Main Menu

করোনার ক্রান্তিকাল এবং ম্যালথাস তত্ত্বের জনসংখ্যা হ্রাস

সৈয়দ মবনু: ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে কেউ যদি ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ দেখেন গোটা পৃথিবী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেছে তবে তিনি কিংকর্তব্য বিমূঢ় কিংবা চমকে ওঠারই কথা। আর কেউ যদি করোনাভাইরাসের ক্রান্তিকাল থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে পিছন দিকে হেটে যান ‘টমাস ম্যালথাস’-এর সময় ১৭৬৬-১৮৩৪ পর্যন্ত তবে দেখবেন এগুলো যেমন নতুন কিছু নয়, তেমনি অপরিকল্পিতও নয়।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আমার ‘দয়াদর্শন’ বইটিতে আমি বিষয়টির কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলাম ‘সামাজিক ডারউইনবাদের মূল চেতনা’ শীর্ষক আলোচনায়। সেখানে আমি বলেছিলাম ‘সামাজিক ডারউইনবাদের মূল চেতনা এসেছে বৃটিশ অর্থনীতিবিদ ‘টমাস ম্যালথাস’ (Thomas Malthus) এর `An Essay on the Principle of population’ বই থেকে। এই বই মানব জাতির জন্য একটি নির্মম ভবিষ্যত তৈরির পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছে। এই বইতে খাদ্যের ঘাটতি হ্রাসে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা তৈরি করেছেন অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস। তাঁর মতে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক উপাদান হলো-যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি। তিনি স্পষ্টই বলে দিয়েছেন-‘কিছু লোককে বাঁচাতে হলে কিছু লোককে মারতে হবে।’ এই কিছু লোককে মারতে হলে প্রয়োজন যুদ্ধ, সংঘাত, মহামারি, দুর্ভিক্ষ তৈরি করা। কিন্তু এসব অনৈতিক কাজে সমস্যা হলো ঈশ্বরের বিশ্বাস, পরকালের বিচারের প্রতি বিশ্বাস ইত্যাদি। সৃষ্টিতত্ত্ব মানলে এই সবের প্রতি বিশ্বাস করতেই হয়। তাই সৃষ্টিতত্ত্বের পরিবর্তে প্রচার করো বিবর্তনবাদ।

ডারউইন নিজেই স্বীকার করেছেন- ম্যালথাসের বই-এর ‘অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’ সম্পর্কীত মতবাদটি তাঁকে বিবর্তনবাদ সম্পর্কে চিন্তা করতে শিখায়। তাঁর বক্তব্য হলো-১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে অর্থাৎ আমার পদ্ধতিগত অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ১৫ মাস পর হঠাৎ আমি জনসংখ্যার উপর লেখা ম্যালথাসের বইটি পড়ে জানতে পারি যে, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানা গেছে যে, প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতে সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মতবাদ নির্ধারন করা আছে। এরই সূত্র ধরে হঠাৎ আমার মনে হলো , এ ধরনের পরিস্থিতিতে (অস্তিত্বের সংগ্রাম) আনুকূল্যপ্রাপ্ত প্রজাতি বিজয়ী হয় অর্থাৎ টিকে থাকে। প্রতিকূল পরিবেশে সংগ্রামরত প্রজাতি পরাজিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়। অবশেষে এই পুস্তকেই আমি একটি বিবর্তনবাদি তত্ত্ব তথ্য কার্যকরী মতবাদের সন্ধান পাই।’ ‘টমাস ম্যালথাস’-এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের তত্ত্ব থেকেই পরবর্তীতে ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ’ পদ্ধতির এতো প্রচার-প্রসার ঘটে।

