আজ ঐতিহাসিক বদর দিবস
অধ্যাপক মওলানা সাহাব উদ্দিন আহমদ: রমজান মাস কোরআন নাজিলের মাস। তেমনি তা কোরআন বিজয়েরও মাস। কোরআনের আদেশ-নিষেধ তথা ইসলামি জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য রমজান মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মুসলমানদের শক্তির উৎস। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মুসলমানরা মদিনা থেকে দক্ষিণে বদর প্রান্তরে মক্কা থেকে আগত কাফের কোরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে। এ যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ ইসলামের শিকড়কে মজবুত করেন এবং ইসলাম গোটা আরব এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল এ যুদ্ধের লক্ষ্য।
পৈতৃক ধর্ম, প্রাচীন নিয়ম-নীতি, নেতৃত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য একপক্ষের মাথায় খুন চড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে ছিল দিগন্তপ্রসারী এক আলোর বন্যা, যা মদিনার আকাশ থেকে উদ্ভাসিত নতুন প্রভাতকে মানবতার সমগ্র জীবনের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। এটা ছিল এক সুকঠিন পরীক্ষা। রাসুলের প্রিয় সাহাবিরা এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। অকল্পনীয় ফলাফলের দিক দিয়ে মানব ইতিহাসে এ যুদ্ধের কোনো জুড়ি নেই।
১৭ রমজান যুদ্ধ হলো। মুসলিম বীরের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন। তাদের অস্ত্রশস্ত্রও মামুলি, সেকেলে। অশ্বারোহী মাত্র দু’জন, আর ৭০ জন উষ্ট্রারোহী, বাকি পদাতিক। মুশরিকদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার জন। তার মধ্যে ১০০ জন অশ্বারোহী ও ৭০০ জন ছিল উষ্ট্রারোহী। রাসুল (সা.) তাঁর রবের কাছে সাহায্য ও বিজয়ের প্রার্থনা করতে থাকলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা তোমাদের মালিকের কাছে ফরিয়াদ পেশ করছিল, অতঃপর তিনি তোমাদের ফরিয়াদ কবুল করে বলেছিলেন, হ্যাঁ আমি (এ যুদ্ধে) তোমাদের পরপর ১ হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা সুসংবাদ দেওয়া ও তা দিয়ে তোমাদের মনকে প্রশান্ত করা ছাড়া অন্য কোনো কারণে এটা বলেননি, সাহায্য তো আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকেই আসে; অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা পরক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। তিনি আরও বলেন, যখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিলেন, তোমাদের ওপর তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি নাজিল করেছেন, যেন এ পানি দ্বারা তিনি তোমাদের পাক-সাফ করতে পারেন, তোমাদের মন থেকে যেন শয়তানের অপবিত্রতা দূর করতে পারেন, তোমাদের মনে সাহস বৃদ্ধি করতে পারেন, তিনি এর মাধ্যমে তোমাদের কদম মজবুত করতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘যখন তোমার রব ফেরেশতাদের কাছে ওহি পাঠালেন যে, আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি, তোমরা মোমিনদের সাহস দাও; অচিরেই আমি কাফেরদের মনে দারুণ এক ভীতির সঞ্চার করে দেব।’ (সুরা আনফাল : ৯-১২)। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত দোয়া করার পর রাসুল (সা.) বললেন, ‘অচিরেই সম্মিলিত বাহিনী (মুশরিক) পরাজিত হবে এবং যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে পলায়ন করবে। রাসুল (সা.) ঘোষণা করেন, তোমাদের যুদ্ধ আত্মরক্ষার যুদ্ধ, আক্রমণ প্রতিহত করার যুদ্ধ, অগ্রে আঘাত হানবে না, আঘাতের প্রত্যুত্তর দেবে। ‘সীমা লংঘন করবে না আল্লাহ সীমা লংঘনকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা মায়েদা : ৮৭)।
এ যুদ্ধে কোরাইশদের ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন বন্দি হলো, মুসলমানদের ২২ জন বীর যোদ্ধা নিজেদের আদর্শের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে দেখিয়ে দিলেন তারা শ্রেষ্ঠতম সত্যের একনিষ্ঠ সাক্ষী। মহান আল্লাহ তায়ালার মহিমায় মুষ্টিমেয় কয়েকজন বীর মুসলিম কোরাইশদের বিরাট বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে জয়ের মালা ছিনিয়ে আনল। এ যুদ্ধে কোরাইশদের কোমর ভেঙে গেল, তাদের শক্তির গর্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। এ যুদ্ধের ফলে মহানবী (সা.) এর মিশন মাথা উঁচু করে ভবিষ্যতের নতুন জগতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপের যোগ্যতা অর্জন করল। এ কারণে এ যুদ্ধের দিনকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ তথা হক বাতিলের ছাঁটাই-বাছাইয়ের কষ্টিপাথর বলে আখ্যায়িত করা হয়।
সুরা আলে ইমরানে আল্লাহ তায়ালা বলেন (হে নবী স্মরণ করো) ‘যখন তুমি ভোরবেলায় তোমার আপনজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মোমিনদের যুদ্ধের ঘাঁটিগুলো মোতায়েন করছিলে (তখন তুমি নিশ্চিত জানতে যে) আল্লাহ তায়ালা সব কিছু শোনেন জানেন। যখন তোমাদের দুটি দল মনোবল হারিয়ে ফেলার উপক্রম করে ফেলেছিল (তখন সেখানে) আল্লাহ তায়ালাই তাদের উভয় দলের অভিভাবক হিসেবে মজুদ ছিলেন, আর আল্লাহর ওপর যারা ঈমান আনে তাদের তো (সর্বাবস্থায়) তাঁর ওপরই ভরসা করা উচিত।’ (আয়াত : ১২১-১২২)।
