Main Menu

কোরবানি, চোরাই গরু ও কৃষকের কান্না

গোলাম মোর্তোজা: বর্তমান পৃথিবীতে সব কিছু হিসেব করে হয়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সেকারণেই ছোট্ট এই ভূখন্ডের ১৬ বা ১৮ কোটি মানুষ নিজেরাই নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গত কয়েক দিন কোরবানির পশু নিয়ে কথা বলেছি।

মুসলমানরা কোরবানি কেন দেন, এর ধর্মীয় ত্যাগের তাৎপর্য মোটামুটিভাবে সবাই জানি। সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। বাংলাদেশের কোরবানি ও কোরবানির পশু বিষয়ে দু’একটি কথা বলি।

গত কয়েক বছর কোরবানি বিষয়ে দুই রকমের চিন্তা দৃশ্যমান হতে দেখছি।

ক. কোরবানি বিষয়ে উন্নাসিক একটা শ্রেণী।

খ. কম দামে গরু কেনার প্রত্যাশায় থাকা একটা শ্রেণী।

উন্নাসিক শ্রেণীটি সংখ্যায় কম। পশু জবাইয়ের ভয়াবহতা, রক্ত -বিভৎসতা তারা সহ্য করতে পারেন না। সরাসরি কোরবানির বিরোধিতা করেন না, বিরক্তিটা প্রকাশ করেন। ফেসবুকের মাধ্যমে যার কিছুটা দৃশ্যমান হতে দেখা যায়। এমন নয় যে তারা পশু হত্যার পুরোপুরি বিরুদ্ধে।

অনেককে জানি গরু -খাসির মাংশ নিয়মিতই খেয়ে থাকেন। তারা নিজেরা বা তাদের বাড়িতেও কোরবানি দেয়া হয়! এক্ষেত্রে তাদের বক্তব্য ‘না মানে …সামাজিকতা …না দিয়ে তো পারা যায় না …’।

এবার আসি কম দামে গরু কেনা শ্রেণী প্রসঙ্গে। এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ । লেখার শুরুতে বলেছি, সব কিছু হিসেব করে হওয়ার কথা। একটি গরুকে প্রতিদিন যত টাকার খাবার খাওয়ানো হয়, তার মাংশও বৃদ্ধি পায় সেই পরিমানে। মাছ, মুরগি চাষও এই পদ্ধতিতেই হয়। সাধারণ কৃষক এবং বড় খামারি সবাই একই পদ্ধতিতে গরু-খাশি পালন করেন।

কোরবানির জন্যে যত পশুর প্রয়োজন হয়, সেই সংখ্যক পশু দেশেই পালন হয়। পশু পালনকারীরা একটু বেশি দামে বিক্রি করার প্রত্যাশা নিয়ে অবর্ণনীয় দূর্ভোগ সহ্য করে গরু -খাশি নিয়ে ঢাকায় আসেন। ঢাকার অধিকাংশ ক্রেতার এই গরু পালনকারীদের প্রতি কোনো মায়া -মহব্বত থাকে না। তারা গরু পালনকারী বিক্রেতাকে নায্য বা একটু বেশি মূল্য দিতে চান না।

তারা কম দামে বড় গরু কিনে জিততে চান। কে কত কম দামে কত বড় গরু কিনেছেন, সেই হিসেব মেলানোর গল্প চলে কয়েকদিন ধরে। কে ঠকেছেন, কে জিতেছেন -আনন্দ, মন খারাপের উপলক্ষ হয়। বুক ভরা আশা নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন যে কৃষক, গত কয়েকদিন হাটে, রাজধানীর পথে, ফুটপাতে খেয়ে না খেয়ে যার জীবন কাটল, তিনি নগরের মানুষের মনে দাগ কাটতে ব্যার্থ হলেন। লোকশান দিয়ে পশু বিক্রির হৃদয়বিদারক কান্নার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়, টেলিভিশনে দেখানো, নগরের মানুষের হৃদয়ে তা নাড়া দেয় না।

এভাবে ভাবনা আসে না যে, ৩০ হাজার টাকার গরুর দাম গ্রাম থেকে আসা কৃষককে তো ৩৫ হাজার টাকাও দেয়া যেত! তাহলে সেই কৃষকও গ্রামে ফিরতেন স্ত্রী -সন্তানের জন্যে উপহার নিয়ে। ঈদ তাদের জীবনেও বয়ে আনতে পারত আনন্দ।

