Main Menu

এতেকাফ: ঈমানি তারবিয়াতের পাঠশালা

আতিকুর রহমান নগরী: নির্ধারিত সময়ে সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে পার্থিব ও জাগতিক সবধরনের সংশ্রব ত্যাগ করে মসজিদে অবস্থান করাকে এতেকাফ বলে। বিশেষ করে তা নিয়তের সঙ্গে হতে হবে, অন্যথায় সহিহ হবে না।
এতেকাফ একটি মহান ইবাদত, মদিনায় অবস্থানকালীন সময়ে রাসূলুল­াহ সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম প্রতি বছরই এতেকাফ পালন করতেন। দাওয়াত, তারবিয়ত, শিক্ষা এবং জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্তে¡ও রমজানে তিনি এতেকাফ ছাঙেননি। এতেকাফ ঈমানি তারবিয়তের একটি পাঠশালা, এবং রাসূলুল­াহ সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­ামের হিদায়েতি আলোর একটি প্রতীক। এতেকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল­াহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্যান্য সকল বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল­াহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। এতেকাফ ঈমান বৃদ্ধির একটি মুখ্য সুযোগ। সকলের উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ইমানি চেতনাকে প্রাণিত করে তোলা ও উন্নততর পর্যায়ে পৌছেঁ দেয়ার চেষ্টা করা।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বিভিন্নভাবে এতেকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে, ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ.’র কথা উলে­খ করে এরশাদ হয়েছে- এবং আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, এতেকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।” ( সূরা বাকারা : ১২৫)
এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কি আচরণ হবে তা বলতে গিয়ে আল­াহ তা-আলা বলেন, ‘আর তোমরা মসজিদে এতেকাফ কালে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করো না।” ( সূরা বাকারা : ১৮৭)
ইবরাহিম আ. তাঁর পিতা এবং জাতিকে লক্ষ্য করে মূর্তির ভর্ৎসনা করতে গিয়ে যা বলেছিলেন, আল­াহ তাআলা তা উলে­খ করে বলেন,‘যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর স¤প্রদায়কে বললেন-‘এই মূর্তিগুলো কি, যাদের পূজারি (এতেকাফকারী) হয়ে তোমরা বসে আছ”? (সূরা আম্বিয়া : ৫২)
প্রিয়নবি সা.’র অসংখ্য হাদিস এতেকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে ফজিলত সম্পর্কিত কিছু হাদিস নিচে উলে­খ করা হল। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল­াহ সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করেছেন, ইন্তেকাল পর্যন্ত। এরপর তাঁর স্ত্রীগণ এতেকাফ করেছেন।(বুখারি-মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে এসেছে রাসুল সা. বলেন, ‘আমি (প্রথমে) এ রাতের সন্ধানে প্রথম দশে এতেকাফ পালন করি। অত:পর এতেকাফ পালন করি মাঝের দশে। পরবর্তীতে ওহির মাধ্যমে আমাকে জানানো হয় যে, এ রাত শেষ দশে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে (এ দশে) এতেকাফ পালনে আগ্রহী, সে যেন তা পালন করে। লোকেরা তার সাথে এতেকাফ পালন করল। রাসূল সা. বলেন আমাকে তা এক বেজোড় রাতে দেখানো হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, আমি সে ভোরে কাদা ও মাটিতে সেজদা দিচ্ছি। অত:পর রাসূল একুশের রাতের ভোর যাপন করলেন, ফজর পর্যন্ত তিনি কিয়ামুল লাইল রাত্রি জাগরণ করেছিলেন। আকাশ ছেপে বৃষ্টি নেমে এল, এবং মসজিদে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। ফজরের সালাত শেষে যখন তিনি বের হলেন, তখন তার কপাল ও নাকের পাশে ছিল পানি ও কাদা। সেটি ছিল একুশের রাত।
