ছড়াকার মিলু কাসেম: সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতির উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের বিদায়
আনোয়ার হোসেন রনি: সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত প্রিয়মুখ, প্রগতিবাদী কবি, লেখক, সাংবাদিক, শিশু ও ভ্রমণ সাহিত্যিক, সংগঠক সৈয়দ আবুল কাসেম মিলু আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সাহিত্যজগতে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন ‘মিলু কাসেম’ নামে। তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণে সিলেটসহ পুরো সাহিত্য অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
শৈশব-কৈশোরের শুরু খাসদবীর-বড়বাজারে;
মিলু কাসেমের জন্ম সিলেট নগরের খাসদবীরে। তবে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে পাশের বড়বাজার এলাকায়। দুটি মহল্লা কাছাকাছি হওয়ায় তিনি ছিলেন একইসাথে দুই এলাকার আপন মানুষ। পাড়ার বড় ভাই হিসেবে তিনি কিশোরদের কাছে ছিলেন রহস্যময় এবং খানিকটা ভীতিকর—রাশভারী চেহারা, কম কথার মানুষ, সকালে বেরিয়ে রাত গভীর করে ফেরা। আড্ডায় তাকে দেখা যেত না প্রায়ই। সেই সময় পাড়ার কিশোরদের মনে মিলু ভাই হয়ে উঠেছিলেন এক ‘দূরের মানুষ’। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তাঁদের সাহিত্যচর্চার সূচনা হয়, তখনই আবিষ্কৃত হয় নতুন এক মিলু ভাই—সদালাপী, হাস্যোজ্জ্বল, আন্তরিক, উৎসাহদাতা। বাইরের কাঠখোট্টা ভাবের আড়ালে লুকানো ছিল এক উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, উদার মানুষ।
যুগভেরী ও ছড়াসাহিত্য সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটের প্রভাবশালী সাহিত্যপত্রিকা যুগভেরী–তে নিয়মিত লিখতেন মিলু কাসেম। সে সময় নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন সাংবাদিক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তাঁর হাত ধরে গড়ে ওঠা শাপলার মেলা সংগঠনের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন মিলু কাসেম। তখন থেকেই ছড়া, কবিতা ও সাহিত্যচর্চায় তিনি নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে শুরু করেন। ছড়ার জগতে তাঁর আলাদা স্বাক্ষর তৈরি হয় খুব দ্রুত। ঢাকার প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সিলেটে যৌথ কাব্যগ্রন্থ ও ছড়াগ্রন্থ প্রকাশের যে প্রবণতা নব্বইয়ের দশকে তুঙ্গে ওঠে, তার আগেই মিলু কাসেম সেই ধারা তৈরি করেছিলেন।
সাংবাদিকতায় মনোযোগ যদিও তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান ছড়াকার ও সাহিত্যিক, কিন্তু জীবনের পরবর্তী সময়ে মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। নিয়মিত সংবাদপত্রে কাজের ব্যস্ততায় সাহিত্য থেকে কিছুটা দূরে সরে আসেন। তবুও তাঁর লেখা ছড়া পাঠকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
প্রজন্মকে পথ দেখানো নবীন ছড়াকার ও লেখকদের প্রতি তাঁর ছিল আলাদা টান। একজন তরুণ সাহিত্যকর্মী যখন প্রথমবার সাহিত্যের চর্চায় নামেন, তখন মিলু ভাই-ই তাকে এগিয়ে দেন। যৌথগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনায় তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেখা দেন, আবার ঢাকার লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে নিজের হাতে সুপারিশপত্র লিখে দেন।
সে সময় ঢাকায় গিয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের ‘ছোটদের কাগজ’–এর অফিসে যখন তরুণরা লুৎফর রহমান রিটনের হাতে মিলু ভাইয়ের লেখা চিঠি তুলে দেন, তখনই তাঁদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায় ঢাকার খ্যাতনামা লেখক-সাহিত্যিকদের দরজা। এরই সূত্রে পরিচয় ঘটে রফিকুল হক দাদু ভাই, শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামসহ প্রখ্যাত অনেকের সঙ্গে। সেই বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সূচনাকারী ছিলেন মিলু কাসেম।
এক ভিন্ন মানুষ ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বন্ধুবৎসল, বিনয়ী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মুক্তমনা এক মানুষ। পাড়ায়-প্রতিবেশে তিনি সকলের প্রিয় ছিলেন। তবে ছোটবেলার সেই ভয় মেশানো শ্রদ্ধা অনেকের ভেতরই আজীবন রয়ে গেছে।
সাহিত্য অঙ্গনে শূন্যতা সিলেট ইতোমধ্যেই হারিয়েছে সাংবাদিক মহিউদ্দিন শীরু, সাইফুল চৌধুরী, ফতে ওসমানী, আজিজ আহমদ সেলিম, অজয় কুমার পাল (অজয় পাল), আনফর আলী প্রমুখকে। তাঁদের হারানোর শোক কাটতে না কাটতেই বিদায় নিলেন ছড়াকার মিলু কাসেম। সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ হবে কি না, সে প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
মৃত্যু: চিরন্তন সত্য মৃত্যু অনিবার্য, জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে—সবই বিধাতার হাতে। কিন্তু কিছু মৃত্যু থাকে, যা শুধু পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকে নয়, পুরো সমাজকে কাঁদায়। মিলু কাসেম ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিসম্পন্ন মানুষ। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যমে নেমে আসে শোকের ছায়া।
সাক্ষাৎকার নেওয়ার অসম্পূর্ণ ইচ্ছে সিলেটের সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ সময়ের পথিক ছিলেন তিনি। তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়ে রাখার ইচ্ছে বহুবার জেগেছিল অনেকের মনে, কিন্তু নানা কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। আর হঠাৎ তাঁর প্রয়াণে অপূর্ণ রয়ে গেল সেই ইচ্ছে।
বিদায় প্রিয় ছড়াকার সাহিত্যপ্রেমীরা বলছেন—কৈশোরের তারকাদের ভিড়ে মিলু ভাই ছিলেন তাঁদের অন্যতম প্রিয় ছড়াকার। তাঁর মতো লিখতে চেয়েছিলেন, তাঁর মতো হতে চেয়েছিলেন। আজ তাঁকে সরাসরি আর বলা সম্ভব নয়, তাই লিখিত স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল সেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
সমবেদনা সৈয়দ আবুল কাসেম মিলুর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। মহান আল্লাহ তাঁর পরিবারকে শোক সইবার শক্তি দান করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আ-মিন।
উল্লেখ্য, সাংবাদিক ছড়াকার ভ্রমণ বিষয়ক লেখক মিলু কাশেম গত সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে নগরীর রাগিব রাবেয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাদ জোহর নগরীর খাসদবীরে দারুস সালাম মাদ্রাসা মসজিদে জানাজা শেষে মাদ্রাসা সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মিলু কাশেম ১৯৫৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পারিবারিক নাম আবুল কাশেম মিলু। সিলেট নগরের আম্বরখানা বড় বাজার এলাকায় তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
মিলু কাশেমের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্মৃতির সিলেট, পদ্মপাতায় প্রীতির নাম, লাল সবুজের হাসি দেশকে ভালোবাসি, স্বাধীনতার কবিতা এবং ইউরোপ থেকে বাংলাদেশ।
Related News
জালালপুরে সিলেটি পাঠাগার-এর শুভ উদ্বোধন
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তপাঠRead More
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য আর মানবতার অবিনাশী উচ্চারণে বাংলা সাহিত্যকেRead More



Comments are Closed