Main Menu

কমলগঞ্জে বন্যা, পানিবন্দি অর্ধলক্ষ মানুষ

কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর নতুন ও পুরাতন ৮টি স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে প্রায় ৫০টি গ্রাম। ভারতের ত্রিপুরা এলাকা থেকে পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত কমলগঞ্জে ধলাই নদীর ৮টি স্থানে ও রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলার মনু নদীর ৪টি স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রত গতিতে ফসলি জমি তলিয়ে পানি প্রবেশ করছে গ্রামে। নদী ভাঙনে কমলগঞ্জে প্রায় অর্ধলক্ষ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বন্যার পানিতে নিমজ্জ্বিত থাকায় মুন্সীবাজার-কমলগঞ্জ-কুরমা সড়ক ও শমশেরনগর-কুলাউড়া সড়কের একাংশ তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এসব সড়কে কোথাও কোথাও হাটুপানি হওয়ায় যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। মুন্সীবাজার ইউনিয়ন ও কমলগঞ্জ পৌর এলাকায় শতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সহস্রাধিক হেক্টর আউশ ফসল পানিতে নিমজ্জ্বিত রয়েছে। অপরদিকে ভানুগাছ বাজার সংলগ্ন, রামপাশা, আলেপুর এলাকায় আরো ৩টি স্থান ঝুঁকির মুখে। বুধবার দুপুরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কমলগঞ্জ পৌরসভা ও মুন্সীবাজার ইউনিয়নের ১২৫টি পানিবন্দি পরিবারের মাঝে জরুরী ভিত্তিতে ১০ কেজি করে জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিন দুই রাত অবিরাম মাঝারী বৃষ্টিপাতে ধলাই নদীর কমলগঞ্জ পৌরসভার করিমপুর, মুন্সীবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, রহিমপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর, আদমপুর ইউনিয়নের কেওয়ালীঘাট, ঘোড়ামারা, মাধবপুর ইউনিয়নের কাটাবিল, ইসলামপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর নামক স্থানে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের পুরাতন ও নতুন ভাঙ্গন দিয়ে ৬টি ইউনিয়নের করিমপুর, ঘোড়ামারা, বাসুদেবপুর, সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, বনগাঁও, ধলাইরপার, শ্রীপুর, ঘোড়ামারা, হীরামতি, যুদ্ধাপুর, নাগড়া, গোপালনগর, নাজাতকোনা, কেওয়ালীঘাট, কান্দিগাঁও, হোমেরজানসহ ৫০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিতে ফসলী জমি তলিয়ে গেছে। এছাড়া ধলাই নদীর মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতি গ্রামের মেরামতকৃত বাঁধ ও কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চৈতন্যগঞ্জ এবং রামপাশা গ্রামে খুবই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। টানা বর্ষনে ধলাই নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মো. জুয়েল আহমদ বলেন, করিমপুর এলাকায় নদীর ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করায় পৌর এলাকার গোপাল নগর, করিমপুর, যুদ্ধাপুর ও নাগড়া গ্রামের তিনশ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় প্রাথমিকভাবে কিছু ত্রাণ সামগ্রী বিতরন চলছে।
মুন্সীবাজার ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব তরফদার জানান, ধলাই নদীর বাদে করিমপুর ও সুরানন্দপুর এলাকায় সৃষ্ট ভাঙনে প্রায় ৮০টি পরিবার বিধ্বস্ত হয়েছে। ৫ শতাধিক হেক্টর আউশ ফসল পানিতে নিমজ্জ্বিত রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলাতির কারণে যথাসময়ে ধলাই নদীর ভাঙন মেরামত না করায় এবার বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। ধলাই নদীর ভাঙ্গা বাঁধ মেরামতের জন্য জরুরী ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান।
আদমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন জানান, নদীর একাধিক স্থানে ভাঙনের ফলে ঘোড়ামারা, খেওয়ানিঘাট, কান্দিগাঁও, বন্দরগাঁও, মধ্যভাগ, হেরেঙ্গাবাজার গ্রামের প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নদীর পানি এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে মনুনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মঙ্গলবার রাতে কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকায়, বুধবার সকালে চাতলাপুর সেতুর উত্তরপাশে ও দুপুরে হাজীপুর ইউনিয়নের মিঞারপাড়া এলাকায় নদীভাঙনের ফলে পানি দ্রত গতিতে গ্রামে প্রবেশ করে। ফলে ১৫টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন। শরীফপুরের বটতলা থেকে চাঁনপুর পর্যন্ত প্রায় ২ কি.মি. সড়ক ৩ ফুট পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় এবং কুলাউড়া-শমশেরনগর সড়কে টিলাগাঁও এলাকায় সড়কে পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় কুলাউড়া-শমশেরনগর ও বাংলাদেশ-ভারত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. জনাব আলী বলেন, মঙ্গলবার শবেকদরের রাত সাড়ে ৮টায় আমলা বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মনু প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হলে গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা মিলে শতাধিক বস্তা বালু দিয়ে এ স্থান রক্ষা করেন। তবে রাত আড়াইটায় বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রত গতিতে ঢলের পানি গ্রামে প্রবেশ করে। এ পানি বসতঘর সহ ফসরি জমি তলিয়ে নেয়। বাঘজুর, তেলিবিল, চাঁনপুর, খাম্বারঘাট, শরীফপুর, বটতলা, সঞ্জরপুর গ্রামের ২ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী শরীফপুরে মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ৩ টি স্থানের ভাঙ্গনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মনুর চাতলা সেতু এলাকায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৮০ সে.মি. বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, করিমপুর এলাকার প্রায় দেড়শ ফুট ভাঙন পরিদর্শন করেছি। এছাড়া পুরনো কয়েকটি ভাঙন দিয়ে পানি বেরুচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন এ দিকে সতর্কতার সাথে নজরদারী করছে। আপাতত কয়েকটি এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরন করা হচ্ছে।

