Main Menu

পরিবর্তিত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

আতিকুর রহমান আতিক: বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, শত্রুর-শত্রু মিত্র। কথাটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যতটা দৃশ্যমান তার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এখানে কে কখন কার শত্রু বা মিত্র বনে যায়, তা বলাই মুশকিল। সাম্প্রতিক সময়ে আরব আমিরাতের সাথে ইসরাইলের শান্তি চুক্তি এর অন্যতম উদাহরণ।

মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সারখ্যাত ইসরাইলের সাথে মুসলিম বিশ্বের ৩য় কোন দেশ হিসেবে আরব-আমিরাতের এ শান্তি চুক্তি প্রভাব ফেলেছে পুরো মুসলিম বিশ্বে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সরকার প্রধান, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন সংগঠন আরব আমিরাতের এমন সিদ্ধান্তের প্রতি নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে এখন থেকে আরব আমিরাত ও ইসরাইল উভয় দেশ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপন করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে এমন সম্পর্ক স্থাপন বদলে দিবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, বিভাজন দেখা দিতে পারে মুসলিম বিশ্বে।

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের বেলফোর ঘোষণা ও ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ মেন্ডেটের পর থেকে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ চলছিল। আরব ও ইহুদি উভয় গোষ্ঠীই ব্রিটিশ নীতির কারণে অসন্তুষ্ট ছিল।

কিন্তু ১৯৪৮ সালের ১৪ মে যখন আরব ভুখন্ড ফিলিস্তিনের একাংশ দখল করে ইসরাইল নামক ইহুদি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়, তখন আরবরা তা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে আরব দেশগুলো একত্রিত হয়ে ইসরাইল এর সাথে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত মোট চার দফা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রত্যেকবার পশ্চিমাদের সহায়তায় ইসরাইল যুদ্ধে জয়লাভ করে। এভাবে যুদ্ধজয়, অবৈধ বসতিস্থাপন, ফিলিস্তিনিদের উপর মানবাধিকার বর্হিভূত আক্রমণ ও তাদের বিতারণের মাধ্যমে দিন দিন আকারে বড় হয়েছে ইসরাইল রাষ্ট্র।

১৯৬৭ সালের ৩য় আরব-ইসরাইল ছয়দিনের যুদ্ধের পর ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট ইসরাইল জেরুজালেমের পবিত্র মসজিদুল আকসায় অগ্নিসংযোগ করে। এর ফলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় ২৫ আগস্ট ১৪ টি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ মিশরের রাজধানী কায়রোতে এক বৈঠকে মিলিত হয়। ওই বছরেরই ২২-২৫ সেপ্টেম্বর মরক্কোর রাবাতে ২৫ টি মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে এক সম্মেলনে প্রতিনিধিগণের সিদ্ধান্তক্রমে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা OIC আত্মপ্রকাশ করে।

ওআইসির মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন, ইসরাইলে আগ্রাসী ভূমিকা থেকে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষা ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষা করা। ওআইসিভুক্ত ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশ মনে করে, ইসরাইল একটি আগ্রাসী ও অবৈধ রাষ্ট্র। ফিলিস্তিনদের নিজস্ব ভূমিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে নীতিগত সমর্থন করে প্রায় সব দেশ। ফলশ্রুতিতে, অধিকাংশ মুসলিম দেশের কোন প্রকাশ্য সম্পর্ক নেই ইসরাইলের সাথে।

তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন, এক সময়ের চির বৈরী দেশ ইসরাইলের সাথে হঠাৎ কেন এই শান্তিচুক্তি করতে উদগ্রীব হয়ে পড়ল আরব আমিরাত। কেনইবা তারা তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুত নীতি থেকে সরে আসল!

ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ শান্তিচুক্তি করার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে আমাদের কাছে অনেক বিষয় প্রতিয়মান হয়।

প্রথমত, ক্ষমতা টিকে থাকা ।কেননা আরব আমিরাতে বছরের পর বছর ধরে একমাত্র রাজপরিবারই সকল ক্ষমতার উর্দ্ধে। তাদের ভয় ২০১০ সালের মতো যদি পুনরায় আরব বসন্ত সংঘটিত হয়, তাহলে আমিরাত রাজতন্ত্রের ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব হয়ে উঠবে। কারন, আরব বসন্তের ফলে বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপ্রধানরা তাদের ক্ষমতা হারিয়েছে। যেমন: লিবিয়ার মুহাম্মদ গাদ্দাফি, তিউনিশার বেন আলি, মিশরের হোসনি মোবারক, যারা কিনা যুগের পর যুগ ক্ষমতা দখল করে ছিল।শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র সেরা খেলোয়ার ইসরাইলের মদদে এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, যেটা শুধু মিশর, তিউনিসিয়ায় নয় আরব আমিরাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের মতে ইসরাইল তাদের দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে নাক গলাবে না, যদি তারা তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। আর এটাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইসরাইল এর সাথে শান্তিচুক্তি করার অন্যতম একটি কারণ।

