Main Menu

কুশিয়ারা নদীর তীরে

Manual4 Ad Code

মোঃ ফয়জুর রহমান: অনন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের আলোক ছটায় আমাদের দেশ পৃথিবীর মানচিত্রে আপন আলোয় চির ভাস্বর। পাহাড়-পর্বত, জলপ্রপাত, সমতল ভূমি, সমুদ্র সৈকত কি নেই আমাদের রূপসী বাংলায়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল অফুরন্ত সৌন্দর্যে ভরপুর এক অপরূপ রূপের আলপনা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সবুজ শ্যামলীমায় শোভিত আমাদের গ্রামাঞ্চলগুলো। তার মধ্য থেকে আমার জন্মভ‚মি বহর গ্রাম অন্যতম। যে দিকে যে প্রান্তেই চোখ রাখা হোক না কেনো এর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আমার মনে প্রশান্তি আনে। মন-প্রাণ ভরে উঠে এর অনাবিল সৌন্দর্য অবলোকন করে। গাছপালা তৃণভূমি শোভিত বনের মনোরম দৃশ্য, নদ-নদীর অপরূপ সৌন্দর্য, শোভাময় ফসলের মাঠ, ক্ষেত সবই আমার হৃদয়ে আনন্দের স্রোত ধারা বইয়ে দেয়।
আমাদের বহর গ্রাম, সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত বুধবারি বাজার ইউনিয়নে অবস্থিত। পার্শ্ববর্তী গ্রাম, উত্তর দিকে বানী গ্রাম, দেউল গ্রাম, গোবিন্দশ্রী ও আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর। দক্ষিন দিকে কালিজুরী,বাগির ঘাট, বন গ্রাম, চন্দরপুর সহ আরো অন্যান্য গ্রাম। পূর্বে পুরুষপাল মাথিউরা পশ্চিমে নয়নাভিরাম কুশিয়ারা নদী। গ্রামের প্রতিটি মানুষ কোন না কোন ভাবে মানুষের সেবায় নিয়োজিত এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত আমাদের বহর গ্রাম অন্যতম একটি আদর্শ গ্রাম। আমাদের বহর গ্রামে গর্ব করার মত অনেক গুনিজনের জন্ম হয়েছে সবার পরিচয় ও নাম লিখতে হলে অনেক সময় এর প্রয়োজন, আমার অনেক শ্রদ্ধাভাজন ও গুনীজনদের ছবি ও পরিচয় তুলে ধরিলাম এবং শত ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও অনেক জ্ঞানি গুনী ব্যক্তিদের ছবি সংগ্রহ করতে পারি নাই বলে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং অনেক প্রিয় ব্যক্তি আজ এই পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন এবং জীবিত অনেক গুনী জন রয়েছেন যারা বিভিন্ন পেশা নিয়ে দেশে এবং বিদেশে সুনামের সাথে বসবাস করছেন। আমাদের বহর গ্রামে রয়েছে একটি শতবর্ষী প্রাথমিক বিদ্যালয়। যা প্রতিষ্ঠিত ১৯১৫ ইংরেজিতে আমাদের স্কুল আমাদের গৌরব । ১০২ বছরের ঐতিহ্যমন্ডিত বহর গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পেরে নিজের গর্ববোধ হয়। আমাদের আরো রয়েছে বেশ কয়েকটি মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ, পোষ্ট অফিস সহ অন্যান্য সংগঠন। তাদের মধ্যে রয়েছে আমাদের একতার প্রতীক বহর গ্রাম জনমঙ্গল-সমিতি ও একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, মুফজ্জিল আলী ফ্রি মেডিকল সেন্টার। যার সত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় জনাব আব্দুল ওয়াদুদ (কলা মিয়া) সাহেব। তিনি নিজ অর্থ ব্যয় করে গরীব মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের গ্রামে রয়েছেন আরো অনেক কৃতি সন্তান যারা ব্যক্তিগত ভাবে নিজ অর্থ ব্যয় করে মানবিক ভাবে আর্থিক সাহায্য করে মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা বহর গ্রামের মানুষ মনের দিক দিয়ে অনেক বড় যার জন্য সত্যিই আমি গর্বিত। মহৎ হৃদয়বৃত্তি ও মানবধর্ম বলতে আমরা জনসেবাকেই বুঝি। জনসেবা মানুষের জীবনে অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে। নিজের, দুঃখ দূর করার অন্যতম উপায় হলো অন্যের দুঃখ দূর করার চেষ্টা করা। কারণ কেউ পৃথিবীতে একা একা সুখী হতে পারে না। সমাজে প্রত্যেকের সত্যিকার সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি তখনই আসে যখন সেই সমাজে জনসেবার সঠিক চর্চা হয়। জনসেবাই একটি সুখী, সমৃদ্ধ, অসা¤প্রদায়িক সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। সুতরাং আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের জীবনে এই গুণের বিকাশ ঘটানো উচিত।
