সাংবাদিক সঞ্জিব চৌধুরী : অসাম্প্রদায়িক নিরহংকার মানুষের প্রতিকৃত
সৈয়দ মবনু : ৩১ আগস্ট ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে প্রবীণ সাংবাদিক সঞ্জিব চৌধুরী মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। এদিন রাত ১০টা ২০ মিনিটে নিউ নেশন পত্রিকায় কর্মরত অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন সঞ্জীব চৌধুরী। পরে তাঁকে দ্রুত স্বামীবাগের আজগর মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি মারা যান। সঞ্জীব চৌধুরী নিউ নেশন-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তিনি দৈনিক আমারদেশ, দৈনিক যুগান্তর সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। কলাম লেখক হিসেবেও তার যথেষ্ট সুনাম ছিলো।
সঞ্জিব চৌধুরীর বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি ঢাকায় থাকতেন। তাঁর সাথে আমার পরিচয় আমারদেশ পত্রিকার অফিসে। দৈনিক আমারদেশের সিনিয়র সাংবাদিক ‘বাছির জামাল’ আমার আত্মীয়। সিলেটী ভাষায় বলে তালতো ভাই আর সিলেটের বাইরে অনেক জায়গায় বলে ‘বেয়াই’। সিলেটীরা ‘বেয়াই’ বলে ছেলে বা মেয়ের শশুড়কে। বাছির জামালের বড়ভাই অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল কাদির সালেহ হলেন আমার ছোটবোনের স্বামী। বাছির জামালের মাধ্যমে আমারদেশ পত্রিকা অফিসে আমার প্রথম যাওয়া। সেখানে ব্যক্তিগত পরিচয় সঞ্জিব চৌধুরীর সাথে। তবে তাঁর অনেক লেখার সাথে আগেই পরিচিত। তাঁর সাথে কথা বলে এবং তাঁর লেখাপড়ে আমি বুঝতে পেরেছি তিনি একজন অসাম্প্রদায়িক লোক। তিনি মন-প্রাণে বাঙালী কিংবা বাংলাদেশী। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অধিকারি। একাত্তরের পর স্থানীয় আওয়ামীলীগের একজন নেতা তাদের বাড়ি দখল করে নিলে তাঁর মনে কষ্ট জেগে ওঠে। অতঃপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেন তখন তিনি এতে যোগদেন। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই হলো বিএনপিতে যাওয়া সম্পর্কিত তাঁর বক্তব্য। তবে জামায়াতে ইসলামী কিংবা রাজাকারদের সাথে তাঁর কোনদিনই সুসম্পর্ক ছিলো না বলে আমি জানি। জামায়াতিরাও তাঁকে তেমন পছন্দ করতো না। ঢাকায় আমাকে প্রথম একজন জামায়াত ঘরানার বড় সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘সঞ্জিব চৌধুরী ‘র’-এর এজেন্ট, তাঁর থেকে দূরে থাকতে’। জামায়াতের ‘র’-এর এজেন্ট মানে জামায়াত বিরোধী, বা পাকিস্তান বিরোধী, তা একাত্তরের পটভূমি থেকে বাংলার মানুষের বিশ্বাস।
সঞ্জিব চৌধুরী ইসলামপন্থী বলতে ছোটবেলা থেকেই দেওবন্দীদেরকে জানেন এবং ভালোবাসেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেওবন্দীদের ভূমিকা তাঁর কাছে ছিলো স্পষ্ট। তিনি অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন রেশমি রোমাল আন্দোলনের নেতা শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (র.)। আমার ‘দ্রাবিড় বাংলার রাজনীতি’ বই পাঠের পর তিনি টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, ‘এতে রেশমি রোমাল আন্দোলনকে আধুনিক ভঙিতে উপস্থাপন হয়েছে।’ তিনি ভক্ত ছিলেন শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (র.)-এর ও। খতিব আল্লামা উবায়দুল হক (র.)