দ্বিতীয়ত, ইরান প্রসঙ্গ।বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান তার প্রতুপত্তি বাড়িয়ে চলেছে।বছরের পর বছর পশ্চিমাদের অবরোধের পরও তারাও হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যের সেরা খেলোয়াড়ে। পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের চেস্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তারা সামরিক ক্ষেত্রে অনেক অনেক এগিয়ে। শুধু তাই-ই নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ “হরমুজ” প্রনালি ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন। উপসাগরীয় অন্যান্য দেশগুলোর মতো সংযুক্ত আরব আমিরাতও জ্বালানি তেল পরিবহন করে এই রুট দিয়ে, যেখানে আরব আমিরাত নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে। যেহেতু ইরানের শত্রু ইসরাইল, তাই তাদের চিন্তানুযায়ী তারা ইসরাইলের সাথে হাত মিলিয়ে ইরানের প্রভাব কমাতে পারবে।

তৃতীয়ত, আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাইছে। তারা মনে করছে, ইসরাইলের হাত ধরে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে। তারা এও মনে করছে, এর মাধ্যমে তারা পাবে পশ্চিমাদের আকুন্ঠ সমর্থন।

পরবর্তী কারণ হিসেবে তুরস্ককে বিবেচনা করা যেতে পারে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট তাদের হারানো উসমানীয় সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। একসময় পুরো মধ্যপ্রাচ্য উসমানীয় সম্রাজের আওতাধীন ছিল। তাই তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলছে। সিরিয়ার বিশাল এলাকা এখন তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে, যদিও সেখানে তারা সিরিয় শরণার্থীদের পুনর্বাসন করবে। এছাড়া লিবিয়া নিয়ে আরব আমিরাতের সাথে তুরস্কের ঠান্ডা লড়াই চলছে। যেখানে তুরস্ক সমর্থন দিচ্ছে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকে আর আরব আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে সামরিক নেতা জেনারেল হাফতারকে। অর্থাৎ তুরস্কের এই অগ্রগামী পদযাত্রা থামাতে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে এই চুক্তি সংঘটিত করেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, ইসরাইলের সাথে আরব আমিরাতের এই চুক্তি কি সত্যি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বয়ে আনবে?

কিন্তু বাস্তবতা পুরো ভিন্ন। এর কারন হিসেবে ইতোমধ্যে মুসলিম বিশ্বে এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরাইলের সম্পর্ক স্থাপনের যুক্তি হিসেবে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধের কথা বলা হলেও ইসরাইলের তরফ থেকে বলা হয়েছে, তারা পশ্চিমতীর বসতি স্থাপন আপাতত বন্ধ রাখবেন, তবে তা বাতিল করা হয়নি।

এ থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের মধ্যকার শান্তিচুক্তি কেবলই দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের জন্য। এতে ফিলিস্তিনদের কোন স্বার্থরক্ষা হবে না। বরং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরবদেশগুলোর সমর্থন আরো দুর্বল হলো। ইসরাইল এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ফিলিস্তিনের উপর আরো কঠোর নীতি প্রয়োগ করবে। বিনষ্ট হবে স্বাধীন ফিলিস্তিনের স্বপ্ন। এতে আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি।

অপরদিকে ইসরাইলের সাথে আরব আমিরাতের এ চুক্তির ফলে মুসলিম বিশ্বে আরব আমিরাতের প্রভাব কমবে, যেটার প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সহ মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মাদ এই চুক্তির নিন্দা করেছে। ফিলিস্তিন ইতিমধ্যে তাদের রাষ্ট্রদূত আরব আমিরাত থেকে প্রত্যাহার করেছে। ফলশ্রুতিতে, মুসলিম বিশ্বে তুরস্ক সহ ইরানের প্রভাব বাড়বে।

এখন দেখা যাক, আরব আমিরাত ও ইসরাইল শান্তি চুক্তি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ফিরিয়ে আনে কিনা। না এটা ধীরে ধীরে আরও ভয়ঙ্কর গন্তব্যস্থলের দিকে যাচ্ছে। যেটা সময়ই বলে দিবে।

তবে বিশ্ববাসীর উচিত ফিলিস্তিনের কথা ভাবা, যারা কিনা প্রতিনিয়ত নিজেদের দেশেই ইসরাইলের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। এজন্য ফিলিস্তিন কে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বিকৃতি দেয়া ও ইসরাইলের দখলদারিত্ব বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত সকলের। নইলে এ চুক্তি একটি অকার্যকর চুক্তি হিসেবে পরিণত হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

0Shares





Related News

Comments are Closed