Main Menu

বঙ্গবীর ওসমানী জীবন ও কর্ম

মো. জিয়ারত হোসেন খান: মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর জন্ম হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত সভ্যতার লালন ভুমি সিলেট জেলায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় ওসমানীর পূর্বপুরুষ এয়োদশ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর সাথে ওই সময়ে আগত ৩৬০ জন আওলিয়ার অন্যতম আওলিয়া হযরত শাহ নিযাম উদ্দিন ওসমানী। তিনি ছিলেন আলোচ্য ওসমানী পরিবারের প্রথম পুরুষ। ওসমানীর পিতামহ মরহুম আব্দুস সোবহান ছিলেন একজন জ্ঞানী তাপস, ধর্মপ্রাণ ও জনদরদী ব্যক্তি। তাঁর মাতামহ মরহুম মুহাম্মদ আকিল চৌধুরী ছিলেন একজন শিক্ষিত, জমিদার ও জনদরদী।। ওসমানীর পিতা মরহুম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন উচ্চ শিক্ষিত। তিনি ছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট ও বেঙ্গল -আ্সাম সিভিল সার্ভিসের হতে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের লিষ্টেড পদে উন্নীত হন। ১৯৩১ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট-্এর চাকুরী নিয়ে এক সময় আসামের জেলা প্রশাসক হয়েছিলেন। চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন আসামের ল্যান্ড রেকর্ডস এর ডাইরেক্টার। সিলেট তখন আসাম প্রদেশ এর অন্তভর্’ক্ত ছিল।

১৯৫৬ সালে ওসমানীর পিতা হজব্র্রত পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে মক্কার আরাফাতের ‘জবলে রহমত’ নামক সুউচ্চ পাহাড়ে কবর দেওয়া হয়। মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর মাতার নাম জোবেদা খাতুন ছিলেন একজন বিদুষী মহিলা। তিনি বাংলা জানতেন, তদুপরি তিনি কিছু কিছু আরবি ও ফার্সি জানতেন। মোট কথা, ওসমানী ছিলেন উন্নত রক্তধারার অধিকারী, জনদরদী, সমাজ হিতৈষী, এক উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ও মাতা জোবেদা খাতুন ছিলেন দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক-জননী। ওসমানীর বড় ভাই মুহম্মদ নূরুল গণি ওসমানী ১৯২৩ সালে মেট্রিকুলেশন পাস, ১৯৩০ সালে সিলেট এম সি কলেজ থেকে বি এস সি ডিগ্রী লাভ এবং গৌহাটি থেকে “ল” ডিগ্রী প্রাপ্ত হয়ে সরকারের অধীনে ই.এ.সি ও অনেক বড় বড় প্রশাসনিক পদে নিযুক্ত ছিলেন। মেঝো বোন সদরুননেছা পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান জীবিত থাককালীন ১৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমায় জন্ম গ্রহণ করেন । ওসমানীর পৈতৃক নিবাস বর্তমান সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানাধীন দয়ামীর গ্রামে।

