Main Menu

আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: আধুনিক বিশ্বে মানবাধিকার একটি বহুল আলোচিত বিষয়। মানবাধিকার বলতে সরলার্থে মানুষের সহজাত অধিকারই মানবাধিকার হিসেবে পরিচিত। যে সব মানবিক অধিকার ব্যতীত মানুষ পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে মর্যাদাসহ জীবনধারণ করতে পারে না, মানবিক গুণাবলি ও বৃত্তির প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয় না সাধারণত সেগুলোই মানবাধিকার হিসেবে গণ্য। যুগে-যুগে দেশে-দেশে বিত্তবান, ক্ষমতাধর শাসক শ্রেণী কর্তৃক দূর্বল, ক্ষমতাহীন, বিত্তহীন জনগোষ্ঠী শোষিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। এ শোষিত, বঞ্চিত ও নির্যাতিত নিপীড়িত মানবতার মুক্তির লক্ষে আল্লাহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেন যাঁদের প্রত্যেকেই দানবরূপী শাসক শ্রেণী কর্তৃক অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আল্লাহর নবীগণের সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পরও স্বৈরাচারী, দাম্ভিক শাসক শ্রেণী সাধারণ জনগণের মৌলিক অধিকারে কুঠারাঘাত করছে, বিশ্বমানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করছে, নির্বাসিত করেছে শান্তি-সমৃদ্ধিকে। তাই চরম উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষগুলো বাধ্য হয়ে তাদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়।

মানবাধিকার সম্পর্কে তদানীন্তনকালের ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবী সর্বপ্রথম খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২১৩০-২০৮৮ সালে ‘ব্যাবিলনীয় কোড বা ‘হামুরাবী কোড’ এর মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনগত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে মহানবী সা. মানুষকে আল্লাহর খলীফা অভিধায় অভিহিত করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন অতঃপর তিনি আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং স্বীয় বাণী, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল।

মানবাধিকার সম্পর্কে তদানীন্তনকালের ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবী সর্বপ্রথম খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ২১৩০-২০৮৮ সালে ‘ব্যাবিলনীয় কোড বা ‘হামুরাবী কোড’ এর মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিকে আইনগত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে মহানবী সা. এানুষকে আল্লাহর খলীফা অভিধায় অভিহিত করে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন অতঃপর তিনি আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং স্বীয় বাণী, কর্ম ও অনুমোদনের মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বিশ্বেও ইতিহাসে তা বিরল।

‘মানবাধিকার’ শব্দটি অধুনাবিশ্ব প্রেক্ষাপটে বহুল আলোচিত বিষয়। এটা একটি যৌগিক শব্দ যার ইংরেজী পরিভাষা হল “Human Rights”. ÒHuman rights” – এর পরিচয়ে কোথাও বলা হয়েছে- One of the basic rights that everyone has to be treated fairly and not in cruel way, especially by their government এটি মূলত ফরাসী শব্দ হতে উৎপন্ন। অর্থ হল- মানুষের অধিকার ঞযড়সধং চধরহব সর্বপ্রথম ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ কর্তৃক ১৭৮৯ সালে গৃহীত Rights of Man ঘোষণার জন্য Droits de L’home শব্দটি ব্যবহার করেন যা Mrs. Elcanor Roosevelt- এর প্রস্তাব অনুযায়ী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত The Universal Declaration of Human Rights G Human Rights বা মানবাধিকার পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। যার আরবী পরিভাষা “ইক্ব বা হুকুক” যা কুরআন-সুন্নাহে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মানবাধিকার পরিভাষাটি কখনো Basic Human Rights, কখনো Fundamental Rights আবার কখনো Birth Rights of Human being ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়।

মানবাধিকারের ধারণা যেহেতু মানুষ অতি প্রাচীনকাল থেকেই পোষণ করে আসছে, তাই এটি সংরক্ষণের বিষয়েও বিশ্বসমাজ তাদের চিন্তায় ক্রটি করেনি। অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রাচীনতম লিপিবদ্ধ আইন হল ব্যাবিলনের রাজা হাবুরাবী কর্তৃক প্রণীত “ব্যাবিলনীয় কোড” বা ‘হামুরাবী কোড’ “প্রণয়নকাল-আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১৩০-২০৮৮ সাল)। লিখিত আইনের সূচনা হিসাবে এই কোড বিশেষ মূল্য বহন করে। এতে মানবাধিকার সংরক্ষণের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও প্রাচীন গ্রীস ও রোমের সরকার পরিচালনা, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রেও নাগরিকদের অংশগ্রহণের অধিকার প্রয়োগের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে মানুষের অধিকার সংরক্ষণে ইসলাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, মহানবী সা. এর সুন্নাহ ও হাদীস এবং “মদীনা সনদ” ও “বিদায় হজ্জ্বে” প্রদত্ত মহানবী সা. এর ভাষণ মানবাধিকার তথা মানুষের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেছে।

