নিখোঁজের ৬০ দিনেও সন্ধান নেই ওসমানী বিমানবন্দর কর্মকর্তা জেলিনের
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: নিখোঁজের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. আরিফুল্লাহ জেলিনের। গত ৮ জুলাই সিলেটের এয়ারপোর্ট থানাধীন খাদিমনগর ইউনিয়নের বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার জি-টাইপ কোয়ার্টার থেকে নিখোঁজ হন তিনি। এরপর ৬২ দিন পেরিয়ে গেলেও তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জেলিন নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় অনুসন্ধান ও অভিযান চালানোর কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ দুই মাসেও তার সন্ধান না মেলায় স্বজনদের উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও রহস্য।
নিখোঁজ জেলিনের মামা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সে যদি মারাও যায়, বা কেউ তাকে মেরেও ফেলে, লাশটা এতদিন থাকার কথা না। লাশটা তো পাওয়ার কথা। কিছু একটা বলা যাবে তো। কেউ যদি তাকে কিডন্যাপ করে থাকে, মুক্তিপণ দাবি করে থাকে, তাও তো করল না।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মানুষটা কি হারিয়ে যাবে?’
তিনি জানান মামালার তদন্ত কর্মকর্তা তাদেরকে জানিয়েছেন, ‘জেলিন নাকি আত্মগোপনে আছে। আত্মগোপনে থাকলে তাকে খুঁজে কিভাবে পাওয়া যাবে।”
তিনি প্রশ্ন রাখেন আত্মগোপনে থাকলেও তো তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের’।
এয়ারপোর্ট থানার (ওসি তদন্ত) আব্দুস সালাম গণমাধ্যমকে জানান, গত ৮ জুলাই সিলেটের এয়ারপোর্ট থানাধীন খাদিমনগর ইউনিয়নের বিমানবন্দর আবাসিক এলাকার জি-টাইপ কোয়ার্টার থেকে আরিফুল্লাহ জেলিন নিখোঁজ হন। এরপর সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে সিলেট মহানগরীর এয়ারপোর্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এই সাধারণ ডায়রির পর থেকে পুলিশ, সিআইডি, র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরাও তাকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন।
নিখোঁজ আরিফুল্লাহ জেলিনের বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার শীতলপুর গ্রামে। জেলিন খুলনা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। গত ৯ আগষ্ট এয়ারপোর্ট থানায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তার সহকর্মী নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরবর্তী সময়ে গত ১ আগস্ট ছেলের সন্ধানের দাবিতে সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করেন তার মা ফরিদা ইয়াসমীন।
সংবাদ সম্মেলনে ফরিদা ইয়াসমীন উল্লেখ্য করেন, জেলিন যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত তার সঙ্গে তার মায়ের সাথে ভিডিও কলে কথা হয়েছে। তখন সে তার বিমানবন্দর আবাসিক কোয়ার্টারেই ছিল। কিন্তু জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৮ জুলাই বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে রাত ১১টার মধ্যে কোনো এক সময়ে সে নিখোঁজ হয়েছে। আমার সঙ্গে যখন বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কথা হয়েছে, তখন বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিট থেকে নিখোঁজ হওয়ার কথা কীভাবে বলা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনো পাইনি।
তিনি আরও বলেন, এ তথ্যগত অসংগতির কারণে আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমার ছেলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কেউ প্রকৃত ঘটনা জানেন। কিন্তু তা গোপন করা হচ্ছে। এ কারণে আমি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে অনুরোধ করছি, ওই সময়ে আমার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগে থাকা ব্যক্তিদের, বিশেষ করে যিনি জিডি করেছেন, তার বক্তব্যসহ সব তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক।
জেলিনের পরিবারের দাবি, আরিফুল্লাহ জেলিনের ব্যক্তিগত জীবনে পরিচিত কোনো শত্রু ছিল না। তবে কর্মস্থলে কোনো সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে তিনি নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারেন বলে পরিবারের সন্দেহ রয়েছে। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তেরও দাবি জানানো হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, জেলিন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছেন। পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে অনুসন্ধান চালিয়েও তার কোনো সন্ধান পাননি তারা।
দুই মাস ধরে কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য তথ্য না পাওয়ায় জেলিনের পরিবারের কাছে প্রতিটি দিনই যেন উৎকণ্ঠার। তিনি কোথায় আছেন, কীভাবে নিখোঁজ হলেন কিংবা তার সঙ্গে আদৌ কী ঘটেছে; কোনো প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না।
জেলিনের নিখোঁজের ঘটনায় শুরু থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নিখোঁজের সময় উল্লেখ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে অসঙ্গতির অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, নিখোঁজের সময় সংক্রান্ত তথ্য স্পষ্ট না হওয়ায় তদন্তের শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। তারা চান, জেলিন কীভাবে, কখন এবং কার মাধ্যমে নিখোঁজ হলেন; এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হোক।
জেলিনকে উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাকে উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে তাদের কাছে ১৮ দিন পর জেলিনের মোবাইল ফোন উদ্ধার ছাড়া আর কোন অগ্রগতি নেই।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। পুলিশের সব শাখা নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে সব ধরনের অপারেশন পরিচালনা করছে।’
তবে পরিবারের প্রশ্ন, যদি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক শাখা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে থাকে, তাহলে দুই মাসেও কেন তার অবস্থান সম্পর্কে সামান্যতম নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেল না?
জেলিন নিখোঁজের ঘটনায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেন বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক হাফিজ আহমদ।
৮ জুলাই নিখোঁজ হওয়ার পর দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুই মাস। কিন্তু জেলিনের সন্ধান এখনো অধরা। তার মৃত্যু হয়েছে কি না, তাকে কেউ অপহরণ করেছে কি না, নাকি তিনি কোনো কারণে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে আছেন-কোনোটিই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিপণের দাবিও আসেনি। আবার কোনো মরদেহ বা এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি, যার মাধ্যমে তার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
নিখোঁজের দুই মাস পরও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একটি বিমানবন্দর আবাসিক এলাকা থেকে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা কীভাবে নিখোঁজ হলেন, সে বিষয়ে তদন্তে কী কী তথ্য পাওয়া গেছে, কোন কোন সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে এবং এতদিনে তার অবস্থান শনাক্তে কী ধরনের প্রযুক্তিগত বা গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো হয়েছে; এসব বিষয় নিয়ে পুলিশের কোনো স্পষ্ট ভাষ্য নেই।
পরিবারের প্রত্যাশা, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের স্পষ্টভাবে জানানো হবে এবং জেলিনকে উদ্ধারে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
Related News
নিখোঁজের ৬০ দিনেও সন্ধান নেই ওসমানী বিমানবন্দর কর্মকর্তা জেলিনের
Manual7 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: নিখোঁজের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি সিলেট ওসমানীRead More
সিলেটে বিদেশগামী যাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা, মেডিকেল সেন্টারকে জরিমানা
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বিদেশগামী যাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণা, কোনো পরীক্ষা ও রক্তের নমুনাRead More



Comments are Closed