শৈশব ও ছাত্রজীবন : শৈশবে ওসমানীকে তার মা আদর করে আতা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে তিনি সকলের কাছে আতা নামেই পরিচিত ছিলেন। পিতার চাকরির সুবাদে ওসমানীর দুরন্ত শৈশব কেটেছে সিলেট এবং আসামের বন বনানী ও বন্য পশুপাখির লীলাভূমি পরিবেষ্টিত প্রাকৃতিক পরিবেশে ওসমানীর শৈশব ও কৈশোর। মায়ের কঠোর তত্ত্বাবধান এবং শৃঙ্খলাবোধে আবর্তিত হয় তাঁর শৈশবের দিনগুলো। খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো, পড়াশুনা-খেলাধুলা, সব কিছুর সময় এবং রুটিন করে দিতেন মা। কখনোবা রুটিনে ব্যত্যয় ঘটলে এতটুকুন বয়সেই তাঁকে শাস্তি পেতে হত। ফলে, ছোট বেলা থেকেই ওসমানী কঠোর অনুশীলন, আদব-কায়দা, শৃঙ্খলাবোধে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন।.শৈশবে ওসমানীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। কোনো স্কুলে ভর্তি না হয়ে, ঘরে বসে বসেই তাঁর বিদুষী মায়ের অনুশাসন এবং যোগ্য গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বাংলা ও ফার্সি ভাষায় ওসমানী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯২৯ সালে ১১ বছর বয়সে ওসমানীকে আসামের গৌহাটির কটনস স্কুলে ভর্তি করা হয়। কটন স্কুলে পড়াশুনা শেষ করার পর মায়ের ইচ্ছায় ১৯৩২ সালে সিলেট সরকারী পাইলট স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। এই স্কুল থেকে ১৯৩৪ সালে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন এবং ইংরেজীতে কৃতিত্বের জন্য “প্রিটোরিয়া অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন।. ১৯৩৪ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি ১৯৩৬ সালে আই.এ পাশ করেন। ১৯৩৮ সালে বি.এ পাশ করেন এবং ১৯৩৯ সালে ভূগোলে এম এ প্রথম পর্ব পড়ার সময় বৃটিশ-ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। ছাত্র হিসাবে সব সময়ই ওসমানী অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন। ন্যায়পরায়ণতা, শৃংখলা এবং কর্তব্যপরায়ণতা তার চারিত্রিক গুণাবলী বিশেষভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছাত্রজীবনেই ওসমানীর মধ্যে ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ছাপ ফুটে ওঠে। যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউ.ও.টি.সি’র (ইউনিভার্সি্িট অফিসার্স ট্রেনিং কোর) সার্জেন্ট নিযুক্ত হন।, স্যার সৈয়দ আহমদ হলের অন্যতম উপদেষ্ঠা ও পরপর দুই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়েল মনিটর অর্থাৎ ছাত্রদের শৃংখলা বিধানকারী কার্য্যধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়ে ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসাম বেঙ্গল ছাত্র সংঘের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তদানীন্তন ইতিহাসের লেকচারার মিঃ হালিম (পরবর্তীকালে ডক্টর হালিম সিতারা-ই-ইমতিয়াজ) এর সংঘের সভাপতি ছিলেন। মিঃ জওহর লাল নেহেরু দ্বারা উদ্বোধিত এবং মিঃ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লখনৌতে ‘সার্ভেন্টস অব ইন্ডিয়া সোসাইটি হলে’ সর্ব প্রথম অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত ছাত্র সম্মেলনে ওসমানী আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে সম্মেলন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈনিক জীবন: ওসমানী ১৯৩৯ সালে জুলাই মাসে বৃটিশ-ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৪০ সালে ৫ অক্টোবর দেরাদূন সামরিক একাডেমী হতে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে আর্মির কিং কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯৪১ সালে ১৭ই ফেব্রুয়ারি ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং যোগ্যতার বলে তিনি ১৯৪২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ আর্মির সর্ব কনিষ্ট মেজর হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি ব্যাটোলিয়ানের অধিনায়ক হয়ে নজীরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মার রণাঙ্গনে স্বতন্ত্র যান্ত্রিক পরিবহনে এক বিশাল বাহিনীর অধিনায়কত্ব দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৫ সালে ওসমানী তাঁর পিতার ইচ্ছা পূরণে আই.