হবিগঞ্জে ২১০ গ্রামপুলিশের মানবেতর জীবনযাপন
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: এলাকায় চুরি-ডাকাতি, মাদক নিয়ন্ত্রণসহ অপরাধ দমনে নানা ভূমিকা রাখলেও গ্রামপুলিশদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। রাতদিন ২৪ ঘন্টা বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা ও সরকারের উন্নয়নে অবদান রাখলেও গ্রামে তারা পড়ে আছেন অবহেলায়। ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে গেলেও নানা অপবাদের সমস্যায় পড়তে হয়। চৌকিদার পদটিকে অনেকেই অসম্মানজনক পদবী হিসেবে দেখছেন বলে গ্রাম পুলিশগণ জানিয়েছেন। তাদের সুখ দুঃখে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পাওয়া যাচ্ছে না।
হবিগঞ্জের ৭৮টি ইউনিয়নে রয়েছেন প্রায় ৭শ এর উপরে গ্রামপুলিশ। প্রতি ইউনিয়নে ৯ জন গ্রামপুলিশ সদস্য ও ১ জন দফাদার রয়েছেন। তারা কাজের হিসেবে পর্যাপ্ত বেতন ভাতাদিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে স্বল্প বেতনে গ্রামপুলিশরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
এদিকে গত দেড় বছর ধরে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং ও লাখাই উপজেলার ১৮০ জন গ্রাম পুলিশ তাদের থানায় হাজিরা ভাতা পাচ্ছেন না।
জানা গেছে- থানায় হাজিরা বাবদ গ্রাম পুলিশগণ প্রতি মাসে ১২শ’ টাকা পান। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ও সরকারের কাছ থেকে আরো ১ হাজার ৫০০ টাকা পান। এ নিয়ে প্রতি মাসে ৪ হাজার ২০০ টাকা বেতন পান গ্রামপুলিশ সদস্যরা। আর দফারদারগণ ৪ হাজার ৪০০ টাকা বেতন পান। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিডি, ভিজিএফসহ কোন ধরণের সহযোগিতাই গ্রামপুলিশরা পান না। অথচ জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিডি, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, ট্যাক্স আদায়, চেয়ারম্যানের বিভিন্ন কাজে সহায়তা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং চেয়ারম্যানের বাড়ি পাহারাসহ নানা কাজে নিয়োজিত থাকেন গ্রাম পুলিশেরা। শুধু তাই নয়, এলাকায় কোথাও অপরাধ সংঘটিত হলে সেই তথ্য থানা পুলিশের কাছে দেন গ্রামপুলিশরা। কোন এলাকায় দাগী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হলে পুলিশ গ্রামপুলিশদের সাথে নিয়ে যান। পরে অপরাধীরা গ্রামপুলিশদের উপর ক্ষিপ্ত থাকে। এতে গ্রামপুলিশদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হয়।
হবিগঞ্জের গ্রামপুলিশরা থানায় সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে হাজিরা দেন। হবিগঞ্জ সদর, লাখাই, নবীগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, মাধবপুর উপজেলার গ্রামপুলিশরা প্রতি মঙ্গলবার, বানিয়াচং উপজেলার গ্রামপুলিশরা সোমবার ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার গ্রামপুলিশরা প্রতি বৃহস্পতিবার থানায় হাজিরা দিয়ে থাকেন। থানায় গিয়ে গ্রামপুলিশরা এলাকার বিভিন্ন অপরাধ কাজের তথ্য দেয়া, মাসে একবার ইউএনও অফিসে হাজিরা দেয়াসহ রাত-দিন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে আসছেন। কিন্তু তাদের জীবনে স্বচ্ছলতার নিরাপত্তা নেই, ভাগ্যের উন্নয়ন নেই।
বানিয়াচং উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের দেড়শ ও লাখাই উপজেলার ৬০ জন গ্রামপুলিশ প্রায় দেড় বছর ধরে তাদের থানায় হাজিরার ভাতা পাচ্ছেন না। এতে ২১০ জন গ্রাম পুলিশ পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
করাব ইউনিয়নের গ্রামপুলিশ রাহেলা খাতুন জানান, ‘দেড় বছর ধরে আমরা থানায় হাজিরা ভাতা পাচ্ছি না। থানার হাজিরা ভাতা না পাওয়ার কারণে আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ‘
