Main Menu

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : বাংলা ১৩৫৯ সালের ৮ই ফাল্গুন। যা আজ ৬১ বছর ধরে এ দেশ মাতৃকায় একুশে ফেব্রæয়ারি নামে ভাষা আন্দোলনের স্মরণ দিবস হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্যের সাথে উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৯৯ সাল থেকে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষা ব্যবহার এবং তার মর্যাদা রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন হয়েছে এবং হচ্ছে। যথা তুরস্ক, বুলগেরিয়া, মধ্য এশিয়ার অঞ্চলসমূহ এবং ভারতের উত্তর প্রদেশ। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দীপ্ত শপথ নিয়ে বাংলার কিছু অকুতোভয় বীর সন্তান নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে রচনা করে এক সূর্যস্নাত রক্তিম ইতিহাস। যা ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যকে আরো গভীরে নিয়ে গেছে। অথচ এখানে একটি প্রশ্ন প্রায়ই অনেকের মনে দোলা দেয়, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ইসলামের ভূমিকা কী? এ নিয়ে আলোচনার অবতারণা।

ভাষা শব্দের অর্থ: মনের ভাব প্রকাশের ভঙ্গিই ভাষা। তা কণ্ঠধ্বনির মাধ্যমে হোক বা অন্য কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গর ইশারার মাধ্যমে হোক। ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে ড. রামেশ্বর বলেন: ‘মানুষের বাকযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত কতকগুলো ধ্বনিগত ভাব সংকেত বা প্রতীক সমষ্টির নাম।’ (ড. রামেশ্বর, সাধারণ ভাষা বিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, (কলিকাতা, ১৩৯৯ বাং), পৃ. ৮।)

ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে Henry Sweet বলেন : ‘Language is the expression of ideas by means of speech-sounds combined into words. Words are combined into sentences, this combination answering to that of ideas into thoughts.(Encyclopedia of Britanica, (London: encyclopedia Britanica, Inc.1980), Vol. 10, P. 642.)

ভাষা বিজ্ঞানী Edgar. H. Sturtevant বলেন : ‘A language is a system of arbitrary vocal symbols by which members of a social group Co-operate and interect.(Edger H. Sturtevant, An introduction to languistic Science, (New Haven:Yale University Press, 1947), Chapter-1)

মানুষ সামজিক জীব। এজন্য তাকে অন্য মানুষের সাথে ভাব বিনিময় করতে হয়। এভাবে বিনিময়ের জন্য যে সব সংকেত প্রতীক ব্যবহৃত হয় তাই ভাষা, এভাবে বিশ্লেষণ করলে ভাষার চারটি মূল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়: ক. এ কতগুলি ধ্বনির সমষ্টি, খ. এ ধ্বনি কণ্ঠনিঃসৃত, গ. এটি একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থা, ঘ. এ ধ্বনিগুলো বস্ত্ত বা ভাবের প্রতীক। ভাষাবিজ্ঞানীগণ উল্লেখিত প্রতীককে Agreed vocal system which is also arbitpary-বলে উল্লেখ করেছেন। (Barnard Block & Goerge Tregar, Outline of linguistic Analysis, (America Baltimore, 1942); ড. মো: আঃ আউয়াল, ভাষাতত্তে¡র সহজকথা, (ঢাকা : গতিধারা প্রকাশনী, ২০০০ খ্রি.), পৃ. ১১।)

ভাষার সংজ্ঞা প্রদানে আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ বলেন: ভাষা হচ্ছে মানুষের ভাব বিনিময় ও প্রকাশের প্রতীকী প্রত্যয় বিশেষ। এটি ধ্বনি ও ইশারা ও ইঙ্গিত উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। তবে পারিভাষিক অর্থে কারো কণ্ঠনিঃসৃত অর্থবোধক ধ্বনিকেই ভাষা নামে অভিহিত করা হয়। (আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, আধুনিক ভাষাতত্ত¡, (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫ খ্রি.), পৃ. ১)

