Main Menu

বিশ্বনাথে দুই লন্ডনী ভাইয়ের ‘মামলা যুদ্ধ’

বিশেষ প্রতিনিধি: আকবর আলীর দুই স্ত্রী। দুই পক্ষে তার দুই ছেলে। সামছুল হক ও তার সৎ ভাই আমীর আলী। দুজনেই লন্ডন প্রবাসী। হেবা দলিলের মাধ্যমে বাড়ির ভূমি বাটোয়ারা হয়েছে অনেক আগে। একপাশে পুরাতন ঘরবাড়ি, অন্যপাশে সামছুল হকের নতুন বাড়ি। বাড়ির ঐতিহ্যের কারণে দেয়ালের পক্ষে ছিলেন না কেউ-ই। কিন্তু বাড়ির সামনে সেই ১৯৭২ সালে ফেলে যাওয়া হিন্দু পরিবারের ৫৭ শতক জমি। এই জমির দখলে জড়িয়ে শেষমেশ দুই প্রবাসীর মাঝখানে একটি দেয়াল ওঠেছে। এই দেয়ালকে কেন্দ্র করেই এখন দুটি পরিবারের মধ্যে হামলা, মামলা মকদ্দমার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গ্রামের মুরব্বিরাও আপস-মীমাংসার চেষ্টা করে ব্যর্থ। প্রবাসী সামছুল হক প্রতিকার চেয়ে সিলেট জেলার পুলিশ সুপারের মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ সেলের শরনাপন্ন হয়েছেন। যেহেতু জমির বিষয়, পুলিশও কোনো সমাধান দিতে পারছে না। চলছে, একের পর এক ‘মামলা যুদ্ধ’। এই ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের রামদানা গ্রামে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে আসেন প্রবাসী সামছুল হক। তিনি দেশে এসেই বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে যান সিলেট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে। অভিযোগ করেন, বাড়িতে তারই সৎ ভাই আমির আলীর ইন্ধনে ছুরাব আলীর ছেলে আলীম উদ্দিন গংরা যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে। তিনি জানমালের নিরাপত্তা চান। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত আড়াইটায় সামছুল হকের সৎ ভাই আমীর আলীর পক্ষের আলীম উদ্দিনের বাড়িতে এদকল দৃর্বৃত্ত হামলা করেছে বলে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়। আলিম উদ্দিনের অভিযোগ, ওই রাতে তার বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি ও আগুন লাগিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে একদল দুর্বৃত্ত। তারা দেয়াল ভেঙে জায়গা দখলের অপচেষ্টা করে। তিনি এই মামলায় প্রধান আসামি করেছেন সামছুল হকের বোন জামাই হেলাল উদ্দিন ও তার ভাইদের। অন্যদিকে, সামছুল হক ও হেলাল উদ্দিনের অভিযোগ, থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে আতশবাজি করে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সাজানো ঘটনায় তাদের আসামি করা হয়েছে।
রামদানা গ্রামে গিয়ে জানা গেল, উভয় পরিবারই আকবর আলীর। একসময় আকবর আলীর দুই স্ত্রীর দুই ছেলে এক সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু হিন্দু পরিবারের ৫৭ শতক জমির দখল নিয়েই আজ বাড়ির মাঝখানে বিরোধীয় একটি দেয়াল নির্মাণ করে তারা হয়েছেন একে অন্যের শত্রæ। এখন একের পর এক মামলা হচ্ছে। উভয়পক্ষই থানা পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে প্রতিকার চাচ্ছেন। কিন্তু পুলিশ জমির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। তবে, উভয়পক্ষের নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কড়া সতর্কবাণী শুনিয়েছে বিশ্বনাথ থানা পুলিশ।
সামছুল হকের বোন জামাই হেলাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, হেবা দলিলের অংশ অনুযায়ী লেচু মিয়া মুরব্বির মাধ্যমে বাটোয়ারা হয়েছিল বাড়ির সীমানা। সে অনুযায়ী, বাড়ির বাইরের জমিও ভাগ হয়েছে। আকবর আলী তিন কেদার জমির মালিক থাকলেও বাস্তবে আধ কেদার জমি ভোগ করছেন। বাকিটা আলিম উদ্দিন দখল করে রেখেছেন। শুধু তাই নয়, আকবর আলী নরেন্দ্র-হরেন্দ্র পরিবারের কাছ থেকে ৭২ সালে ৫৭ শতক জমি কিনেছিলেন। সেই জমির অর্ধেক জবরদখল করে রাতের আঁধারে জোরপূবর্ক বাড়িটি বন্দি করে একটি দেয়াল তুলে দেন। বর্তমানে আলিম উদ্দিন হরেন্দ্রের অংশের ২৮ শতক জমি পাওয়ার দাবি করলেও তা সঠিক নয়। কারণ, ৭২ সালে হরেন্দ্র নিজে আকবর আলীর কাছে বিক্রি করেছেন ১৫ শতক জমি। আর বাকি ১৩ শতক সরকারের বিপি (বেস্ট অব পপার্টি) খতিয়ানে আছে। আর তা সামছুলের দখলে আছে। হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে কেনা ৫৭ শতক জমির নামজারি বাতিলের আবেদন করলে বিশ্বনাথ সহকারি কমিশনার (ভূমি) রায় দেন, সাড়ে ৪৩ শতক জমির বৈধ মালিক মালা বেগম। আর বাকি ১৩ শতক সরকারের বিপি খতিয়ানের। এক্ষেত্রে এই ১৩ শতকের কোনো পাওয়ার গ্রহণযোগ্য নয়।