সি.এস পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ১৯৪৭ সালে বৃটেন; ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা প্রদান করলে, একই সালে ১৪ ও ১৫ই আগস্ট পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বতন্ত্র দেশ বিশ্ব মানচিত্রে আবির্ভূত হয়। ১৯৪৭ সালে ৭ অক্টোবর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পি.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন। ওসমানীকে ১৯৫৫ সালে ১২ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার নিয়োগ করা হয়। এখানে তাঁকে ১৯৫৬ সালে ১৬ মে মাসে কর্ণেল পদে পদোন্নতি প্রদান করে ডেপুটি ডাইরেক্টর এর দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। এ-সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা সিয়াটো ও সেন্টোতে ওসমানী পাকিস্তান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন।। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ওসমানীর দক্ষতার সংগে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালীন ওসমানী একজন স্বাধীন চেতা বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জনক: বঙ্গবীর ওসমানীর প্রস্তাবে জেনারেল অকিনলেকের অনুরোধে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় পূর্ববাংলায় পি.এন.জি গঠন স্থগিত করে‘ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ গঠনে সৈন্য রিক্রুটের দায়িত্বে ক্যাপ্টেন গণি ছিলেন সরকার নিযুক্ত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাচের জন্য সৈন্য রিক্রুটিং অফিসার। ওসমানী নিজে প্রস্তাব করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করে ক্ষান্ত হননি। লেঃ কর্ণেল ওসমানী উদ্যোগ হয়ে ১৯৫১ সালে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হয়ে পূর্ব বাংলায় এসে ১৯৫১ থেকে ১৯৫১৩ সাল পর্যন্ত এই তিন বছর তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ও রেজিমেন্টাল সেন্টোরের পরিচালক ছিলেন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মুল শক্তি ছিল ওসমানীর গড়া বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এ ছাড়াও তিনি ১৯৫১ এবং ১৯৫৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা, খুলনা, যশোহর এবং চট্রগ্রামের স্টেশন কমান্ডার এর দায়িত্ব পালন করেন। । ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অতিরিক্ত কমান্ড্যান্ট নিযুক্ত হয়ে ই পি আর বাহিনীতে বাঙ্গালীদের কোঠা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অবাঙ্গালী সেনাদের নিয়োগ বন্ধ করেন এবং প্রথমবারের মতো পার্বত্য উপজাতীয়দের ই. পি. আর-এ নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর তাঁকে ১৯৫৫ সালে ১২ ডিসেম্বর পুর্ব পাকিস্তানের সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার হিসেবে বাঙ্গালী সেনাদের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি নিজের পদোন্নতি তোয়াক্কা করেন নাই। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে’ দুই থেকে ছয় ব্যাটালিয়ানে উন্নীত, সেনা বাহিনীতে বাঙ্গালী নিয়োগ শতকরা দুই ভাগ থেকে দশ ভাগ বৃদ্ধি করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে অধিক হারে বাঙ্গালীদের নিয়োগের উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। বাঙ্গালী সৈনিকদের মধ্যে ওসমানীর জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। বাঙ্গালী সেনারা তাকে পিতৃতুল্য শ্রদ্ধা করেন এবং তাঁকে ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের’ জনক হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বঙ্গবীর ওসমানীর বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে পূর্ণ সার্থকতা লাভ করেন। কর্ণেল ওসমানী ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে ওসমানী কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মার্চ সঙ্গীত মনোনীত করেন এবং সরকারীভাবে অনুমোদন করান। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ’ গান দুইটির সুর পাকিস্তান সামরিক বাদ্যযন্ত্রে বাজানোর প্রচলন করেন।