কিন্তু পরবর্তীতে মানুষ যখন ইসলাম এবং মহানবী সা. এর শিক্ষা ও আদর্শ হতে বিচ্যুত হয় এবং মানুষ যখন শাসক শ্রেণী হতে তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয়, তখন তারা অধিকার আদায়ে সোচ্চার ও প্রতিবাদী হয়েছে এবং আন্দোলনের মাধ্যমে শাসক শ্রেণীকে বাধ্য করেছে তাদের প্রাপ্য অধিকার করতে। ফলে শাসক শ্রেণী ও জনগণের মাঝে সম্পাদিত হয়েছে বিভিন্ন চুক্তি ও দলীল, যাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে মানুষের অধিকার। ১১৮৮ খ্রিস্টাব্দে আইবেরিয়ান-ব-দ্বীপে সামন্ত প্রভু ও অভিজাত ব্যক্তিদের এক সভায় রাজা আলফসনের নিকট থেকে অভিজাত শ্রেণী ব্যক্তি স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা, জীবনের মর্যাদা, বাসস্থান ও সম্পদের অলংঘনীয়তা প্রভৃতি কিছু অধিকার আদায় করে নেয়। হাঙ্গেরীর রাজা দ্বিতীয় এন্ড্রু ১২২২ খ্রিস্টাব্দে ‘স্বর্ণ আদেশ’ দ্বারা ঘোষণা দেন, তিনি আমীর ওমারা ও অভিজাত শ্রেণীর জন্য বেশ কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করবেন। তিনি অধিকারসমূহের এক দীর্ঘ তালিকা প্রণয়ন করেন এবং তা কার্যকর করার পদ্ধতিও ঘোষণা করেন।

ইংল্যান্ডে মানবাধিকার বিকাশের ক্ষেত্রে ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা জন কর্তৃক সম্পাদিত Magna Carta কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল হিসাবে গণ্য করা হয়। প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি রাজা ও ব্যারনদের মাঝে সম্পাদিত হলেও ৬৩টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই দলীলকে পরবর্তীতে Charter of English Liberties এবং বর্তমানে মানবাধিকার ও মুক্ত সরকারের ইতিহাসে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সপ্তদশ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক নাগরিকদের সনাতন অধিকার খর্ব করার প্রতিবাদে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় তারই ফলশ্রুতিতে প্রণীত হয় ১৬২৮ সালে The Petition of Rightsযঃং ও ১৬৮৯ সালে The Bill of Rights নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলীল। মানবাধিকার সম্বলিত এ দু’টি দলীল একদিকে যেমন রাজার একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতাকে খর্ব করেছে, অপরদিকে পার্লামেন্ট ও আদালতের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে এই প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। Lord Chathan উক্ত Magna Carta, The Pitition of Rights The Bill of Rights এই তিনটি দলীলকে The Bible of the English Constitution নামে অভিহিত করেছেন। ১৮শ শতকের বিভিন্ন দার্শনিকের লেখা ও রচনায় এবং ১৬৮৮ সালের ইংলিশ বিপ্লব ও এর ফসল ১৬৮৯ সালের The Bill of Rights উত্তর আমেরিকা ও ফ্রান্সে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রেরণা যোগাতে প্রভূতভাবে সাহায্য করে। ব্রিটিশ কলোনী আমেরিকায় ব্রিটিশ রাজার শাসন-শোষণ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের জয় লাভের ফলে আমেরিকাবাসী ১৭৭৬ সালের ১২ জুন ভার্জিনিয়াতে একটি Bill of Rights গ্রহণ করে, যার ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়; ÒAll men are by nature fully free and Indepenent, and have certain Inherent rights, namely, the enjoyment of life and liberty, will the means of acquiring and possessing property and obtainning happiness.” ২৫ এর মাত্র ২১ দিন পর ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার ১৩টি কলোনীকে নিয়ে The Declarration of independence তথা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণাপত্রের মুখবন্ধে মানবাধিকার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়- “We hold these truths to be self-evident, that all men are created equal, that they are endowed by their Creator with certain in alienable rights, that among these rights are life, liberty and pursuit of happiness.” এতে আরো বলা হয়, এই সব অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য জনগণ যে সরকার তৈরি করে সেই সরকার যদি এই সব অধিকার খর্ব করে তবে সেই সরকার উৎখাত করে নতুন সরকার গঠন করা জনগণেরই অধিকার।

আমেরিকার The Declaration of Independence এর ১৩ বছর পর ১৭৮৯ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের বিপ্লবীরা স্বৈরাচারী রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তারা ইত:পূর্বে যেইসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল সেগুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে ১৭৮৯ সালের ২৬ আগষ্ট “Declaration of Rights of man and of the citizen” নামক ঐতিহাসিকক ঘোষণাপত্র সম্পাদন করে। এতে বলা হয়- Men are born and remain free and equal in rights.” এতে স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি অধিকারের উল্লেখ ছিল।
আমেরিকা ও ফ্রান্সের মানবাধিকারের এই প্রভাব ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশকে গ্রাস করে ফেলে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মানবাধিকার বিষয়টি স্থান করে নেয়। ক্রমে মানবাধিকারের এই আন্দোলন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতি লাভ করে।

লেখক : পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।

 

 

 

 

0Shares





Related News

Comments are Closed