জনস্বাস্থ্যে ডেঙ্গু্র প্রভাব: সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা
মো. আকিকুর রেজা: প্রতি বছর বর্ষাকাল আসলেই জনমনে ভর করে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। তবে ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালেই সীমাবদ্ধ নেই, সারাবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি এর চরিত্র ও লক্ষণেও এসেছে পরিবর্তন। ২০০০ সালের পর থেকেই ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তবে এর প্রকোপ বাড়তে থাকে ২০১৭ সালের পর থেকে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারিত্রিক পরিবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষও সহজে এর ভয়াবহতা আঁচ করতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশে এটি ক্রমেই বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
চলতি বছরে ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান কী বলে? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৬১ হাজার ৯৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১৮৪ জন। শুধু ১৯ সেপ্টেম্বর ২৪ ঘণ্টাতেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন এবং মারা গেছেন ছয়জন। সিলেট বিভাগে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৩৪ আর মৃত্যুর সংখ্যা ৩। সারাদেশের তুলনায় সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম হলেও তা যে নিকট ভবিষ্যতে বাড়বে না সে নিশ্চয়তা নেই।
সংখ্যাগুলোকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার একটি বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। কারণ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি কর্মজীবন, একটি শিশুর স্কুলে না যাওয়া, একজন মায়ের উদ্বেগ, একজন বাবার হাসপাতালের করিডরে রাত কাটানো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রয়েছে একটি পরিবারের স্থায়ী শোক। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন। তার আগের বছর ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং মৃত্যু ৫৭৫। ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেই যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বছর শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- এ নিয়ে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭৫৩ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং সাতজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়, যা চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল। আবার ১৪ সেপ্টেম্বরও এক দিনে ১ হাজার ৭৩৩ জন হাসপাতালে ভর্তি ও আটজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই দিনের নতুন রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের রোগীও ছিলেন। বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো এর ভৌগোলিক বিস্তার। তাই বলা যায়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার আতঙ্ক নয়।
ডেঙ্গু কেন এত সহজে ছড়িয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘মশা বেড়েছে’ বললে পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পানির পাত্রে জমে থাকা পানি, মানুষের চলাচল, জলবায়ু এবং স্থানীয় পরিবেশ। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক Aedes aegypti মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে। ছাদে পড়ে থাকা ভাঙা বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, নির্মাণসামগ্রীর পাত্র কিংবা ছোট কোনো কৌটায় জমে থাকা পানিও তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা দিনের বেলাতেই বেশি সক্রিয় থাকে। ফলে শুধু রাতে মশারি টানালেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি এড়ানো যায় না।
উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা ত্বকে র্যা শ- এসব ডেঙ্গুর সাধারণ উপসর্গ হতে পারে। তবে একই উপসর্গ অন্য রোগেও দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর হলেই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। ডেঙ্গুর আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, অনেক সময় রোগী মনে করেন জ্বর কমে গেছে, তাই বিপদও কেটে গেছে। অথচ গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমে যাওয়ার পর দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অস্থিরতা, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা ত্বক- এসব সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। এখানে পরিবারের সচেতনতাই জীবন বাঁচাতে পারে।
ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই; মূল চিকিৎসা হলো প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যথা বা জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহারের কথা বলেছে এবং রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে আইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো NSAID এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসা বিষয়েও কিছু ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান। অনেক রোগীই শিরায় প্লাটিলেট নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন।বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অনেকটা মানসিক তৃপ্তি। কারণ ডেঙ্গু রোগে রক্ত বা প্লাটিলেট দিলে তেমন কোন উপকার পাওয়া যায় না। মারাত্মক রক্তক্ষরণ হলে কখনো কখনো রক্ত দেয়ার দরকার পড়লেও প্লাটিলেটের তেমন কোন কার্যকর ভূমিকা পাওয়া যায়নি। অযাচিত প্লাটিলেট সঞ্চালনায় বরং জটিলতা বাড়তে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য জাতীয় পর্যায়ে ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ করেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত পঞ্চম সংস্করণের ‘National Guideline for Clinical Management of Dengue’ বর্তমানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে রয়েছে।
তবে হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে হলে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধের কাজটি করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রজননস্থল ধ্বংস বা ‘সোর্স রিডাকশন’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি হলো ভেক্টর বা বাহক নিয়ন্ত্রণ। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু ‘মশা মারার অভিযান’ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কোথায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় রোগী বাড়ছে, কোথায় পানি জমছে, কোন এলাকায় কোন কীটনাশক কার্যকর- এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। WHO-এর সাম্প্রতিক আলোচনাতেও তথ্যভিত্তিক নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা বন্ধ করতে হবে। ছাদ, ড্রেন, পরিত্যক্ত জমি, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আশপাশ নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে। শুধু অভিযান চলাকালে নয়, সারা বছর মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং অভিযোগের পর দ্রুত মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, গণপূর্ত, ওয়াসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, আবাসিক সমিতি, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ- সবার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক এক আলোচনায় WHO বাংলাদেশও ডেঙ্গু মোকাবিলায় ‘whole of government, whole of society’ বা সরকার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, নজরদারি, ঝুঁকি-যোগাযোগ, সামাজিক অংশগ্রহণ, মশা নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ চিকিৎসা একই সময়ে একই এলাকায় কার্যকর করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এডিস মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ‘দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ শীর্ষক তিন মাসব্যাপী একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর এর উদ্বোধন করেন তিনি। এ কর্মসূচির আওতায় ডেঙ্গুর প্রকোপ অন্তত ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিজেদের বাসা-বাড়ি ও আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে সপ্তাহে অন্তত ১ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও এ কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা অপসারণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর সঙ্গে জলবায়ুর সম্পর্ক নিয়েও এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা ও আর্দ্রতার মতো পরিবেশগত বিষয় এডিস মশার প্রজনন ও টিকে থাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। WHO বাংলাদেশ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ডেঙ্গুর মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং ডেঙ্গু একসময় মূলত মৌসুমি ও শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা বছরজুড়ে এবং দেশব্যাপী হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
ডেঙ্গু ছোট একটি মশা হলেও এর তৈরি করা সংকট অনেক বড়। তবে একটি মশার জীবনচক্র থামাতে হয়তো কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। কিন্তু একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে সেই কয়েক মিনিটের সচেতনতাই কখনো হয়ে উঠতে পারে একজন মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। (পিআইডি ফিচার)
লেখক: তথ্য অফিসার (বিসিএস-তথ্য), আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।
Related News
জনস্বাস্থ্যে ডেঙ্গু্র প্রভাব: সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা
মো. আকিকুর রেজা: প্রতি বছর বর্ষাকাল আসলেই জনমনে ভর করে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। তবে ডেঙ্গু এখনRead More
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান: বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়েRead More



Comments are Closed