কর্ণেল পদ হতে অবসর : ওসমানী ১৯৬৭ সালে ১৬ ফেব্রিুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অবসর গ্রহণ করেন। পাক আর্মিতে অবস্থানকালীন তিনি মর্যাদার সংগে জীবন যাপন করতেন। বিশেষ করে তিনি ‘টাইগার ওসমানী’ ‘পাপা টাইগার’ ‘বঙ্গশার্দূল’ ইত্যাদি নামে সুপরিচিত ছিলেন। যুগ সৃষ্টিকারী প্রতিভাবানদের মৃত্যুর পূর্বে প্রকৃত পক্ষে কোন অবসর হয় না। ওসমানীরও হয়নি। পরিশেষে তিনি জনগণের আহবানে নিজেকে দেশের সেবায় নিয়োজিত করার মনস্থ করেন।

রাজনীতিতে যোগদান: অনেক নেতৃবৃন্দ ওসমানীকে রাজনীতিতে যোগদান করার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু ওসমানী উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে মিথ্যাচারিতা, স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মতান্ত্রিকতা ইত্যাদির কারণে রাজনীতিতে যোগ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে জাতীয় স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সনের জুলাই মাসে তার রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর কতিপয় বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ ্আলোচনার পর তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করায় তাঁদের নেতৃত্বে সাড়া দিয়ে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সনের ঐতিহাসিতক সাধারণ নির্বাচনে জনগন বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগকে জয়ী করেন। বঙ্গবীর ওসমানী নিজেও সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও বিশ্বনাথসহ চার এলাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর পর পাকিস্তানী সরকারের শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে নানা টালবাহানা শুরু করে। সারা বাংলায় গোলযোগ সংগ্রাম এবং অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার তা স্তব্ধ করার শপথ নেয়। পাক-সরকার ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চেও কালো রাত থেকে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীদের দমন করতে পাকিস্তানী আর্মিরা পূর্ব বাংলায় চালাতে থাকে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। লক্ষ লক্ষ বাংলার মানুষ প্রাণ হারায়। তারা এ নিষ্ঠুর অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এসব আমাদের সবই জানা। দীর্ঘদিন সংগ্রামের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সঠিক বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকসেনাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ব্যতিত উপায় নেই। কাজেই স্বাধীনচেতা বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ওসমানীকেই যোগ্য মনে করেন। ওসমানী সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত বাঙ্গালী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংগঠিত করেন এবং তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য আহবান জানান।. পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এ বর্বরোচিত আক্রমণের জবাবে কর্ণেল ওসমানীর নেতৃত্বে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মরত সকল অফিসার এবং ইপিআর বাহিনীর জোয়ানরা, পুলিশ বাহিনীর পুলিশরা তারই ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সনের ২৫ মার্চের কালো রাত থেকেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সমস্ত সেনা সদস্যদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ও দক্ষ পরিচালনায় দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষের শাহাদাতের বিনিময়ে জাতিকে উপহার দিয়েছেন হাজার বছরের প্রত্যাশিত নতুন ভূখন্ড স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে এই ক্ষণজন্মা পুুরুষটি ক্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জন্মেই অসাধারণ হয়ে ওঠেননি। তিনি তাঁর কর্ম দিয়ে স্বরণীয় ও বরণীয় হন এদেশের মানুষের কাছে। অনাদিকাল ধরে এই জাতি তাঁকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধাভরে।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক: কর্ণেল ওসমানীর ডাকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটগুলোর কমান্ডারগণ ৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১ সিলেট বিভাগের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। উক্ত তারিখে এ ঐতিহাসিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কর্ণেল( অবঃ) এম এ জি ওসমানী। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন লেঃ কর্ণেল এম. এ. রব, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, কর্ণেল সালেহউদ্দিন, মোহাম্মদ রেজা, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধরী মেজর নূরুল ইসলাম, মেজর মবিন চৌধুরী, ভারতীয় বি.এস.এফ প্রধান মি. রুস্তমজি ও ব্রিগেডিয়ার পান্ডেসহ আরও অনেক সামরিক ব্যক্তি। এই ঐতিহাসিক বৈঠকেই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারগণ সর্বসম্মতিতে কর্ণেল ওসমানীকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মনোনীত করেন।