‘টমাস ম্যালথাস’-এর তত্ত্ব সামনে নিয়ে আমরা যদি ঊনবিংশ শতকের পশ্চিমা বিশ্বের পূঁজিবাদ, ডারউইনবাদ, মার্কসবাদকে পর্যালোচনা করি তবে দেখবো তারা সবাই ‘জনসংখ্যা হ্রাসে’ সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে পরিকল্পিত যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, মহামারিও রয়েছে। আর এই সব অমানবিক যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, মহামারি ইত্যাদি তৈরির জন্য তারা সর্বপ্রথম দয়া, নৈতিক মূল্যবোধ ইত্যাদিকে তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মনে অপ্রয়োজনীয় করে তোলেন। এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সামাজিক ডারউইনবাদ, মার্কসবাদ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাতি সংঘ, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি। আমরা যদি ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপে দৃষ্টিপাত করি তবে দেখবো সেখানের প্রত্যেকটি দেশের রাজনৈতিক দল উম্মাদের মতো অস্ত্র প্রার্থনা করছিলো। গণতান্ত্রিক দলগুলো লিপ্ত ছিলো নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায়। রাজতান্ত্রিক দলগুলোর চাহিদা ছিলো অনগ্রসর জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য বিস্তার। মার্কসবাদিরা লড়াই করছিলো ক্ষমতা দখলের। বর্ণবাদিরা পাগল হয়ে চেষ্টা করছিলো বিরোধীদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বের করতে। ইতিহাসের গবেষকেরা স্বীকার করেছেন- এই সকল মতাদর্শীই কোন না কোনভাবে তাদের চিন্তাধারার স্বপক্ষে ডারউইনবাদকে ব্যবহার করেছেন। (দয়াদর্শন, সৈয়দ মবনু, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের একুশের গ্রন্থমেলা, নগর প্রকাশনি, পৃষ্টা ৬১-৬১)।’

করোনাভাইরাসের ক্রান্তিকাল থেকে ‘টমাস ম্যালথাস’-এর সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে সৃষ্ট যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, মহামারি ইত্যাদির পিছনের শক্তিগুলো কারা তা কি আমরা কখনও চিন্তা করেছি কিংবা এসব নিয়ে চিন্তে করার মতো যোগ্যতা কি আমাদের আছে? ডারউইনবাদ, মার্কসবাদ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদির ভূমিকা কি বিগত দিনগুলোতে এবং আজকের করোনাভাইরাস, ইরাক-আফগানিস্তান-ফিলিস্তিন-সিরিয়া-মায়েনমারে গণহত্যায় ওদের কার কি ভূমিকা তা কি আমাদের পর্যালোচনার যোগ্যতা রয়েছে? আমরা যদি এই বিষয়গুলো নিয়ে পর্যলোচনা কিংবা গবেষণা করতে পারতাম তবে কমপক্ষে বুঝতে পারতাম আজকের করোনাসমস্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন কিছু নয়, বরং পুরাতন ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা।