আন্দোলন শব্দের অর্থ : ‘আন্দোলন’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য প্রচার বা আলোচনা দ্বারা উত্তেজনা সৃষ্টিকরণকেই আন্দোলন বলে।(সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পা. প্রফেসর আহমদ শরীফ, (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯২), পৃ. ৪৫।)

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা মানুষ তার শৈশবকাল থেকে কথা বলতে শিখলেও তার ভাষা শুদ্ধ হবে, এমন কথা ঠিক নয়। কোন ভাষায় শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও সাবলীলভাবে কথা বলতে হলে, সাহিত্য তৈরী করতে হলে সে ভাষা চর্চা করতে হবে। এজন্য পড়তে হবে, বিশেষ বিশেষ বক্তব্য আত্মস্থ করতে হবে, আবৃত্তি করতে হবে, ভাষাশৈলীর রহস্য জানতে হবে, অনুসরণ করতে হবে। তা হলেই একজন মানুষ বাগ্মী ও পরিশীলিত বক্তব্যের অধিকারী হতে পারে। ইসলাম মানুষের ভাষাকে বিভিন্নভাবে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়েছে। আর তা হলো, মানুষ জন্মলগ্ন থেকে যে ভাষায় কথা বলে, বড় হয়ে উঠে, সে ভাষায় কথা বলার অধিকার তার জন্মগত অধিকার ও সহজাত প্রবৃত্তি। ফলে এটা তার অস্থিমজ্জা, রক্ত মাংসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত হয়ে যায়। তাই ইসলাম মানুসের এ অধিকার কেড়ে নেয় না। মায়ের প্রতি একটি সন্তানের আকর্ষণ যেমন স্বাভাবিক, কারো মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণও তেমনি স্বাভাবিক। স্বভাব ধর্ম ইসলাম মানুষের এ স্বাভাবিক আকর্ষণ সহজেই স্বীকার করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘অতএব (হে নবী), তুমি নিষ্ঠার সাথে নিজেকে সঠিক দ্বীনের ওপর দৃঢ় রাখো, আল্লাহ্ তা’আলার প্রকৃতির ওপর (নিজেকে দাঁড় করাও), যার ওপর তিনি মনুষকে পয়দা করেছে; (মনে রেখো) আল্লাহ্র সৃষ্টির মাঝে কোনো রদবদল নেই। (সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৬১-৬২)

এ হচ্ছে সহজ জীবনবিধান, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। ২৬ আল-কুরআন, সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০। আল্লাহ্ তা’আলা মানুষের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে তাঁর প্রেরিত প্রত্যেক নবীকে স্বজাতির ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এ ভাষাতেই কিতাবাদি নাযিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য, আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (আল-কুর’আন, সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪) আর এ কারণেই আল-কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে।

ইসলাম মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব অবৈধ মনে করে না বরং বর্ণিত আছে, রাসূল সাঃ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন: ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুফলিত। তোমাদের চাইতেও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত। (ইবনুল ‘আরাবী, আল-মু’জাম, প্রাগুক্ত, খ. ৫, পৃ. ৩৫৫, হাদীস নং-২৩৪৫)

এর কারণ তিনি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে আমি মানুষ হয়েছি। তাদেরই কোলে আমার মুখ ফুটেছে। তাই আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষা ব্যক্ত করেছি।

কাজেই মাতৃভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। সকলেই মাতৃভাষা চর্চার, একে উন্নত করার অধিকার রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে কাজ করা কর্তব্যও বটে। মূল আরবী ভাষা এক হলেও আরবদের গোত্রভেদে উচ্চারণ ও পঠনরীতির মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে। যাকে কেন্দ্র করে একই অর্থের বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় যাকে আরবী পরিভাষায় মুরাদিফাত বলে।

বিদেশি ভাষা শিক্ষা বা ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ভাষা শিক্ষা করতে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত যাইদ ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ)কে তার মেধা দেখে নির্দেশ দিলেন। যাইদ ইবনে সাবিত (রাঃ) বলেন, আমি মাত্র ১৫/১৭ দিনের মধ্যে তাদের ভাষা শিক্ষা করি।এরপর রাসূল্লাহ (সা) তাদের কিছু লিখতে চাইলে আমি তা লিখে দিতাম। এবং ইয়াহুদী-খৃস্টান কিছু লিখলে আমি তা তাকে পড়ে শুনাতাম। (সহীহ্ বুখারী, খ–৬, হা: ২৬৩১; ইবনু হিব্বান, ১৬/৮৪, ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী, ১৩/১৮৬-১৮৭)