বহর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বেশ কিছু অত্যন্ত ভাল মানুষ, যাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁহাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আজকের আমাদের এই গ্রাম। আমাদের গ্রামের সকল শ্রেনীর গুণীজনদের প্রতি রহিল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বহর গ্রামের মানুষের শিক্ষার হারের দিকটা ও অনেক উচ্চতায়। এককালের আমাদের সিলেটের গর্ব ঐতিহ্যবাহী মুরারি চাঁদ কলেজ এবং প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিলাতের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ও অনেক গুনিজনরা শিক্ষা অর্জন করে স্বনামে ধন্য হয়ে বহর গ্রামবাসীকে গর্বিত করেছেন। আজ দেশ ও বিদেশে আমাদের বেশ কয়েকজন শিক্ষক, হাফিজ, মাওলানা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, এডভোকেট, বৃটিশ কুটনিতিক, ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ পাইলট, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, ফার্মাসিস্ট ও ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা সহ আরো অনেকে বিভিন্ন রকমের পেশায় জড়িত আছেন। আমাদের বহর গ্রামের বাসিন্দা, যে যেখানে আছেন সবাই যেন ভাল থাকেন এই কামনা করি। আমার মন-প্রাণ মিশে আছে আমার জন্ম মাটি বহর গ্রামে। গ্রাম-পল্লী প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সৃষ্টিকর্তার অপরূপ নিদর্শন গুলোর একটি। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে- ‘God made the village and man made the town’ ‘(আল্লাহ পাক গ্রাম অঞ্চল ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, আর মানুষ শহরকে তৈরী করেছেন) পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে তাই এই কথাটি বেশ জনপ্রিয়। গ্রামীণ জীবন প্রকৃতির সাথে স¤পর্কযুক্ত। প্রকৃতির স্নিগ্ধ সবুজ, প্রশান্তির ছায়া, কোমল হাওয়া, কাক ডাকা ভোর বা টিনের চালে রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ প্রভৃতি আনন্দময় অনুভূতি ও মুহূর্ত কেবল মাত্র গ্রামীণ জীবনের সংস্পর্শেই পাওয়া যায়। গ্রামের সারি সারি গাছপালা, আঁকা-বাঁকা মেঠোপথ, ফসলের মাঠ, ক্ষেত, বসতবাড়ি, পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য সবকিছুই ছবির মতো। সব কিছু মিলে গ্রাম-বাংলার জীবনযাত্রা পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের “নকশী কাঁথার মাঠ” এর মতোই অনিন্দ সুন্দর ও মায়া-মমতা জড়ানো। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার পল্লী প্রকৃতিকে ভালোবেসে মমতা ভরা হৃদয়ে রচনা করে গেছেন “একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।” গ্রামাঞ্চলের সাথে আমাদের নাড়ির স¤পর্ক। পলাশ ডালে-কোকিল ডাকে,আর ধানের ক্ষেতে মৃদু মন্দ হাওয়ার ঢেউ খেলানোর মতো দৃশ্য গ্রাম বাংলার এক চিরাচরিত রূপ। দিগন্ত-জোড়া ফসলের ক্ষেতের মাঝখানে কিছুদূর পর পর দু-একটা বসতবাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। কল্পনার রাজ্যে তখন এই ছোট্ট ঘর গুলোকেও রাজপ্রাসাদের মতো মনে হয়। দোয়েল, কোয়েল, কোকিল, ঘুঘু, পাপিয়া, বৌ-কথা কও প্রভৃতি পাখি গ্রাম্য প্রকৃতিকে সারাবেলা মোহনীয় সঙ্গীতে মাতিয়ে রাখে। ধানের ক্ষেতে অল্প পানিতে বকের এক পায়ে-দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য, মাছরাঙ্গা পাখির পুকুর থেকে মাছ শিকারের ফন্দি দেখা, ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর মতো সুখ কেবলমাত্র গ্রামে এলেই মানুষ পেতে পারে। প্রবাস জীবনে এই সুখটি নেই, আজ রূপসী বাংলার গ্রামাঞ্চলের কথা খুউব মনে পড়ে। আমাদের বাংলাদশের প্রতিটি গ্রাম, থানা,জিলা ও বিভাগের মানুষ সূখি সুন্দর জীবন যাপন করুক,সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক আর গর্বে ভরে উটুক আমাদের বুক, এই প্রত্যাশা।

Manual4 Ad Code

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও কলামিস্ট।

 

Manual7 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code