-কে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (র.) ইন্তেকাল করেন। এরপর সিলেটে ইসলামিক কালচারেল ফোর্স কর্তৃক খতিব আল্লামা উবায়দুল হকের জীবন ও কর্ম শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় ২৯ অক্টোবর ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে। ইসলামিক কালচারেল ফোর্স-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সংগঠনের তৎকালিন দায়িত্বশীলরা আমাকে বললেন তারা ঢাকা থেকে দৈনিক আমারদেশের সঞ্জিব চৌধুরী এবং দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীকে অতিথি করতে ইচ্ছুক, যদি আমি সহযোগিতা করি। আমি তাদের অনুরোধে যোগাযোগ করলে তারা রাজি হয়ে গেলেন। ২৯ অক্টোবর, দুপুর ২টায়, দরগাহ গেটস্থ শহিদ সোলেমান হলের অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ লিখিতভাবে উপস্থাপন করি আমি। প্রধান অথিতি হিসাবে বক্তব্য রাখেন, দৈনিক আমারদেশ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক সঞ্জিব চৌধুরী। বিশেষ অথিতি ছিলেন দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরী, বিশিষ্ট্য গবেষক আব্দুল হামিদ মানিক, কাজির বাজার মাদরাসার তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল মাওলানা নেজাম উদ্দিন, সোবহানীঘাট মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল মালিক মোবারকপুরী, জামেয়া নূরিয়া ভার্থখলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মজদুদ্দীন, সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডা. শিব্বির আহমদ শিবলি, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ এস মতলুব আহমদ, দরগাহ মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা খলিলুর রহমান, ইমাম প্রশিক্ষন একাডেমীর সহকারি পরিচালক মাওলানা শাহ নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদকক সেলিম আউয়াল, বেফাকের পরিদর্শক মাওলানা আজিজুর রহমান। দোয়া পরিচালনা করেন খতিব সাহেবের ছেলে মাওলনা আতাউল হক। সভাপতিত্ব করেছিলেন, ইসলামিক কালচারাল ফোর্সের তৎকালিন সভাপতি খন্দকার খালেদ হোসেন এবং সঞ্চলনায় ছিলেন সংগঠনের সেক্রেটারী আবুল কালাম আজাদ।
সেদিন প্রধান অথিতির বক্তব্যে প্রবীণ সাংবাদিক সঞ্জিব চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ধনতান্তিক ব্যবস্থার কাঠামোই এমন যে তাদের শত্রুপক্ষ লাগে। তাগে ছিলো সমাজতন্ত্র, এখন ইসলাম ও মুসলমান সেই শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মুসলমানদেরকে, ইসলামকে ভালোভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে। তিনি বলেন, একজন মুসলমানের ইসলামের মহত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খতিব মাওলানা উবায়দুল হক ছিলেন সেই মহৎপ্রাণ ব্যক্তি।’
২০০৪ খ্রিস্টাব্দে একযোগে সারাদেশে বোমা হামলার পর বিএনপি জামায়াত-সরকার যখন এর দায় কওমী মাদরাসাগুলোর ঘাড়ে চাপাতে চাইলো তখন হিউম্যান রাইটস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের তৎকালিন প্রধান সঞ্জীব চৌধুরী একটি তথ্যবহুল আর্টিক্যাল লিখে বিভিন্ন দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার কাছে প্রেরণ করেন। এতে বেশ কাজ হয়। জামায়াত-বি এন পির নীল নক্সা এতে প্রকাশ পেয়ে যায়, ফলে কওমী মাদরাসাগুলো সরাসরি অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়।
সঞ্জিব চৌধুরী মনে করতেন, ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে আল্লামা কাসেম নানুতুবী (র.)-এর নেতৃত্বে যদি দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত না হতো তবে বাংলাদেশে মুসলমানদের অস্থিত্ব হারিকেন দিয়ে তালাশ করেও পাওয়া যেতো না। তিনি খুব বেশি আলেম, উলামা, পির-মাশায়েখদের ভক্ত ছিলেন। তিনি খুব অন্তর থেকে আলেম-উলামাদেরকে ভালোবাসতেন। ফলে অনেকেই তাঁকে রহস্য মানব মনে করতো। ইসলামী অঙ্গনে তিনি খুব সম্মানিত ছিলেন বলে তাঁকে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখতো। তিনি দৈনিক আমারদেশের সিনিয়র সহকারি সম্পাদক ছিলেন বলে অনেকে তাঁকে খালেদা জিয়ার উপদেষ্ঠা মনে করেন। তিনি বিভিন্ন ইসলামী পত্রিকায় লিখতেন এবং ইসলামী অনুষ্ঠানে যেতেন বলে অনেকে তাঁকে সিআই’র এজেন্ট বলে অপপ্রচার করতেন। তিনি হেসে এসব উড়িয়ে দিয়ে বলতেন, ওদের কথা হলো তুমি মলাউন বেটা, তুমি কেনো ইসলাম কিংবা মুসলমানের পক্ষে কথা কইবা? তিনি আমাকে স্বাক্ষী রেখে বলতেন, ‘মবনু ভাই বলেন তো আমি কার পক্ষে? জানেন, যাদের জন্য চুরি করি তারাই শেষ পর্যন্ত আমাকে চোর বলে।’
