখন প্রাণ জাগবে অচেতন নার্গিসের। সিলেট থেকে ঢাকায় স্কয়ার পরে সাভারে সিআরপির প্রতিটি দিনের আপডেট সকলে জানতো।
হত্যা চেষ্টা মামলার বাদী খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বলেন- সিলেটে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। উচ্চ আদালতেও যেন বদরুলের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের রায়টি বহাল থাকে এই প্রত্যাশা টুকু আমাদের পরিবারের চাওয়া।
তিনি জানান- খাদিজা শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনও সুস্থ নন। তার চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। খাদিজার পড়াশুনা এখনও শুরু হয়নি। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান- চিকিৎসকরা জানিয়েছেন খাদিজা পুরোপুরি সুস্থ হতে আরো ৮-১০ মাস সময় লাগবে। তারপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
আদালত রায় ঘোষণার সময়-‘নারীরা এখন আর বেগম রোকেয়া কথিত অন্দরমহলের অবরোধবাসিনী নন’ উল্লেখ করে আদালত বলেছিলেন, তবে এখন নারীরা অরক্ষিত। নারীরা পদে পদে নিগৃহীত, হত্যা ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এজন্য আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও মানসিকতা দায়ী। আদালত উল্লেখ করেন, প্রেম চিরন্তন। প্রেমে মিলন, বিরহ থাকবেই। কিন্তু প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এমন পৈশাচিক, নৃশংস আচরণ কাম্য নয়।
৩০ পৃষ্ঠার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, খাদিজা ‘অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তী নারী’। চাপাতির নৃশংসতায় ক্ষতবিক্ষত খাদিজা দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মৃত্যুর কাছে হার না মানা বিশ্ব নারীসমাজের প্রতিভূ। আর কোন বখাটে ভবিষ্যতে এধরনের কাজ করবে না উল্লেখ করতে গিয়ে আদালত বলেন, বদরুলের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের মাধ্যমে ‘প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হাজার হাজার উত্যক্তকারী’ ভবিষ্যতে এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবে।
জানা যায়- ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বদরুল। ওই বছরের ৮ নভেম্বর খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার এসআই (সাবেক) হারুনুর রশীদ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।
১৫ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট গৃহীত হয়। ২৯ নভেম্বর আদালত বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন। ৫ অক্টোবর বদরুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠান আদালত। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদরুলকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। মামলায় ৩৭ সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত।
সাক্ষ্য প্রমাণের মাধ্যমে বদরুল আলমের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন দন্ড দেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর খাদিজার অবস্থার উন্নতি হলে ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর তাঁকে সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) ভর্তি করা হয়। ঢাকায় দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটে নিজ বাড়িতে ফেরেন খাদিজা বেগম।
কেমন আছেন হিং¯্রতার শিকার খাদিজা বেগম?
জানা গেছে, এখনো পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠেননি তিনি। বাম হাত ও পা এখনো ঠিক হয়নি তার। মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে ওঠেননি। তার দিন পার হওয়ার কথা ছিল কলেজে, লাইব্রেরিতে বা পড়ার টেবিলে। অথচ এখন সারা দিন তিনি সময় পার করেন হাত আর পায়ের ব্যায়াম করে। তার এখন একটাই চেষ্টা, সুস্থ্য হয়ে ওঠা ও ভালভাবে বাঁচা।
খাদিজার বড় ভাই শাহরান হক শাহীন খদিজার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানান, সে (খাদিজা) এখনো পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠেনি। বাম হাত ও পায়ে এখনো সমস্যা অনুভব করে। বলতে গেলে শরীরের বাম অংশে এখনো সমস্যা রয়ে গেছে। যদিও প্রতিদিন সে ব্যয়াম করছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চিকিৎসার ফলোআপের জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, ‘এখনো সে সুস্থ্য হয়ে উঠেনি। এ জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এখন নিজে নিজে ব্যয়াম করে আর ছোট ভাইকে পড়াচ্ছে। এভাবেই তার দিন পার হচ্ছে। তবে আশা করছি আগামী শিক্ষাবর্ষে তাকে আবার কলেজে পাঠাতে পারব।’
রক্ষণশীল যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠা খাদিজার পড়ালেখা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর বন্ধ হয়ে যেত। তবে শাহীন চাইতেন তার বোন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। সহশিক্ষায় পরিবারের আপত্তি থাকায় খাদিজাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় সিলেট মহিলা কলেজে। শাহীন জানান, এখনো তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আছে। তাই তাকে পড়ানোর চিন্তা আছে।
এর আগে স্কয়ার হাসপাতালে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে খাদিজা বেগমও জানিয়েছিলেন তিনি সুস্থ্য হয়ে আবারো কলেজে যেতে চান। পড়ালেখা শেষ করে ব্যাংকার হতে চান।
২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর যখন খাদিজাকে স্কয়ার হাসপাতালে আনা হয়, তখন চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তার গ্লাসগো কোমা স্কেল (জিসিএস) বা জ্ঞানের মাত্রা ছিল মাত্র ৬; যেখানে ১৫ থাকতে হয়। তার মাথার খুলির হাড় (স্কাল বোন) থেতলানো এবং গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এবং তা মিডলাইন থেকে সরে গিয়েছিল। এ অবস্থা থেকে খাদিজাকে বাঁচিয়ে তোলা চিকিৎসকদের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন চিকিৎসকেরা। মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর স্কয়ার হাসপাতাল থেকে তাকে সাভারে সিআরপিতে পাঠানো হয়েছিল।
খাদিজার উপর বদরুল হামলা চালানোর সময় আশপাশে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ এ দৃশ্য ভিডিও করে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেন। মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এ ঘটনার বিচার চেয়ে আন্দোলন শুরু করেন।
Related News
বিশ্বনাথে ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলা: আ.লীগ-ছাত্রলীগের ৭০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে নিজ বাড়িতে ঢুকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আওয়ামী লীগRead More
গোলাপগঞ্জে নিখোঁজের ১দিন পর জমি থেকে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাগিরঘাট গ্রামে বাড়ির পাশের ক্ষেত থেকে আসিদ আলী (৭৫)Read More



Comments are Closed