Main Menu

শাওয়াল মাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: হিজরি ক্যালেন্ডারের দশম মাস শাওয়াল। আল্লাহ তায়ালা যে তিনটি মাসকে হজের জন্য নির্ধারণ করেছেন, তা হলো শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ। এ মাসগুলোকে ‘আশহুরুল হজ’ বলা হয়। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে পালিত হয় ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর দয়াময় প্রতিপালকের কাছে প্রতিদান লাভের আশায় মুসলমানরা ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করে। ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির একই কাতারে দাঁড়ায়। ঈদুল ফিতরের দিনে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ও ঈদের সালাত আদায় করা ওয়াজিব। এই মাসে নফল রোজা পালন করা অন্যান্য আমল যেমন, দান-সাদকা করা, অসহায় ও দুর্বলদের সাহায্য করা, অভুক্তকে খাদ্য দান করা, অসুস্থ মানুষের সেবা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এক কথায় এই মাস নফল ইবাদত-বন্দেগির জন্য খুবই উপযোগী।

শাওয়াল শব্দের তাৎপর্য : হিজরি বারো মাসের নামগুলোর মতো ‘শাওয়াল’ শব্দটিও আরবি। এর অর্থ হলো উঁচু করা, উন্নত করা, পূর্ণতা লাভ করা, বিজয়ী হওয়া ইত্যাদি। কারণ এ মাসের নেক আমলের মাধ্যমে মানুষের উন্নতি হয়, অপূর্ণ মানুষ আল্লাহর কাছে পূর্ণতা লাভ করে; ফলে আল্লাহর কাছে মকবুল হয়। কেউ কেউ বলেন, শাওয়াল শব্দটি ‘শাওল’ মূলধাতু থেকে নির্গত। এর অর্থ বাইরে গমন করা। এ মাসে আরববাসী ঘরবাড়ি ত্যাগ করে বাইরে ভ্রমণ করত। তাই এর শাওয়াল নামকরণ করা হয়ে থাকে। দীর্ঘ এক মাস রোজা পালন করার পর আল্লাহর বান্দারা পুনরায় শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা পালন করে। এই মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঈদুল ফিতরের আনন্দ শুরু হয়। বছরের মধ্যে যে পাঁচটি রাতে দোয়া কবুল হয় তম্মধ্যে ঈদুল ফিতর অন্যতম। অন্য চারটি হলো জুমার রাত, ঈদুল আজহার রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শাবানের চৌদ্দ তারিখ রাত। (সুনানে বায়হাকি : ৩/৩১৯)

শাওয়ালের ছয়টি রোজা সুন্নত : এই মাসে ছয়টি রোজা রাখা সুন্নত এবং অতীব বরকতপূর্ণ আমল। এ রোজাগুলো লাগাতার অথবা ভেঙে ভেঙে আদায় করা যায়। হজরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন বছরজুড়ে রোজা রাখল। (মুসলিম : ২৮১৫; তিরমিজি : ৭৫৯)। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি নেকির বিনিময়ে দশগুণ দান করেন। আল্লাহ বলেন, ‘কেউ সৎ কাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে এবং কেউ অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে। আর তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।’ (সুরা

আনআম : ১৬০)। সুতরাং রমজানের ফরজ রোজার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়ালের ছয় রোজা মিলে হয় ৩০ গুণ ৬ ৩৬। আর প্রতিদান হিসাব করলে ৩৬ গুণ ১০ ৩৬০। অর্থাৎ, বছরের প্রতিদিন রোজার সওয়াব দেওয়া হবে। বাকি পাঁচ দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখে অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে সে সদ্য ভূমিষ্ট শিশুর মতো পাপ মুক্ত হয়ে যায়। (আল মুজামুল আওসাত : ৮/২৭৫, ৮৬২২)

শাওয়ালের ছয় রোজা রাখার নিয়ম : রাসুলে করিম (সা.) শাওয়ালের ছয়টি রোজা পালন করতেন এবং সাহাবাদেরকে আমলের নির্দেশ দিতেন। সফরের কারণে মুসাফিরকে রমজান মাসের রোজা ছাড় দেওয়া হয়েছে, অনুরূপভাবে ঋতুবতী স্ত্রী লোকদের বেলায়ও উক্ত দিনসমূহের রোজা ছাড় দেওয়ার অনুমতি ছিল। যেমন, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমার ওপর রমজানের যে কাজা রোজা বাকি থাকত, তা পরবর্তী শাবান মাস ব্যতীত আমি আদায় করতে পারতাম না। (বুখারি : ১৯৫০; মুসলিম : ১১৪৬)। সুতরাং বোঝা গেল ভাংতি রোজাগুলো পরবর্তী রোজা আসার পূর্বে যেকোনো সময় রাখা যাবে। তাই শাওয়ালের ছয়টি রোজা কাজা রোজা আদায়ের আগেও রাখা যাবে। তবে সম্ভব হলে ফরজ রোজার কাজা আগে আদায় করা উত্তম।

শাওয়াল মাসের ঐতিহাসিক ঘটনা : এই মাসে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। তৃতীয় হিজরির ৭ শাওয়াল (২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রি.) ঐতিহাসিক উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই মাসে হজরত লুত (আ.)-এর জাতি ধ্বংস হয়েছিল, হজরত আদ (আ.)-এর জাতি বায়ুতে ধ্বংস হয়েছিল, হজরত সালিহ (আ.)-এর জাতির ওপর আসমানি শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিল। আর আখেরি জামানার পয়গাম্বর হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের মধ্যে যারা রমজানের রোজা পালন করেন তারা সবাই আল্লাহর মেহমান হয়ে যান। শাওয়ালে প্রথম দিনে সবাইকে আল্লাহ তায়ালা মেহমানদারি করেন। ফলে ওই দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ।

শাওয়াল মাস বিয়ের জন্য উত্তম : এ মাসে প্রিয়নবী (সা.)-এর সঙ্গে আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিল। আর তিনি নবীজির ঘরেও আগমন করেছিলেন এই মাসে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে বিয়ে করেছেন শাওয়াল মাসে, শাওয়াল মাসেই আমাদের বাসর হয়। আর হজরত আয়েশা তার (সম্পর্কীয়) মেয়েদের বাসর হওয়া পছন্দ করতেন শাওয়াল মাসে। ইসলামপূর্ব যুগে কোনো কোনো লোকের ধারণা ছিল শাওয়াল মাসে বিয়ে অশুভ ও অকল্যাণকর। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) এ ধারণাকে খণ্ডন করে বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে শাওয়াল মাসেই বিয়ে করেছেন, শাওয়াল মাসেই বিয়ে-রজনী উদযাপন করেছেন। অথচ তার অনুগ্রহ লাভে আমার চাইতে সৌভাগ্যবতী স্ত্রী আর কে আছে? (মুসলিম : ১৪২৩)। হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের দুই বছর পর শাওয়াল মাসে নবীজি (সা.) হজরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শাওয়ালের ছয় রোজা ও অন্যান্য সব ফজিলত অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

Share





Comments are Closed