যাহোক, আল-কুর’আন মূলত ভাষা ও উচ্চারণ রীতিকে প্রাধান্য দিয়েই অবতীর্ণ হয়। কিন্তু ইসলাম ভাষাগত আঞ্চলিকতা তথা মাতৃভাষা প্রতি এতই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল-কুরআন আরবের বিভিন্ন পঠনরীতিতে পাঠ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ জন্য কুরআন পাঠ সাত ক্বিরআত (পঠনরীতি) প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘রাসূল সাঃ বলেছেন: নিশ্চয়ই কুরআন সাত হরফে বা উপভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব, এসকল ভাষার মধ্যে যে ভাষাটি (তোমাদের কাছে) সহজ হয়, সে ভাষাতেই তোমরা তা পাঠ কর।’

মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণ ও ভালবাসা মাতৃভূমির প্রতি প্রেমের ন্যায় ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়। মহানবী সাঃ বলেছেন: ‘মাতৃভূমির প্রতি ভালবাসা ঈমানের অঙ্গ।’’

অতএব মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। উভয়টি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণের অন্যতম উৎস। কেননা, মাতৃভাষা মানুষের পবিত্র এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। এ ভাষার মধ্যে মানুষ অংকুরিত হয়। এ ভাষার মধ্যে মানুষ সর্বদা প্রবাহিত থাকে। এ ভাষায় তাদের অস্তিত্ব স্বাক্ষরিত হয়।

ভাষা বিকৃতি করাও ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ, আহলে কিতাবগণ বিকৃত উচ্চারণ ও মুখ বাঁকিয়ে গ্রন্থ পাঠ করে ভাষাগত জটিলতা সৃষ্টি করত এবং তাদের অনুসারীদের ধোঁকা দিত। আল্লাহ্তা’আলা তাদের এ ভাষাগত বিকৃতি পছন্দ করেননি। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘আর তাদের মধ্যে একদল রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে, অথচ তারা যা পাঠ করছে তা আদৌ কিতাব নয় এবং তারা বলে : এসব কথা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নাযিল কৃত অথচ এসব আয়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নয়। তারা বলে : এটি আল্লাহর কথা, অথচ আল্লাহর কথা নয়; আর তারা জেনে শুনে আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যারোপ করে।’ (আল-কুর’আন, সূরা আলে ‘ইমরান, আয়াত:৭৮)

অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, ‘কোন কোন ইয়াহুদী তার লক্ষ্য থেকে কথার মোড় ঘুরিয়ে নেয় এবং বলে: আমরা শুনেছি কিন্তু অমান্য করছি। তারা আরো বলে: শোন না শোনার মত, মুখ বাঁকিয়ে দ্বীনের প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শণের উদ্দেশ্যে বলে ‘রায়িনা’ (আমাদের রাখাল), অথচ যদি তারা বলত: আমরা শুনেছি ও মান্য করেছি (এবং যদি বলত), শোন এবং আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখ, তবে সেই ছিল তাদের জন্য উত্তম, আর সেটাই ছিল যথার্থ ও সঠিক। কিন্তু আল্লাহ্ তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন তাদের কুফরীর ধরণ। অতএব, তারা ঈমান আনছে না, কিন্তু অতি অল্প সংখ্যক ঈমান এনেছে। (আল-কুর’আন, সূরা আন-নিসা, আয়াত :৪৬)

অতএব উচ্চারণ বিকৃতি তথা ভাষা বিকৃতি ইসলামে নিষিদ্ধ। এ জন্য দেখা যায়, মূসা (আ:) স্বীয় ভাষায় উচ্চারণ বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্তে আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করেছিলেন- ‘আর আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।’ (আল-কুর’আন, সূরা ত্বাহা, আয়াত: ২৭-২৮)

