ছাতকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিশুদ্ধ পানির সংকট
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যায় পানিতে টিবওয়েল পানির নিচে তলিয়ে যাবার ফলে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির মারাত্নক অবনতি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সুরমা ও বটের নদীর পানি শিল্প নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করেছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুর্ভোগ বেড়েছে পানি বন্দি এলাকার বানবাসি মানুষদের। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। ইতোমধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) সকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি ছাতক পয়েন্টে বিপদসীমার ২.১৩ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এক মাসের ব্যবধানে আবারোও বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার ঘর বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, মৎস্য খামার, গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট ও হাট-বাজার। উপজেলার সর্বত্রই এখন বন্যার পানি থৈ-থৈ করছে।
সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীতে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। উপজেলার সকল গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে।
জানা যায়, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শিল্পনগরী ছাতক উপজেলার মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বানের পানিতে বসত ঘর হারিয়ে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন।
ছাতকে ৪ দফা ফের বন্যায় উপজেলাজুড়েই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে ফের বন্যায় তলিয়ে গেছে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ন এলাকা।
বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছি। ঘরের আসবাবপত্র বানের পানিতে ভেসে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা না থাকায় বন্যার দুর্গন্ধ যুক্ত পানি পান করতে হচ্ছে মানুষ।
বর্তমানে সুরমাসহ পাহাড়ি চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার উপর দিয়ে। ছাতক-সিলেট ও ছাতক-সুনামগঞ্জ সড়কের বিভিন্ন অংশে প্রায় তিন থেকে চার ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
ছাতকের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন অংশে সড়কের উপর দিয়ে চলাচল করছেন ছোট নৌকা। শাক-সবজীর বাগান, বীজতলাসহ গ্রামীন রাস্তা-ঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বাড়ির আঙ্গিনাসহ নিম্মাঞ্চলে বাস করা মানুষের বসত ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ করে উপজেলার ৫ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অঘোষিতভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি মানুষের জন্য ৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলার খবর পাওয়া গেছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ৫ শতাধিক বন্যা কবলিত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
প্রতিটি আশ্রয় কেন্দ্রে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুকনো খাবার বিতরণ করার খবর পাওয়া গেছে।
টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর, নোয়ারাই ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমানে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ২,১৩ সেন্টিমিটার, চেলা নদীর পানি বিপদসীমার ২,১৩ সেন্টিমিটার ও পিয়াইন নদীর পানি ২,১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ডাইকি, বটেরখাল ও বোকা নদীর পানিও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমাসহ এসব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার শতাধিক ছোট-বড় সবজী বাগান। শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট ছাড়া গোটা শহরের রাস্তা-ঘাট ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে।
ছাতক শহরের রাস্তায় এখন নৌকা চলাচল করছে। শহরের ফকিরটিলা-মাছিমপুর বাজার সড়ক, ইসলামপুর ইউনিয়নের ছনবাড়ি-রতনপুর সড়ক, ছনবাড়ি-গাংপাড়-নোয়াকোট সড়ক, কালারুকা ইউনিয়নরে মুক্তিরগাঁও সড়ক, বঙ্গবন্ধু সড়ক, আমেরতল-ধারন সড়ক, পালপুর-খুরমা সড়ক, বুড়াইর গাও আলমপুর সড়ক,তাজপুর নুরুল্লাপুর,বোকারভাঙ্গা-সিরাজগঞ্জ সড়কসহ উপজেলার অনেক সড়কের বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