এদিকে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নে মনু নদের ৪টি স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রত গতিতে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে গ্রামে ও ফসলি জমিতে। আকস্মিকভাবে বাঁধ ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করায় শরীফপুর ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের ৩ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছেন। শরীফপুরের আমতলাতলা থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত প্রায় ৪ কি:মি: সড়ক ৩ ফুট পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত ও দুটি স্থানে সড়ক ভেঙ্গে গেছে। মনু নদের চাতলা সেতু একটি কালভার্টের একাংশ ধেবে যায়ায় বুধবার দুপুর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে দুই দেশের কোন যাত্রীও যাতায়াত করতে পারেনি।
সোমবার ও মঙ্গলবারের টানা বৃষ্টিতে ও উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানিতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে মনু নদে পানি বৃদ্ধি পেয়ে রাত আড়াইটায় তেলিবিল, বাঘজুর, চাতলা সেতু সংলগ্ন ও নিশ্চিন্তপুর গ্রামে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে ঢলের পানি প্রবেশ করে গ্রামে। ঢলের পানিতে বসতঘর, গ্রাম্য রাস্তা ও ফসরি জমি নিমজ্জিত হয়।
শরীফপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জুনাব আলী জানান, মঙ্গলবার শবেকদরের রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমলা বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন মনু প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন শুরু হলে গ্রামবাসী ও বিজিবি সদস্যরা মিলে শতাধিক বস্তা বালু দিয়ে এ স্থান রক্ষা করেন। তবে রাত আড়াইটায় বাঘজুর ও তেলিবিল গ্রাম এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে দ্রত গতিতে ঢলের পানি গ্রামে প্রবেশ করে। এ পানি বসতঘর সহ ফসরি জমি তলিয়ে নেয়। ফলে বাঘজুর, তেলিবিল, চাঁনপুর, খাম্বারঘাট, শরীফপুর, বটতলা, সঞ্জরপুর গ্রামের ২ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন। এসব গ্রামের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। আবার বেমীর ভাড়ই বেড়ি বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছেন।
ইউপি চেয়ারম্যান মো: জুনাব আলী আরও বলেন, এ অবস্থায় পানিবন্ধী মানুষজন সঠিকভাবে শবেকদরের ইবাদত করতে পারেনি। এমনকি তারা ঈদুল ফিতরও সঠিকভাবে পালন করতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। মনু নদের পানি প্রবেম করে শরীফপুর ইউনিয়নের ১২ টি গ্রামের ব্যাপক এলাকার রোপিত আউশ ফসল ও এ মৌসুমের শাক সব্জি বিনষ্ট হয়েছে।
একই সময় চাতলা সেতুর উত্তর দিকে কয়েক মাস আগে নির্মিত প্রতিরক্ষা বাঁধও ভেঙ্গে ঢলের পানি দ্রত গতিতে গ্রামে প্রবেশ করে। বুধবার সকাল ১০টায় আবার নিশ্চিন্তপুর গ্রাম এলাকায় মনু নদের প্রতিরক্ষঅ বাঁধে নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দেয়। ফলে নছিরগঞ্জ, ইটারঘাট, মনোহরপুর, নিশ্চিন্তপুর, মাদানগর গ্রামের ১ হাজার মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েন। সরেজমিন দেখা যায় আমতলা বাজার থেকে ৪ কি:মি: দূরবর্তী চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত সড়কের ২টি স্থান ভেঙ্গে নালার সৃষ্টি হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় চাতলা সেতুর উত্তর দিক ও এ সেতুর সংলগ্ন একটি কালভার্ট ধেবে যায়। এর পর থেকে এ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে দুই দেশে যাতায়াতকারী অনেক যাত্রীকে আটকা পড়তে দেখা যায়।
পানি উন্নঢয়ন বোর্ড মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী শরীফপুরে মনু নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ৪ টি স্থানের ভাঙ্গনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মনুর চাতলা সেতু এলাকায় বুধবার দুপুরে ১৭৩ সে:মি: বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। সড়ক জনপথ বিভাগের মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মিন্টু রঞ্জন দেবনাথ বলেন, মনু নদের চাতলা সেতু খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। তার সাথের একটি কালভার্টের এক দিক ধেবে যাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন সড়ক ও জনপথের লোকজন এ দিকে নজরদারী করছে।

বুধবার বেলা আড়াইটায় মৌলভীবাজার-২ আসনের সাংসদ আব্দুল মতিন, কুলাউড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো: গোলাম রাব্বি শরীফপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শণ করেন। সাংসদ আব্দুল মতিন, উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম ও নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মো: গোলাম রাব্বি বলেন, এ ইউনিয়নের পানিবন্ধী মানুষজনের জন্য জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ প্রদানসহ আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া নদে পানি কমলে ও সড়ক ধেতে পানি নেমে গেলে জরুরী ভিত্তিতে সড়ক যোগাযোগ চালু রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে কাজ করা হবে বলেও তারা জানান।

Share





Related News

Comments are Closed