Main Menu

ধর্ষণকারীরা কান ধরে উঠবস করেই মুক্তি পেল!

হাবিব সরোয়ার আজাদ, সুনামগঞ্জ থেকে: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে ৩৫ বছর বয়সী এক অপ্রকৃতস্থ মহিলা পাগলীনীকে গণধর্ষণ করার পর সালিসের নামে ৩ ধর্ষণকারীকে তিনবার করে কানধরে উঠবস করিয়ে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে ওই পাগলীনীকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
এদিকে, ৬ ধর্ষণকারীর তিনজন কে কানধরে উঠবস করেই গণধর্ষণের মত একটি ষ্পর্শকাতর ও ঘৃণ্যতম অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃস্টি হয়েছে। আর পাগলীনীর কী দোষ ছিল? যে কারনে তাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল?।
বিষয়টি সুশীল সমাজ ও নারী নেত্রীদের মধ্যে জানাজানি হলে ওই ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সালিসীগণ ও পুলিশ প্রশাসনের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে ঘটনার ৫দিন পেরিয়ে গেলেও থানা পুলিশ বলছে গণধর্ষণের ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কিংবা থানায় কেউ অভিযোগ করেননি।
থানা পুলিশের এমন জবাবে সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের মধ্যে একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে পাগলীনীর কে আছে যে তার হয়ে থানায় অভিযোগ করবে? কিংবা পুলিশ কী আদৌ পারেনা এ ঘটনায় স্ব-প্রণোদিত হয়ে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে?।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্ট সালিসীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার বান্দের বাজারে গত ৬ মাসের অধিক সময় ধরে ৩৫ বছর বয়সী এক পাগলীনীকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে বান্দের বাজারের পাশের পারখাল বাঁধের ওপরে নারী খেঁকো পশুরুপী ৬ দুর্বৃত্ত ওই পাগলীকে গণধর্ষণ করে। ধর্ষণের ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন বাজার পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর গ্রামের জমির উদ্দিন। তিনি বাজার কমিটিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তিদের বিষয়টি অবহিত করেন। পরদিন শুক্রবার এ নিয়ে সালিস বসে বান্দের বাজারে। সালিসের ডাকে প্রথম দিন কেবল ধর্ষক পারুল (বারী) উপস্থিত হয়। সালিসকারীগণ বিচার স্থগিত রেখে পারুলকে তার সঙ্গে ওই রাতে ধর্ষর্ণের অভিযোগে সম্পৃক্ত থাকা অপর ৫ সহযোগীকে নিয়ে ১ অক্টোবর শনিবার সালিসে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। শনিবার দুপুরে ধর্ষক মাছিমপুরের পারুল, একই গ্রামের কবীর আহমদ ও চন্ডিপুরের কৃষ্ণনাথ সালিসে হাজির হলে সালিসীগণের নিকট ওই তিনজন গণধর্ষণের কথা স্বীকার করে। পরে সালিসীগণের রায়ে উপস্থিত তিন ধর্ষণকারী তিন বার করে কান ধরে উঠবস করেই গণধর্ষণের মত ঘটনা থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যায়। এরপরই বাজার কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সালিসীগণ বাজার থেকে ওই পাগলীকে তাড়িয়ে দেন। অন্য ৩ ধর্ষণকারী হিসাবে অভিযুক্ত চন্ডিপুরের তোফাজ্জল এবং একই গ্রামের আনসার ও আবদুল মজিদ সালিসেই আসেনি। শনিবার দুপুরে দোয়ারাবাজারের বান্দের বাজারে এমন মনগড়া, তামাশাপূর্ণ সালিস হয়।
বান্দের বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, ওই পাগলীকে কোন দিন বাজারের কারো কোন ক্ষতি করতে দেখিনি। কিন্তু তার উপর হওয়া এই অমানবিক ঘৃণ্যতম ঘটনার বিচার শুনে অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন পাগলীনী বলেই কী তার আইনগত ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার নেই?।
সালিসে উপস্থিত বাজিতপুরের আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমি বিচারের শেষের দিকে এসে ৩ জনকে কান ধরে উঠবস করতে দেখেছি। সালিসকারক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন- বাজার কমিটির সভাপতি নূরউদ্দিন, বাজিতপুরের আবদুল মতিন, শফিক মিয়া, শাহাব উদ্দিন, হারিছ আলী, আজর আলী এবং ইদনপুরের নুরুল ইসলাম প্রমুখ।
বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর উদ্দিন সোমবার সালিসের কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা শাসানোর জন্য ওই তিন জনকে কানধরে উঠবস করিয়েছি, অন্য তিন অভিযুক্ত সালিসে আসেনি, তারা না আসলে আমি তো আর জোর করে তাদের আনতে পারব না। সালিসে পাগলীনীকে উপস্থিত রাখা হয়নি বলেও তিনি জানিয়েছেন।
দোয়রাবাজারের মান্নার গাঁও ইউপি চেয়ারম্যান আবু হেনা আজিজ সোমবার সকালে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, গণধর্ষণের বিষয়টি থানার ওসিকে অবহিত করা হয়েছে। এখন থানা পুলিশ যা ভালো মনে তাই করবে।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি মো: সেলিম নেওয়াজ সোমবার সকাল ৮টায় বলেন, লোকমুখে বিষয়টি আমি ঘটনার ৪দিন পর রবিবার জানতে পেরেছি, ঘটনার সাথে জড়িতদের খোঁজে পাচ্ছিনা। তিনি আরো বলেন ইউপি চেয়ারম্যান মিথ্যাচার করেছেন তিনি আমাকে গণধর্ষণের বিষয়ে কোন কিছুই জানাননি।
সুনামগঞ্জের নারী নেত্রী শীলা রায় ও গৌরী ভট্রাচার্য সোমবার তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, মহিলা পাগল হলেও তো একজন মানুষ, ঘটনাটি পুলিশকে বাজার কমিটির পক্ষ থেকে জানানো উচিত ছিল কিংবা পুলিশও স্ব-প্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারত, গণধর্ষণের মত ঘটনা সালিসে বিচার করার মত এখতিয়ার সালিসীগণের নেই, সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, থানা পুলিশও এর দায় এড়াতে পারেনা, তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন মহিলা পাগলীনী বলে কী তার আইনগত বিচার পাওয়ার অধিকার কী রাষ্ট্রের কাছে নেই?

Share





Related News

Comments are Closed