Main Menu

‘এ গেরামে কোরমানি দেয়ার মতো বড়লোক নাই’

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ‘আমাগোরে দুইশো ঘর মাইনসের মধ্যে বেবাকেই গরিব মানুষ। দিন আইন্যা দিন খাইয়া কুনমতে বাইচ্যা থাকি। এ গেরামে কুরমানি দেয়ার মতো বড়লোক মানুষ একজনও নাই।’

‘এ জইন্যে কুরমানির আগের দিন এক থেইক্যা দেড় কেজি গোশত কিন্যা ছাওয়াল-পালগোরে খাওয়াই।’

ঈদুল আজহায় কোরবানির মাংস নিয়ে জানতে চাইলে এ কথা বলেন চলতি বছরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের বিয়ারাঘাট এলাকার বয়োবৃদ্ধ রইজ উদ্দিন।
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব সূর্য্য বেওয়া। রইজ উদ্দিনের কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা সরকার আমাগোরে দুই ডিসিমাল কইরা জাগা দিছে। ওই জাগায় ঝুপড়ি ঘর তুইল্যা আমরা কুনমতে মাথা গুইজ্যা আছি। ছেলেপুলে নাই, তাই মাইনসের বাড়ি চাইয়া-চিন্তা খাই। কুরমানির গোশতের চিন্তাও করি না।’

ঈদকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুসহ ঈদের কেনাকাটা নিয়ে যখন ব্যস্ত বিত্তশালী ও মধ্যবিত্তরা। তখন ঈদের কোনো আমেজ নেই কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের বিয়ারাঘাট এলাকার দুইশ পরিবারের মধ্যে। একই অবস্থা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘোনাপাড়া, সাপড়ী, ছোট পিয়ারী ও রামগাঁতী গ্রামের প্রায় সাড়ে সাতশ পরিবারের।

শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে এসব এলাকার মানুষের ঈদ উৎসবের খোঁজ নিতে গিয়ে সরেজমিনে দেখা গেলো তাদের দুর্ভোগ ও সংগ্রামের দৈনন্দিন চিত্র। রইজ উদ্দিনের মতো নুর মোহাম্মদ, ফাতেমা খাতুন, নজরুল ইসলাম, ফরিদা, সাজেদা বেওয়া, নুরজাহানসহ শত শত হতদরিদ্র নারী-পুরুষ ভাবনায় ঈদ নেই, তাদের ভাবনাজুড়ে কেবল দু’মুঠো খাবার সংগ্রহের উৎকণ্ঠা।
একই এলাকার মর্জিনা খাতুন বলেন, ‘বছর-বছর বন্যা আইস্যা আমাগোরে পুরা গেরাম ভাসাইয়া দেয়। যে কয়দিন বানের পানি থাহে আমাগোরে বেটা-ছাওয়ালগোরে কুন কাম-কাজ তাহে না। বান মরার উপর খাড়ার ঘা অইয়া খাড়ায়। এহন কোনমতে দু-বেলা খাইয়া-পইরা বাইচ্যা আছি।’

ঈদের দিনে নতুন পোশাকের প্রসঙ্গ তুলতে ফাতেমা খাতুন বলেন, ‘স্বামী যা রোজগার করে, তা দিয়ে পোলাপানের মুহে ভাত তুইল্যা দিতেই কষ্ট হয়। ঈদের সেমাই আর গোশত পামু কোন থেইক্যা। ছওয়াল-পালেক কাপুর-চুপুর তো কিন্যা দেওয়ার সামর্থ্য নাই।’ ফেরিওয়ালা ফরিদ শেখ বন্যায় তার ক্ষতিগ্রস্ত কুটির দেখিয়ে বলেন, ‘বন্যায় আমাগোরে বাড়িঘর সব লণ্ডভণ্ড কইরা দিল। কেউ দেইখপ্যার আইলো না। কুন সাহায্যও পাইলাম না।’

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার হতদরিদ্ররা জানান, গ্রামের প্রায় দুইশ পরিবার থাকলেও কোরবানি দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের কারো নেই। যারাও সমাজে দু’একজন কোরবানি দেয়, তারা থাকেন ওয়াপদার পশ্চিমপাড়ে। তারা জানান, ওয়াপদার পশ্চিমপাড় থেকে কোরবানির গরিবের জন্য দেওয়া ভাগের আধা কেজি বা একটু বেশি মাংস ‍পান তারা। তবে এজন্য দুর্গম চর থেকে তাদের অনেক কষ্টে যেতে হয় ওয়াপদার পশ্চিমপাড় এলাকায়। তার ওপর ওই এলাকার মসজিদের ইমামের বেতন, মসজিদ-মাদ্রাসার খরচের মিলিয়ে দুই থেকে আড়াইশ টাকা জমা দিতে হয়। ফলে টাকা দিয়ে ও অতোদূরে গিয়ে মাংস সংগ্রহ তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই প‍াড়ার অধিকাংশ লোকজন ঈদের আগের দিন বাজার থেকে এক-দেড় কেজি মাংস কিনে নিয়ে যায় পরিবারের জন্য।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হযরত আলী জানান, তার ওয়ার্ডের সাড়ে সাতশ পরিবার এমনিতেই হতদরিদ্র। তাছাড়া বন্যায় এদের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে। কারোই কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। দুই-একজন যারা রয়েছেন তারাও এলাকা ছেড়ে দূরে অবস্থান করেন। এ কারণে এ এলাকার দরিদ্র মানুষেরা কোরবানির মাংস পায় না বলে তিনি জানান।

Share





Related News

Comments are Closed