মহান আল্লাহ তায়ালা বদর প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীকে কীভাবে সাহায্য করেছেন তা কোরআন মজিদ থেকে বিস্তারিত জানা যায়। তিনি বলেন, ‘(এই ভরসা করার কারণেই) বদরে (যুদ্ধে) আল্লাহ তায়ালা তোমাকে বিজয় ও সাহায্য দান করেছিলেন, অথচ তোমরা কত দুর্বল ছিলে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা (এ বিজয়ের জন্য তার) কৃতজ্ঞতা আদায় করবে। (স্মরণ করো) যখন তুমি মোমিনদের বলছিলে, তোমাদের রব যদি আসমান থেকে তিন হাজার ফেরেশতা পাঠিয়ে তোমাদের সাহায্য করেন, তাহলে তোমাদের (বিজয়ের জন্য তা কি) যথেষ্ট হবে না? তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং শয়তানের চক্রান্ত থেকে বেঁচে থাকতে পার এ অবস্থায় তারা যদি তোমাদের ওপর দ্রুত আক্রমণ করে বসে তাহলে তোমাদের রব প্রয়োজনে ৫ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়েও তোমাদের সাহায্য করবেন। এই সংখ্যাটাকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য একটি সু-সংবাদ বানিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে তোমাদের মন যেন প্রশান্ত হতে পারে, আর সাহায্য ও বিজয়! তা তো পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই আসে, তিনিই সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আলে ইমরান : ১২৩-১২৬)।
এই দুই বাহিনীর মধ্যে আদর্শিক ও নৈতিক পার্থক্য স্পষ্ট। একটি বাহিনী পার্থিব স্বার্থ ও উদ্দেশ্য এবং গোত্রীয় বংশীয় ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নিছক আল্লাহ পথে মানবজাতির সঠিক কল্যাণ সাধনের নিমিত্তে প্রাণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। আর অপর বাহিনী নিজেদের নেতৃত্ব, আধিপত্য, বংশীয় আভিজাত্য, রাজনৈতিক স্বার্থ ও অন্ধ-ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে সামনে অগ্রসর হয়। এক বাহিনী আল্লাহর সামনে বিনয় সহকারে, নামাজ, রুকু ও সিজদায় মগ্ন থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ময়দানে নামে; অন্য বাহিনী বিরাট বিরাট ভোজসভা, মদের আসর, গান-বাজনার জলসা ও নর্তকীদের নৃত্য ইত্যাদি উপভোগ করতে করতে এগিয়ে আসে। এক বাহিনী ময়দানে আসে সংখ্যার স্বল্পতা ও অস্ত্রশস্ত্রের অপ্রতুলতার পাশাপাশি ঈমান, ঐক্য, শৃঙ্খলা ও চরিত্রের দিক দিয়ে অধিকতর মজবুত ও শক্তিশালী অবস্থায়। অপর বাহিনী সংখ্যায় বড় এবং সাজ-সরঞ্জামে শক্তিশালী; কিন্তু নৈতিক শক্তির বিচারে নিত্তান্ত হীনবল ও অকর্মন্য। এর পর আল্লাহ উভয়ের মধ্যে হার-জিতের স্পষ্ট ফায়সালা করে দেন।
অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় এ যুদ্ধের একটি বিশেষত্ব এই যে, এর বিস্তারিত আলোচনা এবং এতে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ও যুদ্ধ সংক্রান্ত নীতিমালা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন। বাস্তব ঘটনার অবগতির জন্য এর চেয়ে সত্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আসমানের নিচে দ্বিতীয় আর নেই।
রমজান যেমন অফুরন্ত রহমত ও বরকতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি কোরআনকে বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করার মহান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার মাস এ রমজান। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে যেমনি হৃদয়কে রোজার দ্বারা উদ্ভাসিত করে তেমনি বদর যুদ্ধ মুসলমানদের ঈমানকে আরও শান্তি ও দ্বীপ্তিময় করে তোলে। ইতিহাসে বদরযুদ্ধ এক যুগান্তকারী ঘটনা। ইসলামের দৃঢ়ভিত্তি স্থাপিত হলো এখানেই। এ বদরযুদ্ধের দিনকে ইসলামের মুক্তির দিন নামে অবহিত করা হয়। মুসলমানদের অন্তরে জাগল ঈমানের এক নতুন উন্মাদনা, মনোবল, সামরিক প্রেরণা, রাসুল (সা.) এর আশার বাণী মূর্ত প্রতীক হয়ে প্রতিভাত হলো। প্রমাণিত হলো মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত রাসুল; ইসলাম আল্লাহ তায়ালার মনোনীত ধর্ম। বদরের বিজয় জগতের সামনে খুলে দিল এক নতুন দিগন্ত। শিরক, মিথ্যা, তমাসার শেষে নতুন প্রভাত ইসলামের এই অনল পরীক্ষার গুরুত্ব বীরত্বে নয়, দৈহিক বলে নয়, রণপটুতায় নয়Ñ এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে ঈমান, বিশ্বাস, একতা, তাকওয়া, ধৈর্য সর্বোপরী আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যে।(সংকলিত)
লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
Related News
বাংলাদেশিদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা সহজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কর্মী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের জন্য ভিয়েতনামের ভিসা ব্যবস্থা আরও সহজRead More
টিসিবি থেকে বাদ পড়েছেন ৫৯ লাখ সুবিধাভোগী: বাণিজ্যমন্ত্রী
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ৫৯ লাখ সুবিধাভোগীকে টিসিবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকারRead More



Comments are Closed