Main Menu
শিরোনাম
বড়লেখায় ৭ প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিল         বিশ্বনাথে ইউপি নির্বাচনে ৫ প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিল         ওসমানীর ল্যাবে ১৬ জনের করোনা শনাক্ত         শাবির ল্যাবে আরো ১৩ জনের করোনা শনাক্ত         সিলেটে করোনায় আক্রান্ত বেড়ে ১২,৪২৩, মৃত্যু ২১২         ঘূর্ণিঝড়ে জকিগঞ্জের ৬ গ্রামের ২৫টি ঘর বিধ্বস্ত         মাধবপুরে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু         জগন্নাথপুর পৌরসভার উপনির্বাচন ১০ অক্টোবর         কমলগঞ্জে ৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা         জগন্নাথপুরে স্বামীর দায়ের কোপে স্ত্রীর মৃত্যু         ছাতকে নৌযানে চাঁদাবাজ মুক্ত রাখতে মাইকিং         সিলেট বিভাগে আরো ৪৮ জনের করোনা শনাক্ত        

বেলারুশ সংকট ও এর ভবিষ্যৎ

আতিকুর রহমান আতিক: করোনায় যখন পুরো পৃথিবী শঙ্কিত।তখন ‘ইউরোপের ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত বেলারুশে তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল। নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বেলারুশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।

ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলে যখন ২৬ বছর থেকে ক্ষমতায় থাকা বেলারুশের রাষ্ট্রপতি আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর বিপক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো জোট অবস্থান নেয় এবং ফলস্বরূপ লুকাশেঙ্ক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমর্থন কামনা করলে, রাশিয়া কোন কথা না ভেবেই লুকাশেঙ্ককে সমর্থন করে ও পাশাপাশি সামরিক সহায়তা দেয়ারও আশ্বাস দেয়। ফলশ্রুতিতে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায় ন্যাটো জোট ও রাশিয়া।

বেলারুশের রাজনৈতিক ইতিহাস:
মধ্যযুগ থেকে বেলারুশ বিভিন্ন বৈদেশিক শাসনের অধীনে থাকার পর ১৮শ শতকে এটি
রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯শ শতকে এসে বেলারুশে জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটার পর, ১৯১৯ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে বেলারুশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের চারটি প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রের একটি ছিল। শুধু তাই-ই নয়, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাষ্ট্রগুলির একটি বেলারুশ। ১৯৯১ সালের ২৭শে জুলাই বেলারুশের আইনসভা দেশটির সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করেন। আগস্ট মাসে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং এর মাধ্যমে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। বর্তমান বেলারুশ সরকার একটি রাষ্ট্রপতিভিত্তিক শাসিত প্রজাতন্ত্র। ১৯৯৪ সাল থেকে আলেক্সান্দর লুকাশেঙ্কো দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় আছেন।

ঘটনার সূত্রপাত হল কিভাবে?
গত ৯ আগস্ট ২০২০ বেলারুশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো। ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ১৯৯৪ সাল থেকে ক্ষমতাসীন আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো এ নির্বাচনে ৮০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর তার বিরোধী দলের প্রধান প্রার্থী সভেতলানা তিখানভস্কায়া পেয়েছেন ১০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট।ফলাফল ঘোষণার পর সভেতলানা কারচুপির অভিযোগ করেন। তিনি দাবী করেন, যেখানে ভোট গণনা করা হয়েছিল সেখানে তিনি নিজের পক্ষে ৬০ থেকে ৭০ পর্যন্ত সমর্থন পেয়েছিলেন। এরপর শুরু হয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। পুলিশি নির্যাতনের ঘটনায় ফুঁসে উঠে বিক্ষোভকারীরা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, দেশটিতে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ জন সরকার বিরোধীকে আটক করা হয়েছে। শুধু তাই নয়,অনেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এভাবে একে একে বিপদজনক গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করছে বেলারুশ।

কে এই আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্ক?
একসময়ের জনগণের নেতা থেকে স্বৈরশাসকে রূপান্তরিত হয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো। ২৬ বছর ধরে বেলারুশকে কঠোর হাতে শাসন করছেন তিনি। ১৯৯৩ সালে আইনসভার সদস্য হওয়ার ৬ মাসের মাথায় জনগণের সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হন লুকাশেঙ্কো। প্রথমদিকে সাধারণ জনগনের জন্য কাজ করলেও আস্তে আস্তে লুকাশেঙ্কো বেলারুশকে এক দলের রাষ্ট্র থেকে এক ব্যক্তির রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। তার দীর্ঘ প্রেসিডেন্সিতে বেলারুশ রাশিয়া এবং ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাফার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। যা লুকাশেঙ্কর জন্য এক বিরাট সাফল্য।

শুধু তাই নয়, লুকাশেঙ্কো খুব সচেতনভাবেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অনুকরণ করে গিয়েছে। আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো তার জেনারেলদের নিজের ১৫ বছরের ছেলেকে স্যালুট জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তাই বিশ্লেষকদের অভিমত, লুকাশেঙ্কো নিজের পুত্রকে উত্তরাধীকার হিসেবে দেখেন।

ভবিষ্যতে এ সংকট কিরকম প্রভাব ফেলবে ইউরোপে?
ইতোমধ্যে বেলারুশ পরিস্থিতি নিয়ে পূর্ব ইউরোপে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বেলারুশ প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে তার দেশে বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছেন। তিনি ন্যাটো জোটকে সরাসরি দায় দিয়েছেন যে,তারা লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড সীমান্তে সামরিক বাহিনী জড়ো করছে।যদিও ন্যাটো সহ লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড এ অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তারা আরো উল্টো অভিযোগ করে বলেন,প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্ক তার দেশের সমস্যা অন্যদিকে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এ ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন।সমস্যাটি আরো ব্যাপক আকার লাভ করেছে যখন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন লুকাশেঙ্কের পাশে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়,প্রয়োজনে সামরিক সহায়তা দেয়ার ও আশ্বাস দিয়েছেন। একমাত্র রাশিয়া ছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশ ৯ আগস্টের নির্বাচনকে অবৈধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং পুনরায় নতুন করে নির্বাচন দেয়ার জন্য বলেছেন।যেমন: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো ও জার্মানির চ্যান্সেলর নতুন করে নির্বাচন দেয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন এবং জনগণের মতামতকে যেন সম্মান দেয়া হয় তা উল্লেখ করেছেন।

বেলারুশ সংকটের ফলাফল কি হতে পারে?
বেলারুশ সংকটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কের একচেটিয়া মনোভাবের ফলে বেলারুশে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে।অফিস-আদালত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। যা দেশের অর্থনীতির উপর ব্যপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।শুধু তাই নয়, আশেপাশের দেশগুলোর সহ বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে বেলারুশের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বেলারুশের স্বৈরাচারী সরকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পরিকল্পনা করছে। যদিও চীন-রাশিয়ার মতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলো ঠিকই সমর্থন জানিয়েছে লুকাশেঙ্কোকে।

এখন দেখা যাক, বেলারুশ সংকট আর কতদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিক্ষোভকারীরা পশ্চিমাদের সহায়তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কের পতন ঘটাবে না রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে বিক্ষোভকারীদের পাশ কাটিয়ে আরো ক্ষমতা পাকাপোক্ত করবে, সেটা সময়ই বলে দিবে আমাদের।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

0Shares





Related News

Comments are Closed