১৯৭১ খ্রিস্ট্রাব্দের ৭ মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ১৯৭১ সালে ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলায় এক আ¤্রকাননকে মুজিব নগর নাম দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। এই মুজিব নগরে সরকার গঠনের পর সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্তকর্তাদের শপথ গ্রহণ করা হয়। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর ১৯৭১ সালে ১২ এপ্রিলে এক ঘোষণায় কর্ণেল ওসমানীকে মুক্তিবাহিনী গঠন করা ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে একজন কেবিনেট মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে তাঁকে বাংলাদেশের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। একাত্তরের ঐ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ওসমানীকেও শপথ গ্রহণ করানো হয়। অতঃপর জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর থেকে কর্ণেল পদ থেকে জেনারেল পদে উন্নীত করেন এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর লাভ করেন।
জেনারেল ওসমানী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করেন। গোটা মুক্তিবাহিনীকে তিনি তিনটি বিগ্রেড ফোর্সে বিভক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। তিনি দিক নির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা দান করে গেরিলাযোদ্ধাদের এবং প্রয়োজনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করতেন। পাক সেনারা যুদ্ধের পর যুদ্ধে দুর্বল হয়ে পরাজিত হতে বাধ্য হয়। বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সূর্য দেখতে পায়। অতঃপর ১৯৭১ খ্রিস্ট্রাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয় প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙ্গালী, সম্ভ্রম হারায়, প্রায় দুই লক্ষ মা-বোন, সাধারণ জনমানবের মালামালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়। ওসমানী অত্যন্ত বীরত্বের সাথে জীবন বাজি রেখে তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল সফর করে জাতির বিজয়কে ত্বরান্বিত করায় জাতির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকার জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে ‘বঙ্গবীর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ছিলেন এই মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রাণ পুরুষ।

পাকবাহিনীর আত্মসমর্পন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তানী বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পন করে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান হয় বর্তমান আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওসমানী উপস্থিত না থাকার কারণ ছিল আর্মি প্রোটোকল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ব অঞ্চলে অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের প্রধান লে. জেনারেল মিয়াজী। এরা দুই জনই ছিল আঞ্চলিক প্রধান। অন্যদিকে ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান। তাই সেনা বাহিনীর প্রটোকল রক্ষার্থে কোন সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক প্রধানের সাথে তিনি কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন না।বঙ্গবীর ওসমানী নিজেই এ বিতর্কেও জবাব দিয়ে গেছেন।

মন্ত্রসভার সদস্য: বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল মন্ত্রী সভায় যোগদান করেন। বঙ্গবীর ওসমানী ১৯৭২ সনের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ চলাচল,অভ্যন্তরীন নৌ ও বিমান মন্ত্রী কেবিনেটের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহন করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জেনারেল এম এ জি ওসমানী ১৯৭৩ সনের ৭মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বিকে শতকরা ৯৪% ভোটে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের কেবিনেট মন্ত্রী পদে পুনঃনিয়োগের পর পূর্বের মন্ত্রণালয় ছাড়া কিছু দিনের জন্য ডাক, তার ও টেলিফোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

মন্ত্রীসভা, আওয়ামীলীগ ও সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ : ১৯৭৫ সনের ২৫ জানুয়ারি সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠাকালীন ওসমানী তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বিফল হয়ে সংসদ সদস্য পদ, মন্ত্রীত্ব এবং আওয়ামীলীগ হতে পদত্যাগ করেন।

নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও গণতন্ত্র : বঙ্গবীর ওসমানী ১৯৭৬ সালে ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর স্বপ্ন ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “জাতীয় জনতা পাটি” নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বিস্তারিতভাবে তিনি ‘গণনীতির রূপ রেখা’ নামে প্রণীত বইতে লিখেছেন। ‘সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, অস্ত্রমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ, দুর্নীীতমুক্ত প্রশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকল্প নেই । “গণতন্ত্রের বিকল্প হচ্ছে সেনা শাসক। উর্দিপরা সেনা শাসকরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র ধ্বংশ করেছে। বাংলাদেশেও যেন এর উদ্ভব না হয়”-বলেছেন ওসমানী। একজন সেনা শাসক হয়েও গণতন্ত্রের প্রতি তার এমন অবিচল আস্তা গোটা জাতিকে একটি সুনিদিষ্ট লক্ষ্য ও আর্থসামাজিক নীতির ভিত্তিতে সুসংহত করে নতুন দল গঠন করে হতাশামুক্ত করার জন্য গণতন্ত্রের প্রতি তার আকৃষ্ঠ করেছে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এবং অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছে। ইহা ওসমানীরই অবদান। নির্বাচনে হেরে গেলেও এটি তার রাজনৈতিক বিজয়।