জামুরা, চানপুর, নোয়াগাঁও, ভাসখলা, করচা, গোয়ালগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেরাজপুর,আলমপুর, নোয়াপাড়া, দশঘর, লক্ষীপুর, বাগইন,মোহনপুর, তাজপুর, গোবিন্দগঞ্জমড়েল, শিবনগর, রাধানগর, আনন্দনগর, নাদামপুর, মৈশাপুর, কৃঞ্চনগর, বিলপার, বৈশাকান্দি এফআইভিডিবি স্কুল, নোয়ারাই ইউনিয়নের চরভাড়া মাদ্রাসা, লামাপাড়া ব্র্যাক স্কুল সহ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়েছে।
ইসলামপুর ইউনিয়নের রতনপুর, নিজগাঁও, গাংপাড়, নোয়াকোট, বৈশাকান্দি, বাহাদুরপুর, ছৈদাবাদ, রহমতপুর, দারোগাখালী, পৌরসভার হাসপাতাল রোড, শাহজালাল আবাসিক এলাকা,থানায়,উপজেলা পরিষদ, কানাখালী রোড, শ্যামপাড়া, মোগলপাড়া, তাতিকোনা, বৌলা, লেবারপাড়া, নোয়ারাই ইউনিয়নের বারকাহন, বাতিরকান্দি, চরভাড়া, কাড়–লগাঁও, লক্ষীভাউর, চানপুর, মানিকপুর, গোদাবাড়ী, কচুদাইড়, রংপুর, ছাতক সদর ইউনিয়নের বড়বাড়ী, আন্ধারীগাঁও, মাছুখালী, তিররাই,মুক্তিরগাও, উত্তরখুরমা ইউনিয়নের আলমপুর,মাজিহারা, তেরাপুর, মোহনপুর, দাহারগাও, ঘিলাচড়া, হামিদপুর, তকিরাই, নোয়াগাও, মৈশাপুর, পুরাতনমৈশাপুর, নাদামপুর, কাকুরা, আমেরতল, ঘাটপার, গদারমহল, রুক্কা, ছোটবিহাই, এলঙ্গি, রসুলপুর, শৌলা, চরমহল্লা ইউনিয়নের ভলবপুর, চুনারুচর, চরচৌলাই, হাসারুচর, প্রথমাচর, সিদ্ধারচর, চরভাড়ুকা, দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের হরিশ্বরণ, হাতধনালী, রাউতপুর, ধনপুর, চৌকা, ভুইগাও, শেওলাপাড়া রামচন্দ্রপুর, হলদিউরা, কালারুকা ইউনিয়নের রামপুর, রাজাপুর, হাসনাবাদ, লন্ডাহাটি, মালিপুর, দীঘলবন, আরতানপুর, রংপুর, মুক্তিরগাও, ভাতগাঁও ইউনিয়নের জালিয়া, ঘাঘলাজুর, হায়দরপুর, বাদে ঝিগলী, সিংচাপইড় ইউনিয়নের গহরপুর, মহদী, গোবিন্দগঞ্জ নতুনবাজার, পুরানবাজার, ধারনবাজার, বুড়াইরগাওবাজার, লাকেশ্বরবাজার, পীরপ্রুবাজার, জাউয়াবাজার, দোলারবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
বেরাজপুর গ্রামের আবুল কালাম ও নুরুল আমিন জানান, দুদিন ধরেই সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার পরিজন বসত ঘরে হাটু পানি, ঘরে খাবার নেই। কেউ তাদের খবর নেননি।
শিবনগর গ্রামের বাউল মনির উদ্দিন নুরী জানান, বটের নদীর পানির স্রোতে তাদের বাড়ি ঘবে পানি ঢুকেছে। তাদের টাকা পয়সাও হাতে নেই। ঘরে খাবার নেই।
এব্যাপারে ব্যবসায়ি আব্দুস সাক্তার জানান, সড়কে কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও কোমর সমান। বটের নদীর পানি বাড়ায় এসব এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দী। রাস্তাঘাটের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। ডুবে গেছে চুলা-নলকূপও।
এব্যাপারে আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাওলানা সামছুল ইসলাম, মোস্তাক আহমদ, মানিক মিয়া, জমির আলী, রহিম বেগমসহ তারা জানান, তাদের বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে মুল্যবান কাগজ পত্র ফার্নিচার সহ ভিজে নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, বন্যার্তদের জন্য শহরের বৌলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাতিকোনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মন্ডলীভোগ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ছাতক সরকারী বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও এসপিপিএম উচ্চ বিদ্যালয়সহ ১০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই এসব আশ্রয় কেন্দ্রে দেড় শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার্তদের জন্য ত্রান সামগ্রি বিতরণ কার্যক্রম চলছে।
Related News
সুনামগঞ্জে বৃদ্ধা ও যুবকের মরদেহ উদ্ধার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ডোবা থেকে এক বৃদ্ধা এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা থেকে একRead More
টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে পর্যটকের মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে ট্যাকেরঘাট এলাকায় হার্ট অ্যাটাক করে আশিষRead More



Comments are Closed