ছাতকে ৪৪ বছরের ইমামতি জীবনের সমাপ্তিতে মৌলভী কবির আহমদের রাজকীয় বিদায়ী সংবর্ধনা
আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক থেকে: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী খাইরগাঁও (রামপুর) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সম্মানিত ইমাম ও খতিব মৌলভী কবির আহমদকে দীর্ঘ ৪৪ বছরের ইমামতি জীবনের সমাপ্তি উপলক্ষে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও রাজকীয় বিদায়ী সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে।ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আবেগ ও কৃতজ্ঞতায় ভরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, আলেম-ওলামা, ইমাম-খতিব, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মুসল্লিরা।
গত ১২ জুন শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে খাইরগাঁও (রামপুর) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বিদায়ী সংবর্ধনা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এলাকার প্রবীণ মুরব্বি নুরুল আমিন। আব্দুল লতিফ ও ফারুক আহমদের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন হাফিজ রাহাত আহমদ। পরে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সালেহ আহমদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দক্ষিণ ছাতকের কৃতি সন্তান ও পালপুর জালালিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক মাওলানা শাহাব উদ্দিন সালেহী। এছাড়াও অনুষ্ঠানে রামপুর, কল্যাণপুর, জটি, পালপুর, মুক্তারপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মুসল্লি, আলেম-ওলামা, শিক্ষক, সমাজসেবক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, একজন ইমামের দায়িত্ব শুধু নামাজ পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় পথপ্রদর্শক। সেই বিবেচনায় মৌলভী কবির আহমদ একজন সফল ইমাম, খতিব ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে দীর্ঘ ৪৪ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইসলামের শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে মসজিদকে কেন্দ্র করে এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সুসংগঠিত হয়েছে।
বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মৌলভী কবির আহমদ। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ৪৪ বছরের ইমামতি জীবনে আমি শুধু রামপুর গ্রামের মানুষের নয়, আশপাশের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছি। আমার জীবনের সুখ-দুঃখের প্রতিটি মুহূর্তে এলাকাবাসী পাশে দাঁড়িয়েছে। আমি যখন অসুস্থ হয়েছিলাম, তখন আপনারা আমার চিকিৎসার খরচ বহন করেছেন। আল্লাহর ঘর ও দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি আপনাদের ভালোবাসা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এলাকাবাসীর সহযোগিতায় আমি পবিত্র ওমরা পালনের সুযোগ পেয়েছি। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজকের এই সম্মাননা আমার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মরণীয়। আমি কখনো এই ভালোবাসা ভুলতে পারব না। যদি আমার দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে, তাহলে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমার জন্য দোয়া করবেন।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা শাহাব উদ্দিন সালেহী বলেন, “মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়াই একজন আলেম ও ইমামের সবচেয়ে বড় অর্জন। সম্পদ বা পদ-পদবি নয়, মানুষের ভালোবাসাই প্রকৃত সম্মান। মৌলভী কবির আহমদ সেই সম্মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দ্বীনি খেদমত করে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের ইমাম ও আলেমদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে একজন মানুষের প্রতি জনগণের ভালোবাসা কত গভীর হতে পারে। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেভাবে তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ নেক হায়াত এবং পরবর্তী জীবনের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করছি।”
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে মৌলভী কবির আহমদের হাতে সম্মাননা স্মারক (ক্রেস্ট) এবং নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত মুসল্লিরা করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করেন। সম্মাননা গ্রহণের সময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই তাঁদের প্রিয় ইমামকে শুভেচ্ছা ও দোয়া জানান।
পরে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং বিদায়ী ইমাম মৌলভী কবির আহমদের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মৌলভী কবির আহমদ শুধু একজন ইমাম হিসেবেই নয়, একজন অভিভাবক ও পরামর্শদাতা হিসেবেও এলাকার মানুষের পাশে ছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক বিরোধ এবং ধর্মীয় বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর সততা, বিনয় ও আন্তরিকতার কারণে তিনি সবার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
রামপুর গ্রামবাসী ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় আয়োজিত এই বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আন্তরিকতা ও আবেগঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত মুসল্লি ও গ্রামবাসীরা ভালোবাসা ও সম্মানের নিদর্শন হিসেবে বিদায়ী ইমাম ও খতিব মৌলভী কবির আহমদকে গাড়িযোগে তাঁর নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেন। এ সময় পথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে অনেকেই তাঁকে শুভেচ্ছা ও বিদায় জানান।
এলাকাবাসীর মতে, একজন ইমামের প্রতি এমন ভালোবাসা ও সম্মান বিরল ঘটনা। দীর্ঘ ৪৪ বছরের নিরলস দ্বীনি খেদমতের স্বীকৃতি হিসেবে এই বিদায়ী সংবর্ধনা স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যতেও এলাকার মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে।
Related News
গাইবান্ধার তরুণী সুনামগঞ্জে, ৪ সন্তানের জনকের ঘরে অনশন
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুখের আশায় স্বামী সন্তান ছেড়ে ৬৫ বছরের বৃদ্ধের সাথেRead More
জগন্নাথপুরে সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল এক পরিবার
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর শহরের স্লুইসগেট এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বী একRead More



Comments are Closed