Main Menu

জালালাবাদের এই নগরী-৩

খলিলুর রহমান: ওয়ালীকুল শিরোমণি হযরত শাহজালালালের (র.) দেশ জালালাবাদে-এর প্রাণকেন্দ্র সিলেট নগরী। এ নগরীর যেমন রযেছে ইতিহাস ঐতিহ্য, উন্নয়ন ও সৌন্দর্য, তেমনি রয়েছে সমস্যারও বিপুল সমাহার। কোন কোন সময় অপরিকল্পিত উন্নয়ন সমস্যারও সৃষ্টি করে থাকে এ নগরীতে। জনগনের মঙ্গলের চিন্তা না করে লোপাটের মানসিকতা নিয়ে যখন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয় তখন এ উন্নয়ন সমস্যার কারণ হয়ে থাকে। আজকের আলোচনা এই মহানগীতে থাকা ঐতিহাসিক সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা নিয়ে।
সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা ইষ্টবেঙ্গল-আসাম প্রেসিডেন্সির একমাত্র প্রথম কামিল বা টাইটেল মাদ্রাসা। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্টিত এ মাদ্রাসায় রয়েছে জরাজীর্ন ক্যম্পাস, লাইব্রেরী, বিশাল আয়তনের মাদ্রাসামাঠ ও ছাত্রাবাস। বর্তমানে এ মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৫০-এর মত। ইংরেজদের চিরস্থায়ী বন্দ্বোবস্তের ফলে যখন বাংলা ও বিহারে মাদ্রাসা-মক্তবের সমুহ ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়া হয় তখন বাংলা ও বিহারে মোগল আমলের প্রায় সব মাদ্রাসা ও মক্তব বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ইংরেজ গভর্নর লর্ড ওয়ানের হেষ্টিংস ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায় সরকারী আলিয়া মাদাসা প্রতিস্টা করেন। তখন বাংলা বিহার ও আসাম অঞ্চলের ইসলামী জ্ঞানপিপাসুরা কলকাতায় গিয়েই ইসলামী শিক্ষা লাভ করতেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার বড়কাটারায় আশরাফুল উলুম নামে একটি পুরনো কওমী মাদ্রাসা বহাল থাকলেও তখনকার সময়ে রাজধানীতে কোন সরকারী মাদ্রাসাই ছিল না। কলকাতা সরকারী আলিয়া মাদ্রাসাই ছিল উভয়বাংলা ও আসামের সরকারী মাদ্রাসা। তৎকালীন আসাম প্রদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট সিলেট জেলায়ও তেমন কোন মাদ্রাসা অবশিষ্ট ছিল না। একমাত্র সিলেট নগরীর নাইওরপুল এলাকায়ই আনজুমানে ইসলামিয়া নামে একটিমাত্র মাদ্রাসা ছিল। এই আনজুমানে ইসলামিয়া মাদ্রাসাই সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার মূল ও পুরনো ক্যাম্পাস। তৎকালীন আসাম গভর্নরের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ পশ্চিম বাংলার কলকাতার মত আসামেও একটি প্রাদেশিক সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্টার প্রয়োজন অনুভব করেন । তখন তিনি নগরীর নাইওরপুলস্থ আনজুমানে ইসলামিয়া মাদ্রাসাটি নগরীর চৌহাট্টায় স্থানান্তর করে প্রতিষ্টা করেন আসামের একমাত্র প্রাদেশিক মাদ্রাসা সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা। পরবর্তীতে সিলেটে ছোট ছোট আরো কয়েকটি এমই (মিড্ল এডুকেশন) মাদ্রাসা ও স্কুল প্রতিষ্টা লাভ করে, যা আসামের রাজধানী শিলং-স্থিত ডিপিআই (ডিপারমেন্ট অব পাবলিক ইনসট্রাকশন) কর্তক নিয়ন্ত্রন করা হতো। সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার এমই মানের শিক্ষা সনদও দেয়া হতো আসামের ডিপিআই থেকেই। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পূর্ববাংলা ও আসামের সিলেট নিয়ে গঠিত হয় পূর্বপাকিস্তান । তখনকার পূর্বপাকিস্তানের প্রথম সরকারী কামিল মাদ্রাসা ছিল সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা। পরবর্তীতে ষাটের দশকের সুচনালগ্নে রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত হয় সরকারী মাদ্রাসা ই আলিয়া ঢাকা। সিলেটের বর্তমান ও অতীত সকল বড় বড় নামকরা আলেম ওলামার সিংহ ভাগই ছিলেন এবং এখনো আছেন সিলেট সরকারী মাদ্রাসা পড়ুয়া। এদের অনেকে পরবর্তীতে সিলেটে বহু কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্টা ও পরিচালনা করলেও একসময় সবাই ছিলেন সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসায় যে বৃহদাকারের গ্রন্থাগার রয়েছে, উপমহাদেশের দারুল উলুম দেওবন্দ ও আলীগড় মাদ্রাসাতুল উলুম ইউনিভার্সিটির পরই এ গ্রন্থাগারের স্থান। অনেক দূর্লভ ইসলামী গ্রন্থ এ মাদ্রাসার লাইব্রেরীতে রয়েছে যা উপমহাদেশের অনেক প্রতিষ্টানেও গ্রন্থাগারে নেই।
সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসাটি পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম সরকারী কামিল মাদ্রাসা হলেও এ মাদ্রাসায় সমস্যার কোন অন্ত নেই। সেই পুরনো আমলের মরিচা পড়া ভবন, ব্রিটিশ আমলের টিনসেডের ছাত্রাবাস এবং বাংলাদেশের প্রথমভাগে নির্মিত পূর্বপাশের টিনসেটের ঘর নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা। এছাড়া বাংলাদেশের সুদীর্ঘ চার দশকে আর কোন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি ঐতিহাসিক এ মাদ্রাসার। নগরীর কেন্দ্রস্থলে বিশাল আয়তনের মাদ্রাসামাঠ থাকলেও এ মাঠের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের নেই। মাদ্রাসার বিভিন্ন বিভাগ ও ক্লাসে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। নেই প্রয়োজন মাফিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। শিক্ষক ও পাঠদানের অভাবে বোর্ডের পরীক্ষায় তেমন সফলতাও আসে না। ফলে শিক্ষার্থীও তুলনামূলক অনেক কম। মরিচা পড়া দেওয়াল ভবন এবং বিশাল লাইব্রেরীতে শিক্ষাথীদের বদলে স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির হাজারো-লাখো মাকড়শা। তাই আসাম-বেঙ্গল-প্রেসিডেন্সির ইতিহাসের স্বারক সিলেট সরকারী আলিয়া মাদ্রাসা এখন ‘মাকড়শার মাদ্রাসা’য় পরিণত হয়ে গেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেন।

Share





Related News

Comments are Closed