ওসমানীর অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট ও নতুন প্রজন্ম : ওসমানীর জীবনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাঁর চরিত্রে দুইটি দিক ছিল। বজ্রের মত কঠিন আবার কুসুমের মত কোমল। পিতা মাতার অনুমতি ব্যতিত কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতেন না। রাজনীতিতেও সিনিয়রদের শ্রদ্ধা করতেন ওসমানী। ওসমানী শিক্ষা জীবন, সৈনিক জীবন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তি রাজনৈতিক জীবনেও তিনি নীতি-আদর্শের ঝান্ডাকে উর্ধে¦ তুলে ধরছেন। ওসমানী ছিলেন খাঁটি দেশ প্রেমিক এবং নির্লোভ রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা দুরদর্শী চিন্তা চেতনার অধিকারী। যার পুরো জীবনটাই ঘটনাবহুল এবং অনুসরণযোগ্য। বর্তমান যুগে ও বর্তমান সমাজে এমন মানুষ বিরল। উচ্চ শিক্ষিত, সৎ, মেধা ও প্রজ্ঞায় উজ্জল এক দুর্দমনীয় সমর ব্যক্তিত্ব, যিনি আপাদ মস্তক ছিলেন দুর্জয় সাহসের অধিকারী। আজীবন গণতন্ত্রী জেনারেল ওসমানী সহজ-সরল সত্যটি সব সময় নির্ভয়ে বলে গেছেন সাহসের সাথে। অসৎ দুর্নীতিপরায়ন, মিথ্যাচারিতা , উচ্চাভিলাসী এবং ধুরন্ধর প্রকৃতির লোকেরা কোনকালেই তাঁর কাছে প্রশ্রয় পায়নি। তিনি তাদের দেখতেন ঘৃনার চোখে। কারো রক্ত চক্ষুকে পরোয়ানা করেননি। এই সৎ মানুষটির অটল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ : যে কারণে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সে কারণে তিনি জীবনের শেষ দিন অবধি গণতন্ত্র ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের জন্য নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। আমরা তার নীতি ও আদর্শকে অনুসরণ করতে পারলে একটি সুখি ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। তার চারিত্রিক উজ্জল্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করুক, এটাই আমাদের কাম্য।

অন্তীম শয্যা: বঙ্গবীর জেনারেল এম, এ জি ওসমানী বহুদিন আমাদের ছেড়ে অন্য জগতের বাসিন্দা হয়েছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। মৃত্যু সকলের জন্য অনিবার্য। কাজেই তাঁর বেলায়ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মহান জননেতা সমর নায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী লন্ডনের সেন্টপল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর ইচ্ছায় তাকে ওয়ালিকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (রহঃ) দরগার শরীফ সংলগ্ন স্থানে তিনি তাঁর মায়ের কবরের সন্নিকটে সমাহিত করা হয়।

ওসমানী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা : বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.জি.ওসমানী জীবন সম্পকিত নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ সেবায় তাঁর গৌরবময় অবদান ও স্বীকৃতি জাতির সামনে তুলে ধরতে কর্মময়, সামাজিক, রাজনৈতিক স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে ওসমানী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়। সিলেট শহরের নাইওরপুল মহল¬ায় প্রায় ২ বিঘা আয়তনের মাঝখানে বাংলা টাইপের কাঠ টিনের নির্মিত বাড়িটি বিভিন্ন গাছ পালায় ঘেরা সবুজ সমারোহ অপরূপ সৈন্দর্যে বিদ্যমান।

লেখক: সহকারী কীপার, ওসমানী জাদুঘর, নাইওরপুল, সিলেট।

Share





Related News

Comments are Closed