কাজেই ভাষার বিকৃতি পরিত্যাজ্য। কারণ, ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ বিকৃতি করতে করতে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তখন মানুষ তার কথা শুনতে পছন্দ করে না। সুতরাং উচ্চারণ বিকৃতি বৈধ নয়; বরং ভাষার মাধূর্য বৃদ্ধির জন্য সকলতে আল্লাহর কাছে দু’আ করা উচিত।

মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা বান্দার জন্য যত নেয়ামত দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের ভাষা বা মনের ভাব প্রকাশের জন্য তাদের মাতৃভাষা। তাই মানুষের চিন্তা চেতনা ও মনের ভাব প্রকাশের সর্বোত্তম উপার হলো মাতৃ ভাষার মাধ্যমে তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম। আর এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্য সকল প্রাণী থেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছেন। মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা ঘোষণা করেন : “দয়াময় আল্লাহ্, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ‘বয়ান’ বা ভাব প্রকাশের ক্ষমতা তথা প্রত্যেকের মাতৃভাষা।” (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১-৪)

এই পৃথিবীর বৈচিত্র্য আল্লাহ্র অসীম কুদরতের নিদর্শন। পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য সকল সৃষ্টির বৈচিত্র্যের ন্যায় মানুষের ভাষার বৈচিত্র অন্যতম নিদর্শন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন: “তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা রুম, আয়াত: ২২) তাই পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি।

প্রত্যেক মানুষের কাছে তার মাতৃভূমি যেমন মর্যদার তেমনি তার নিকট মাতৃভাষার গুরত্ব অপরিসীম। তাই আল্লাহ্ তা’য়ালা যুগে যুগে মানুষকে হেদায়াতের পথে পরিচালিত করার জন্য যেসকল নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন,তাদের প্রত্যেককে স্ব-জাতির ভাষায় পাঠিয়েছেন। তারা তাদের মাতৃভাষায় মানুষদেরকে সত্যের পথে আহবান করত। মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন: “আমি স্ব-জাতির ভাষা বা মাতৃভাষা ছাড়া কোন রাসূলই প্রেরণ করিনি।” (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪)। অনুরূপভাবে পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে রাসূল (সাঃ) এর মাতৃভাষায় তথা আরবী ভাষায়। আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেন: “আমি কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি। যাতে তোমরা বুঝতে পার।” (সূরা ইউসূফ, আয়াত: ২)

এ ছাড়াও তিনি বলেন: “আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় (আরবী) সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ প্রদান এবং কলহকারী স¤প্রদায়কে সতর্ক করতে পারেন।” (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৭)

এমনি ভাবে অন্যত্র বলেন: “এমনিভাবে আমি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি এবং এতে নানাভাবে সতর্ক বাণী ব্যক্ত করেছি। যাতে তারা আল্লাহভীরু হয়। অথবা তাদের অন্তরে চিন্তার খোরাক যোগায়।” (সূরা ত্বোহা, আয়াত: ১১৩)

হযরত ঈসা (আঃ) এর উপর ‘ইনজিল’ কিতাব তার মাতৃভাষা হিরূতে নাযিল হয়েছিল। এবং হযরত মূসা (আ:) এর তাওরাত ‘সুরিয়ানী’ ভাষায় নাযিল হচ্ছিল। ইসলামের মূলনীতির ভিত্তিতে বিশ্বের সকল দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী তার মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরত্ব দিবে। আর মাতৃভাষায় অন্য সকল জ্ঞানের ন্যায় ইসলামী জ্ঞানেরও চর্চা করবে। এবং মাতৃভাষায় ইসলামী সাহিত্যকর্ম সমৃদ্ধ করবে। পাশাপাশি আরবী ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা ও গুরত্ব প্রদান করবে। কারণ আরবী ভাষাকে মর্যাদা ও গুরত্ব প্রদান করা বিশ্বের সকল ভাষার সকল মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠান পাড়া (খান বাড়ী), কদমতলী, সিলেট-৩১১১।

Share





Comments are Closed