Main Menu

পারিবারিক শান্তির জন্য মহানবী (সাঃ) এর কিছু পরামর্শ

Manual3 Ad Code

হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: প্রিয় নবীজি (সা.)-এর আগমন ছিল সারা জগতের জন্য রহমতস্বরূপ। ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ, সবার জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। বংশ-বর্ণ-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নবী আদর্শে রয়েছে সফল জীবনযাপনের দিকনির্দেশনা।

বৈবাহিক জীবনে সব দম্পতিই একটি সুখময় জীবনের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত অনেক বিষয়ই এ স্বপ্নের মধ্যে আড় হয়ে দাঁড়ায়, যা কখনো কখনো স্থায়ী পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়, কখনো বা এর পরিণতি দুজনের বিচ্ছেদ; যার প্রভাব শুধু দুজন মানুষের ওপর নয়, বরং দুটি পরিবার ও তাদের সন্তান-সন্ততির ওপর পড়ে।

নবীজি (সা.)-এর বিস্তৃত জীবন অধ্যায়ে পরিবার গঠনমূলক এমন কিছু কার্যকর দিকনির্দেশনা আছে, যা অনুসরণ করে চললে যে কেউ অতীতের সব দাম্পত্য কলহের অবসান ঘটিয়ে নতুন করে একটি সুখী পরিবার গঠনে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

পরিবারকে সময় দেওয়া :

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয়তম সাহাবি হজরত উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, আমি একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উভয় জাহানের মুক্তির পথ কী, তা জানতে চাইলাম। উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনটি উপদেশ দিলেন।

এক. কথাবার্তায় আত্মসংযমী হবে। দুই. পরিবারের সঙ্গে তোমার অবস্থানকে দীর্ঘ করবে। তিন. নিজের ভুল কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৬)

পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ যে রাসুল (সা.) তা উভয় জাহানের সফলতার পথ ও পাথেয় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে তা একটি আদর্শ পরিবার গঠনে যে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে, তা তো স্পষ্ট। অবশ্য এখানে এটিও লক্ষণীয় যে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান যেন নিছক দৈহিক উপস্থিতিই না হয়। যেমন- ঘরে তো আছি কিন্তু টিভি, মোবাইল বা ব্যক্তিগত কাজে এতটাই নিমগ্ন, যা সঙ্গিনীর জন্য আরো বেশি পীড়াদায়ক।

ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করা :
স্ত্রীকে ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করা অনেকের কাছে খানিকটা লজ্জার বিষয় মনে করা হয়। এটি ঠিক নয়। নবীজির প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, নবীজি কি পরিবারের লোকদের তাদের ঘরোয়া কাজে সহযোগিতা করতেন? তিনি বললেন- হ্যাঁ, নবীজি ঘরের লোকদের তাদের কাজে সহযোগিতা করতেন এবং নামাজের সময় হলে নামাজের জন্য যেতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬) এ ছাড়া অন্যান্য হাদিসে ঘরোয়া কাজের বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, রাসুল (সা.) নিজ হাতেই তাঁর পরিধেয় কাপড় সেলাই করতেন। প্রয়োজনে নিজের জুতা নিজেই সেলাই করে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৭৫৬)

Manual2 Ad Code

ব্যক্তিগত কাজে সঙ্গিনীর মতামত নেওয়া:
চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গিনীর মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয় না বা নিষ্প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। এটি আদৌ উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু ঘরোয়া বিষয়ই নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রেও নিজের স্ত্রীদের থেকে মতামত নিতেন। ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামক ইসলামী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে নবীজি স্বীয় স্ত্রী উম্মে সালমা (রা.)-এর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময় যা অতি কার্যকরী বলে বিবেচিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ২৭৩১)

সঙ্গিনীর প্রতি ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করা:
হাবভাবে অনেক সময় ভালোবাসার কথার জানান দিলেও মুখে প্রকাশ করাটাকে লজ্জার বিষয় মনে করে অনেকেই। একবার বললেই দেখবেন, কথাটি শোনার জন্য সে কতটা আপেক্ষিক হয়ে ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীদের বিভিন্ন রোমাঞ্চকর কথায় আপ্লুত করে দিতেন। যেমন, হজরত খাদিজা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার মনে তার প্রতি ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৩৫) হজরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছেন, ‘সবার চেয়ে আয়েশা আমার কাছে এমন প্রিয়, যেমন সব খাবারের মধ্যে সারিদ আমার কাছে বেশি প্রিয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪১১)

Manual6 Ad Code

সঙ্গিনীর জন্য নিজেকে ফিট রাখা:
স্ত্রীর সাজগোজ এবং সুন্দর উপস্থাপন কে না পছন্দ করে? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, তারও তো ইচ্ছা জাগে আপনাকে তার মনের মতো সাজে দেখতে। হ্যাঁ, এমনটাই বলেছেন আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)। ‘আমি আমার স্ত্রীদের জন্য এমনই পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, যেমন আমি তাদের ক্ষেত্রে সাজগোজ করে থাকতে পছন্দ করি।’ (বাইহাকি, হাদিস : ১৪৭২৮)

Manual1 Ad Code

দূরত্ব কমানো, আন্তরিকতা বাড়ানো :
নবীজির পবিত্র জীবনীতে স্বীয় স্ত্রীদের সঙ্গে রোমান্টিকতার এত সব চিত্র অঙ্কিত রয়েছে, যা সত্যি একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবনের উপমা। তার থেকে আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তী সময় নবীজির সম্মানিত স্ত্রীরা এসব ঘটনার বিবরণ এতটা উচ্ছ¡াসের সঙ্গে দিয়েছেন, যা তাঁদের ভেতরকার ভাব-আবেগের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ভালোবেসে কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪) তিনি আরো বলেন, পাত্রের যে অংশে আমি মুখ রেখে পানি পান করতাম তিনি সেখানেই মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে পছন্দ করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩০০) কখনো কখনো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতাম এবং আমাকে খুশি করতে তিনি প্রতিযোগিতায় ইচ্ছা করেই নিজেকে পেছনে ফেলে দিতেন। এ ছাড়া একই সঙ্গে গোসল করা, একই প্লেটে খাবার খাওয়া, একই চাদরে রাত্রিযাপনসহ অসংখ্য রোমান্টিকতায় ভরপুর ছিল নবীজির দাম্পত্য জীবন।

Manual5 Ad Code

দাম্পত্য কলহের জের ধরে শত শত পরিবারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে মিডিয়ার অবদানে হয়তো খুব ক্ষুদ্র অংশের ব্যাপারেই আমাদের জানা থাকে। বাস্তবতা হয়তো এর চেয়েও বেশি ভয়াবহ। স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামীর খুন হওয়া এটি তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কখনো এ কলহের রোষানলে পড়ে জীবন হারায় নিষ্পাপ সন্তান-সন্ততি।

আমরা যদি হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের-আদর্শের এ ছোট ছোট বিষয় আমল করি, আশা করি তা আঁধারে আলোর প্রদীপ হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও কলামিস্ট। সাবেক ইমাম ও খতিব কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ্ (রহ.) মাজার জামে মসজিদ সিলেট। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code