টমাস রবার্ট ম্যালথাস ছিলেন এক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে। তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেসাস কলেজ থেকে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ইংরেজি বক্তৃতা, লাতিন ভাষা, এবং গ্রিক ভাষায় পুরস্কার পান। গণিত ছিলো তাঁর খুব প্রিয়। ১৭৯১ খিস্টাব্দে তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে দু বছরের জন্য জেসাস কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘অন দ্য প্রিন্সিপল অব পপুলেশন’ বই প্রকাশ হয়। রবার্ট ম্যালথাস এতে বলেন, ‘মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে (২, ৪, ৮, ১৬, ৩২…) আর খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে (২, ৩, ৪, ৫, ৬…) আর প্রতি ২৫ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়। যেহেতু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়বে, নষ্ট হবে ভারসাম্য, এনে দেবে দুর্ভিক্ষ। খাবার না পেয়ে বাড়তি জনসংখ্যা বিলীন হয়ে যাবে। তাঁর মতে, সব মনুষ্য সমাজে এমনকি কলুষিত সমাজেও প্রধান প্রবণতা জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটানো। তাই তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক এ প্রবণতা মানুষকে অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেবে। এ অবস্থা মোকাবেলার জন্য তিনি দুই ধরনের প্রতিরোধকের কথা বলেছেন। ১.পজেটিভ; যার আওতায় দুর্ভিক্ষ, অসুখ-বিসুখ ও মহামারী এবং যুদ্ধ সৃষ্টি করে মানুষকে মেরে ফেলা। ২. প্রিভেন্টিভ বা নিরোধক; যারমধ্যে রয়েছে গর্ভপাত, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পতিতাবৃত্তির সম্প্রসারণ, কৌমার্য ধরে রাখা, বিয়ে পিছিয়ে দেয়া ইত্যাদি। ‘অন দ্য প্রিন্সিপল অব পপুলেশন’ বইতে মেলথাস যে আটটি বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেগুলো হলো; ১. ‘নিতান্ত প্রাণধারণ স্তরের’ অর্থনীতি জনসংখ্যা বৃদ্ধি সীমিত করে আনে। ২. নিতান্ত প্রাণধারণ স্তরের উন্নতি ঘটলে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। ৩. জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ অন্যান্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রণোদনা প্রদান করে। ৪. উৎপাদন বৃদ্ধি আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। ৫. যেহেতু উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, পৃথিবীর ধারণক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্য কঠোরভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হবে। ৬. যৌনতা, কাজকর্ম এবং সন্তানসন্ততির ব্যাপারে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাবই সংসার বড় হবে না সংকুচিত হবে, তা নির্ধারণ করে। ৭. জনসংখ্যার চাপ নিতান্ত প্রাণধারণ স্তর পেরিয়ে গেলেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের স্বয়ংক্রিয় বিষয়গুলো কাজ করতে শুরু করে। ৮. এই নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রভাব পড়বে বৃহত্তর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পদ্ধতির ওপর।

স্মরণ রাখবেন, মানুষ যখন কোন কাজ করে তা হয় নিজের সুবিধার দিকে দৃষ্টি রেখে। ধনী বাবার ছেলে মেলথাস যে তত্ত্ব দিয়েছেন তা হলো ধনীদের পূঁজি এবং সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার চিন্তায়। গরবীদের নিয়ে এখানে ভাবনা শুধু নিয়ন্ত্রন করার পথ ও পদ্ধতি আবিস্কার। গরীবদের মধ্যে যখন কেউ ভাবেন তখন দেখা যায় তারুণ্যে তিনি যতটুকু বিপ্লবী চিন্তা নিয়ে কাজ করেন, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি আপোষের পথে চলে যান। কিংবা দেখা যায় তার পরবর্তীরা আবার শুধু ধনীদের স্বার্থ রক্ষার্থে চেস্টা করেন। আমি ধর্মের শাস্ত্রিক থেকে মার্কর্সবাদীরা মূলত একই পথের যাত্রী : বেশিরভাগই পূঁজিবাদের গোলাম। তাই আজ আমেরিকা-বৃটেন-ফ্রান্স-ইটালী-চীন-আরব বিশ্বের পূঁজিবাদি সরকারগুলো যে ভাষায় কথা বলেন সেই ভাষায় কথা বলেন ধর্মীয় গুরুরাও। সাধারণ মানুষ এখানে দাবার একেকটি গুটি মাত্র। সাধারণ মানুষ এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা বুঝবে না মূল সমস্যা কোথায় সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সমস্যা থেকে উত্তির্ণ হতে হলে নিজেদের মধ্যে যোগ্যতা তৈরি করতে হবে জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্ম এবং প্রেমের সমন্বয়ে। সবমানুষের হৃদয়ে দয়া না জাগলে এসব সমস্যার সমাধান কোনদিন হবে না। তাই আমাদের উচিৎ জ্ঞান বুদ্ধি কর্ম এবং প্রেমের সমন্বয়ে সবার মনে দয়াকে জাগানোর চেষ্টা করা। স্মরণ রাখবেন, গরীবকে অবহেলা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ধনী-গরীবের সংঘাতও ক্ষতিকর। এখানে সমন্বয় সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে। সবাই মিলে সমাধান করতে হবে।

0Shares





Comments are Closed