কোরবানি তো বড় গরু, বেশি মাংশ খাওয়ার জন্যে নয়, ত্যাগের জন্যে। রাষ্ট্রীয় সিস্টেমে বাধ্য করে কৃষকের থেকে কম দামে পশু কিনে জেতার নাম তো কোরবানি নয়।

সরকার কৃষককে পশু পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরামর্শ দেয়। কৃষক উদ্বুদ্ধ হয়ে পশু পালন শুরু করেন। প্রত্যাশা থাকে সরকার চোরাই পথে ভারতীয় গরু দেশে ঢোকা বন্ধের উদ্যোগ নিবে। সরকার কোনো উদ্যোগ নেয় না। গত দুই বছর একটা আশার আলো দেখা গিয়েছিল। ভারত বাংলাদেশে গরু আসা বন্ধ করে দিয়েছিল।

সারা বছর গরু আসা মোটামুটি বন্ধ থাকলেও, গত বছর ঈদের আগে গরু এসে বাজার সয়লাব হয়ে যায়। পরিণতিতে দাম কমে যায়। লোকশানে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া কৃষকের ভয়াবহ কান্নার করুণ ছবি ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। এবছর প্রত্যাশা ছিল গত বছরের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।

বিজিবি বলেছিল, সীমান্ত এলাকাতেই তারা কাউকে যেতে দিবে না। রাতের অন্ধকারে গেলে চোর হিসেবে ব্যবস্থা নেবে। বিএসএফ গরু বাংলাদেশে ঢুকতে দিবে না,এই ছিল ভারতীয় সিদ্ধান্ত ।

বাস্তবে ঈদের আগের তিন চার দিন-রাতে হাজার হাজার ভারতীয় গরু বাংলাদেশে ঢুকলো, খুব গোপনে নয় মোটামুটি দৃশ্যমান ভাবে। ঈদ পর্যন্ত যা অব্যহত থাকলো। ঈদের আগের দিন ভারতীয় গরুতে বাজার ভরে গেল!কৃষকের সেই একই পরিণতি, সব হারানোর হাহাকার করা কান্না। এই কান্না রাজধানীর আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়, কারও কানে পৌঁছায় না।

কাস্টমস সরকারি কোষাগারে মাত্র ৫০০ টাকা জমা করে ভারতীয় গরুর বৈধতা দেয়। সীমান্ত এলাকার ‘সিন্ডিকেট’ গরু প্রতি নেয় ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।

বাংলাদেশের ‘মিল্ক এন্ড মিট প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন’ ঈদের আগে জানিয়েছিল দেশে এবছর কোরবানিযোগ্য পশু (গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া) আছে ১ কোটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার, এরমধ্যে গরু-মহিষ আছে ৪৪ লাখ এবং ছাগল ভেড়া আছে ৭০ লাখ ৫০ হাজার। যা দিয়ে দেশের চাহিদার পুরোটা পূরণ হবে।

হঠাৎ করে ভারতীয় গরু আসায়, দেশের গরু পালনকারীরা এবারও ভয়াবহ ক্ষতির মূখে পড়ে গেল। সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে আছেন, কেউ -ই দেশ -জনগণের স্বার্থ দেখছেন না। চোরাই পথে আসা গরু কম দামে কিনে কোরবানি দেয়া ঠিক কিনা, কারও বিবেকে এই প্রশ্ন আসল না।

‘ভারত আমাদের পশু পালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দিল না’ -এটা একেবারে বাজে কথা। দায় আমাদের, সরকারের -রাজনীতিবিদের, সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থার। আমাদের পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সাধারণ জনমানুষের বিপক্ষে। রাষ্ট্র গরীব ঠকানোয়, বিত্তবানদের উদ্বুদ্ধ করে।

চোরাই গরু, নীতি নৈতিকতা, কোরবানির তাৎপর্য, এদের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। কোরবানির পুরো প্রক্রিয়ায় এখন লোক দেখানো বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে।

লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
s.mortoza@gmail. com

Share





Related News

Comments are Closed