হেলাল আরও অভিযোগ করেন, এই ন্মকে কেন্দ্র করে তাকে ও তার ভাইদের আসামি করে বিশ্বনাথ থানায় একটি কাল্পনিক বিস্ফোরণ ঘটনা সাজিয়ে মামলা (নং ১) দায়ের করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আতশবাজি করে পরিকল্পিতভবাবে আলিম উদ্দিন এই মামলা করেছেন। আর এই মামলায় তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ থেকে জেল খেটেছেন। ইতোপূর্বে আলিম উদ্দিন বাদি হয়ে তার পরিবারের ওপর ১৪৪ ধারার মামলা করেছিলেন। মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
londoni wallআলিম উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, হিন্দু পরিবারে দুজন লোক ছিল এই ৫৭ শতক জমির মালিক। তারা নরেন্দ্রের কাছ থেকে জমি কিনলেও অন্যজন হরেন্দ্রের ছেলে জীবিত সুকুমার চন্দকে জালিয়াতির মাধ্যমে মৃত বানিয়ে সবটুকু জমি কুক্ষিগত করেছিলেন। সুকুমার এসে আমাদের কাছে পাওয়ার দেন। এখন আমরা সুকুমারের কাছ থেকে পাওয়ার বলে তার ২৮ শতক জমির মালিক। আর আমরা কাউকে মিথ্যা মামলা দিচ্ছি না। যে মামলা মিথ্যা বলা হচ্ছে, সেই মামলার আদেশে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, আমাদেও দেয়াল বর্তমান আছে এবং এটা ভাঙতে বা কোনো প্রকার বিরক্ত করবে না হেলাল গং-এই শর্তে মামলা নথিজাত করেছেন আদালত। তাহলে তো মামলা মিথ্যা হতে পারে না। আর আমি কারও জমি দখল করে দেয়াল নির্মাণ করিনি। কাউকে বন্দিও করিনি। আমার অংশ থেকে বরং ১০ ফুট জমি বাদ দিয়ে সরে এসে নিজের জমিতে দেয়াল দিয়েছি।
আলিম উদ্দিন আরও বলেন, ককটেল ফাটিয়ে , গুলি করে হামলার অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমি মামলা করেছি। ঘটনার রাতে পুলিশ এসে তিনটি ককটেল ও শর্টগানের একটি গুলি জব্দ করেছে। তাহলে মামলাটি মিথ্যা হবে কি করে ? তাছাড়া পুলিশ তদন্ত করে দেখবে মামলার সত্য-মিথ্যা।
অলংকারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রাজউক মিয়া বলেন, সামছুক হক, আমীর আলী, বোরহান উদ্দিন এরা একই বাড়ির ভাই-স্বজন। সবাই লন্ডন প্রবাসী। কিন্তু বাড়ির সামনের কিছু হিন্দু পরিবারের জমি নিয়ে তাদের বিরোধ। সেই বিরোধ থেকে মামলা -মকদ্দমা। যেহেতু বিষয়টি থানা আদালত পর্যন্ত চলে গেছে, সেহেতু আইনগতভাবে যে সঠিক সেই জমি পাবে। আমরা শুধু গ্রামের শান্তি বজায় রাখতে উভয়পক্ষকে অনুরোধ করেছি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিশ্বনাথ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কল্লোল গোস্বামী জানান, ঘটনার রাতে গ্রামবাসী মাইকিং করেছেন, পুলিশে খবর দিয়েছেন বাদি আলিম উদ্দিন। পুলিশ গিয়ে তিনটি ককটেল ও একটি শর্টগানের গুলি জব্দ করেছে। পরবর্তীতে পুলিশ গ্রামের সাক্ষীসহ সুষ্ঠু তদন্ত করেছে। দু-একদিনের মধ্যেই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করবে পুলিশ।
বিশ্বনাথ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হাই বলেন, একজন প্রবাসী হিসেবে সামছুল হক পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছে জানমালের নিরাপত্তা চেয়ে দরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনি দরখাস্ত করার কিছুদিনের মধ্যেই প্রবাসে চলে যান। আগামিতে দেশে এসে জানালে, আমরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবো। আর জমিজমার বিষয় দেখবেন আদালত।

Share





Related News

Comments are Closed