বানিয়াচং উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের গ্রামপুলিশ বাবুল মিয়া জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে গ্রাম পুলিশের চাকুরী করছি। আমরা যে টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে পরিবার চালানো অনেকটা কঠিন। এ অবস্থায় আমাদের প্রায় সময় অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হয়। পরিবারের কোন সদস্যরা অসুস্থ হলে অর্থে অভাবে ভাল ভাবে চিকিৎসা সেবাও দিতে পারছি না। সরকার আমাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কথা বলে এলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ করে পুলিশ বিভাগের কর্মীদের মতো গ্রামপুলিশ সদস্যদের রেশন দেয়ার প্রস্তাবও কার্যকর হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা অনেকটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে দেড় বছর ধরে থানায় হাজিরা ভাতা পাচ্ছি না। ‘
তিনি বলেন- ‘আমার ৫ ছেলেমেয়েসহ ৭ সদস্য রয়েছেন। গ্রাম পুলিশের চাকুরীর ওই বেতন দিয়েই আমার সংসার চালাতে হচ্ছে। ঈদেও আমরা ভাতা পাইনি। ‘
সূত্র মতে, একজন দিনমজুর বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে উর্পাজন করেন ৩০০-৫০০ টাকা। আর সেখানে একজন গ্রামপুলিশ গড়ে প্রতিদিনের মজুরী পড়ে মাত্র ৬৩ টাকা। গ্রাম পুলিশের জন্য বরাদ্দ জ্যাকেট, জুতা, ক্যাপ, টর্চলাইট ও হারিকেন সঠিকভাবে পান না তারা।
গ্রাম পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রাম পুলিশ সদস্যদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই নির্দেশটিও অকার্যকর হয়ে আছে।
হবিগঞ্জ জেলা গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ইউনূছ মিয়া জানান, ‘জেলায় ৭৮০ জন গ্রাম পুলিশ রয়েছে। কিন্তু আমরা কাজ অনুযায়ি বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। তেমনি সম্মানও পাচ্ছি না। আমাদেরকে চৌকিদার বলা হয়। চৌকিদার পদটি গ্রামের মানুষ অসম্মানের চোখে দেখেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও চৌকিদারের সন্তান বলে বিয়ে নিতে চান না। আবার দিতেও চান না। অথচ আমরা এলাকার মানুষের সেবায় সবসময় নিয়োজিত থাকি।’
তিনি বলেন- আমি বানিয়াচংয়ের মক্রমপুর ইউনিয়নে কর্মরত আছি। আমাদের উপজেলার গ্রামপুলিশদের দেড় বছর ধরে থানায় হাজিরা ভাতা আটকে আছে। এমতাবস্থায় আমাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় আমরা ন্যায্য অধিকারের দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের দাবিগুলো পূরণ হচ্ছে না। এছাড়াও আমাদের উন্নত কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। লাখাই ও বানিয়াচং উপজেলার গ্রাম পুলিশদের থানায় হাজিরার ভাতার বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবগত করেছি। তিনি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবগত করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল তালুকদার জানান, গ্রামপুলিশ সদস্যারা মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে যে পরিশ্রম করেন, সেই পরিশ্রম অনুযায়ী তারা বেতন ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না। যে কারণে তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। গ্রাম পুলিশদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
এছাড়া বানিয়াচং ও লাখাই’র গ্রাম পুলিশদের থানায় হাজিরা ভাতা পরিশোধসহ তাদের ঈদের ভাতা দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল তালুকদার।
Related News
হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাRead More
শিক্ষার্থীদের পরিবহন সুবিধায় হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস সেবার উদ্বোধন
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সুবিধা সহজ ও নিরাপদ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনRead More



Comments are Closed