সঞ্জিব চৌধুরীকে আমি যতদিন থেকে জানি, দেখেছি নিজের খেয়ে অন্যের উপদেষ্ঠা হওয়াতে তিনি বেশ মজা পেতেন। তাঁর জীবন ছিলো খুবই সাধারণ। বিএনপিতে ছিলেন, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টাও হয়তো ছিলেন, কিন্তু এগুলো শুধু নামে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকতেও আমি তাঁকে দেখেছি, খুবই সাধারণ মানুষ। যেখানে সরকারী দলের গ্রাম কমিটির সদস্য হলে প্রভাব খাটানোর ডং দেখলে মনে রাষ্ট্রপতি, সেখানে কেন্দ্রীয় নেতা হয়েও থাকতেন নীচের দিকে মাথা দিয়ে। কোথাও কোন বিষয়ে প্রভাব খাটাতে তাঁকে কোনদিন দেখিনি। গাড়ী নেই, নিজস্ব কোন বাড়ি নেই, অনেক সময় পেকেটে টাকা নেই। দৈনিক আমারদেশ পত্রিকা বন্ধের পর ঘর কিংবা গাড়ি ভাড়া দিতে গিয়েও হিমশিম খেতে আমি সঞ্জিব চৌধুরীকে দেখেছি।
সিলেটের বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা মানবাধিকার সংগঠন সঞ্জিব চৌধুরীকে মাঝেমধ্যে প্রধান অতিথি করে নিয়ে আসতো। সিলেট পৌঁছলেই তিনি আমাকে একটা ফোন দিতেন। আমি সিলেট থাকলে মাঝেমধ্যে তাঁকে দেখতে যেতাম। দৈনিক আমারদেশ পত্রিকা থাকতে পত্রিকা অফিসে গেলে তাঁর সাথে দেখা হতো, কথা হতো। পত্রিকা বন্ধের পর ঢাকায় গেলে তাঁকে ফোন দিলে চলে আসতেন আমার হোটেলে। কোনদিন তাঁর কাছে কোন রকম অহংকার আমি দেখিনি।
গত দুতিন বছর আগে, সঞ্জিব চৌধুরী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে সিলেট আসলে মেহমান হয়েছিলেন সাংবাদিক আফতাব চৌধুরীর বাসায়। সেখান থেকে আমাকে ফোন দিলেন। আমি তাঁর সাথে দেখা করি এবং আমাদের মাদরাসায় দাওয়াত করি। তিনি রাজি হলেন এক শর্তে, যদি আমি তাঁর সাথে বিশ্বনাথ যাই। বিশ্বনাথে কোন অনুষ্ঠান নয়, দৈনিক আমারদেশের বিশ্বানাথ প্রতিনিধি নজমুল ইসলাম মকবুলের বাড়িতে খাবার দাওয়াত। আমরা যাবো সাংবাদিক আফতাব চৌধুরীর গাড়ি দিয়ে। তিনিও যাবেন। তারিখটা স্মরণ করতে পারছি না। সেদিন সকালে তিনি জামিআ সিদ্দিকিয়ায় আসলেন এবং দুপুরের পর আমরা নজমুল ইসলাম মকবুল-এর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাই। জামিআ সিদ্দিকিয়ায় তেমন কোন আয়োজন ছিলো না, শুধু ছাত্রদের সামনে কিছু কথা বলা। জামিআ সিদ্দিকিয়ায় তিনি ইতোমধ্যে আরেকবার এসেছেন যখন খতিব সাহেবের স্মরণসভায় এসেছিলেন। তখন তিনি একরাত মাদরাসায় থেকে ছিলেন। আমাদের জামিআ সিদ্দিকিয়ায় যেকোন অনুষ্ঠানে বক্তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং আদবের সাথে যেকোন প্রশ্ন করা যেতে পারে। সেদিন সঞ্জিব চৌধুরীর ইসলাম দরদী বক্তব্যের পর আমাদের একজন ছাত্র সঞ্জিব চৌধুরিকে প্রশ্ন করলো, আপনি ইসলাম সম্পর্কে এত সুন্দর কথা বলেন, আপনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন না কেন? সঞ্জিব চৌধুরি তখন খুব শান্ত ভাষায় উত্তরে বলেছিলেন, আমি ইসলামকে জ্ঞানের দিক থেকে বিবেচনা করি, আর মুসলিম নির্যাতনকে মানবিক দিক থেকে দেখতে চাই। ধর্ম বিশ্বাস আমার ভিন্ন বিষয়। আমি চাই সবাই নিজ নিজ ধর্মে থেকে অন্য ধর্মের লোকদেরকে শ্রদ্ধা করতে শিখুক।
Related News
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান: বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়েRead More
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু
হক মোঃ ইমদাদুল: বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের,Read More



Comments are Closed