Main Menu

মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর তৈরি করল কাঠমিস্ত্রী দীন ইসলাম

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ থেকে : একটি বা দুটি নয় সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধার একাধিক ভাস্কর নির্মাণ করলেন মোঃ দীন ইসলাম খা (৪৩)। তার পূর্ব নাম হরিপদ সূত্রধর। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার নাছিরপুর গ্রামের মৃত শিশুরঞ্জন সূত্রধরের পুত্র। ৪ বছর পূর্বে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি মোঃ দীন ইসলাম খা নামধারন করেন। তিনি গ্রামে মাত্র ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। জীবিকার তাগিদে পেশা হিসেবে বেচে নেন কাঠমিস্ত্রীর কাজ। দোকানে দোকানে অর্ডারী বা সিডিউল মোতাবেক কাজ করতে গিয়ে তার অনুসন্ধানী মন নতুন কিছু আবিষ্কারের দিকে তাকে ধাবিত করে। তিনি টেলিভিশনে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও ঐতিহ্যের কথা শুনেছেন ও দেখেছেন। টেলিভিশনে ভাস্কর শিল্পের কদরের প্রতিও তার নজর কাটে। এ থেকেই তিনি সিদ্বান্ত নেন সময় ও সুযোগে তিনিও ভাস্কর নির্মাণ করবেন। তিনি যেসব ফার্নিসারের অর্থাৎ কাঠমালের দোকানে চাকরী করেন সেসব দোকানের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি আরামের ঘুমকে হারাম করে লেগে যান এ কাজে। গভীর থেকে গভীরতর মনোযোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩০টি ভাস্কর নির্মাণ করেছেন। নিজ জেলা সদর ছেড়ে সর্বপ্রথমে কাজের সন্ধানে তিনি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা সদরে আসেন। কিছুদিন কাজ করেন উপজেলার শ্যামারচর বাজারের সুরঞ্জন দে এর মালিকানাধীন রাধিকা সো মিল এন্ড ফার্নিচারের দোকানে। এই সময় তার পরিচয় হয় সুনামগঞ্জ ২ নির্বাচনী এলাকা দিরাই-শাল্লা আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তার সাথে। পরে জয়া সেন গুপ্তা এমপির দেয়া একজন মুক্তিযোদ্ধার একটি ছবি দেখে তিনি ঐ মুক্তিযোদ্ধার চেহারার সাথে হুবহু মিল রেখে একটি ভাস্কর নির্মাণ করেন। কাজের ফাকে ফাকে ঐ ভাস্করটি নির্মাণ করতে গিয়ে তার ৮ মাস ১৯ দিন সময় লেগে যায়।
পরে মাস দেড়েক আগে চলে আসেন সুনামগঞ্জ জেলা সদরের উকিলপাড়াস্থ আবাসিক এলাকাধীন শাহজালাল ফার্নিচার নামক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের মইনপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের মালিকানাধীন ঐ প্রতিষ্ঠানে দিনে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেই রাত্রিযাপন করেন তিনি। দিনের বেলা প্রতিষ্ঠান মালিকের ডেলিভারীর কাজ করার পাশাপাশি যখনই ফুরসৎ পান তখনই তিনি লেগে যান ভাস্কর নির্মাণের কাজে। মাত্র ১ মাসের সময় নিয়ে তিনি দুজন মক্তিযোদ্ধার দুটি ভাস্কর নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে বড়টি হচ্ছে জীবিত মুক্তিযোদ্ধা আর ছোটটি হচ্ছে একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর।
দীন ইসলাম খা এর নির্মিত ভাস্কর দুটি দেখে তার কাজের প্রতি মারাত্মক আগ্রহ সৃষ্টি হয় দৈনিক সুনামগঞ্জ প্রতিদিন পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী, যুক্তরাজ্য থেকে প্রত্যাগত অনলাইন ওয়েবপোর্টাল সুনামগঞ্জ বার্তার সম্পাদক ইমানুজ্জামান মহীসহ উকিলপাড়া আবাসিক এলাকার স্থানীয় নাগরিকদের। তারা প্রতিদিনই ঘুরে ফিরে ভাস্কর দুটি প্রত্যক্ষ করেন আগ্রহ ভরে। তারা বলেন, চেষ্টা করলে সবই হয়। একটি লোক প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছাড়াই শুধুমাত্র নিজের সদিচ্ছায় এমন সুন্দর কাজ করতে পারে না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায়না। তারা ভাস্কর শিল্পী দীন ইসলামের সার্বিক সাফল্য কামনা করে বলেন, আমরা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের কথা শুনেছি কিন্তু গ্রামেগঞ্জে দীন ইসলামের মতো অনেক প্রতিভাবান ভাস্কর শিল্পী রয়েছেন যাদেরকে কেউ দেখেনি। তাদের কাজকে স্বীকৃতি দিলে দেশের শিল্প ও ঐতিহ্যের সম্মান বাড়বে। কোনপ্রকার লোহা ছাড়াই ৩ খন্ডে সম্পূর্ণ কাঠের তৈরী দুটি ভাস্করের সৌন্দর্য্য দেখার মতোই। নি:সন্দেহে এগুলো এক অপূর্ব সৃষ্টি। এছাড়া এর সাথে একজন মেহনতি মানুষের শুধু কায়িক মানসিক শ্রমই নয় বরং এর সাথে যুক্ত রয়েছে নিরলস শ্রম ও অব্যাহত সাধনারও।
২১ শে ফেব্রয়ারী মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে নিজের তৈরী এ দুটি ভাস্কর্য্য দীন ইসলাম উপহার দিতে চান সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসককে। তার দাবী এ দুটি ভাস্কর শিল্প যেন সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য যাদুঘরে রাখা হয়। অথবা জেলা প্রশাসক যেখানে মনে করেন সেখানে যেন তিনি দুটি ভাস্কর্যকে কাজে লাগান। এই উপহারের মাধ্যমে তিনি অর্জন করতে চান সুনাম। পেতে চান কাজের স্বীকৃতি।
এছাড়া জেলা প্রশাসন বা বিত্তবাণরা যদি কোন পছন্দের ভাস্কর নির্মাণ করতে চান তাহলে তারা যেন এই কাজটির ভার তাকে দেন। তাহলে এই কাজটি মনোযোগের সাথে করার পাশাপাশি তিনি যে পারিশ্রমিক পাবেন সেই পারিশ্রমিকের দ্বারাই তিনি সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। এরচেয়ে আর বড় কোন প্রত্যাশা নেই ভাস্কর শিল্পী মোঃ দীন ইসলাম খা এর।

Share





Related News

Comments are Closed