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, ‘রাসূল সা. প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি বিশ দিন এতেকাফে কাটান।
এতেকাফের উপকারিতা: ১.এতেকাফকারী এক নামাজের পর আর এক নামাজের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, আর এ অপেক্ষার অনেক ফজিলত রয়েছে। আবু হুরাইরা রাদি-আল­াহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিয়ে করিম সা.‘নিশ্চয় ফেরেশতারা তোমাদের একজনের জন্য দোয়া করতে থাকেন যতক্ষণ সে কথা না বলে, নামাজের স্থানে অবস্থান করে। তারা বলতে থাকে আল­াহ তাকে ক্ষমা করে দিন, আল­াহ তার প্রতি দয়া করুন, যতক্ষণ তোমাদের কেউ নামাজের স্থানে থাকবে, ও নামাজ তাকে আটকিয়ে রাখবে, তার পরিবারের নিকট যেতে নামাজ ছাঙা আর কিছু বিরত রাখবে না, ফেরেশতারা তার জন্য এভাবে দোয়া করতে থাকবে।
২.এতেকাফকারী কদরের রাতের তালাশে থাকে, যে রাত অনির্দিষ্টভাবে রমজানের যে কোন রাত হতে পারে। এই রহস্যের কারণে আল­াহ তা-আলা সেটিকে বান্দাদের থেকে গোপন রেখেছেন, যেন তারা মাস জুড়ে তাকে তালাশ করতে থাকে।
৩.এতেকাফের ফলে আল­াহ তা’আলার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হয়,এবং আল­াহ তা’আলার জন্য মস্তক অবনত করার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠে। কেননা আল­াহ তা’আলা বলেন: র এ ইবাদতের বিবিধ প্রতিফলন ঘটে এতেকাফ অবস্থায়। কেননা এতেকাফ অবস্থায় একজন মানুষ নিজেকে পুরোপুরি আল­াহর ইবাদতের সীমানায় বেঁধে নেয় এবং আল­াহর সন্তুষ্টির কামনায় ব্যকুল হয়ে পড়ে। আল­াহ তা-আলাও তাঁর বান্দাদেরকে নিরাশ করেন না, বরং তিনি বান্দাদেরকে নিরাশ হতে নিষেধ করে দিয়ে বলেছেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ তোমরা আল­াহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ও না। নিশ্চয় আল­াহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা জুুমার : ৫৩)
৪.মসজিদে এতেকাফের মাধ্যমে একমাত্র আল­াহ তা’আলার উদ্দেশে নিজেকে আবদ্ধ করে নেওয়ার কারণে মুসলমানের অন্তরের কঠোরতা দূরীভূত হয়, কেননা কঠোরতা সৃষ্টি হয় দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও পার্থিবতায় নিজেকে আরোপিত করে রাখার কারণে। মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার কারণে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় ছেদ পড়ে এবং আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়।
৫.এতেকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। ৫.বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ৬.ঐকান্তিকভাবে তাওবা করার সুযোগ লাভ হয়। ৭.তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়া যায়। ৮.সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়।
ইসলামি শরিয়াতে এতেকাফের অবস্থান: এতেকাফ করা সুন্নাত। এতেকাফের সবচেয়ে উপযোগী সময় রমজানের শেষ দশক, এতেকাফ কুরআন, হাদিস ও এজমা দ্বারা প্রমাণিত। ইমাম আহমদ রহ. বলেন: কোন মুসলমান এতেকাফকে সুন্নাত বলে স্বীকার করেনি এমনটি আমার জানা নেই।
এতেকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সাথে জুড়ে যায়, মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠে। তাক্বওয়াভিত্তিক জীবনযাপনের তালিম পাওয়া যায় এতেকাফের মাধ্যমে। এতেকাফকারীর উদ্দেশ্য হওয়া চাই আল­াহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা, আল­াহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া ও আল­াহ কেন্দ্রিক ব্যতিব্যস্ততা যখন অন্তর সংশোধিত ও ঈমানি দৃচতা অর্জনের পথ, কেয়ামতের দিন তার মুক্তিও বরং এ পথেই, তাহলে এতেকাফ হল এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃষ্টি-জীব থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব প্রভুর সান্নিধ্যে চলে আসে। বান্দার কাজ হল তাঁকে স্মরণ করা, তাঁকে ভালোবাসা ও তাঁর ইবাদত করা। সর্বদা তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। এতেকাফের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ অর্থে আল­াহর জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া ইত্যাদির নির্বাধ চর্চার মাধ্যমে আল­াহর নৈকট্য লাভের অফুরান সুযোগের আবহে সে নিজেকে পেয়ে যায়। অনুরূপভাবে যেসব ইবাদতের প্রভাব অন্যদের পর্যন্ত পৌঁছায় যেমন সালাম দেয়া, সালামের জবাব দেয়া, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করা, পথ দেখানো, ইলিম শিক্ষা দেয়া, কুরআন পড়ানো ইত্যাদিও করতে পারবে। কিন্তু শর্ত হল এগুলো যেন এত বেশি না হয় যে এতেকাফের মূল উদ্দেশই ছুটে যায়।
এতেকাফের মাধ্যমে শবে কদর খোঁজ করা প্রিয়নবি সা.’র মূল উদ্দেশ্য ছিল, আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত হাদিস সে কথারই প্রমাণ বহন করে, তিনি বলেন, নবিয়ে করিম ইরশাদ করেছেন,‘আমি প্রথম দশকে এতেকাফ করেছি এই (কদর) রজনী খোঁজ করার উদ্দেশ্যে, অতঃপর এতেকাফ করেছি মাঝের দশকে, অত:পর মাঝ-দশক পেরিয়ে এলাম , তারপর আমাকে বলা হল, (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ এতেকাফ করতে চায় সে যেন এতেকাফ করে, অত:পর লোকেরা তাঁর সাথে এতেকাফ করল। (মুসলিম শরিফ:হাদিস নং ১১৬৭)
এতেকাফকারীর জন্য মুস্তাহাব হল তার এতেকাফের স্থানে কোন কিছু দ্বারা পর্দা করে নেয়া। কেননা রাসূল সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­াম তুর্কি গম্বুজের ভিতরে এতেকাফ করেছেন যার দরজায় ছিল চাটাই। এতেকাফকারী তার প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র সঙ্গে নেবেযাতে নিজের প্রয়োজনে তাকে বার বার মসজিদের বাইরে যেতে না হয়; আবু সাঈদ খুদরি রা.’র হাদিসে এসেছে , তিনি বলেন-আমরা নবিয়ে আকরাম সা.’র সাথে রমজানের মাঝের দশকে এতেকাফ করলাম, যখন বিশ তারিখ সকাল হল আমরা আমাদের বিছানা-পত্র সরিয়ে নিলাম, তখন রাসুল সা. এসে বললেন, যে এতেকাফ করেছে সে তার এতেকাফের স্থানে ফিরে যাবে । (বুখারি : ২০৪০)
এতেকাফকারীর করণীয়-বর্জণীয়: এতেকাফকারীর জন্য মসজিদে পানাহার ও ঘুমানোর অনুমতি আছে। এ ব্যাপারে সকল ইমামদের ঐক্যমত রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত; কেননা আল­াহর প্রতি একাগ্রচিত্ত এবং একনিষ্ঠভাবে মনোনিবেশের জন্য কম খাওয়া কম ঘুমানো সহায়ক বলে বিবেচিত। গোসল করা, চুল আঁচঙানো, তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার, ভাল পোশাক পরা, এ সবের অনুমতি আছে।
আয়েশা রা.’র হাদিসে এসেছে-‘তিনি মাসিক অবস্থায় নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের মাথার কেশ বিন্যাস করে দিতেন, যখন রসুল মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় থাকতেন, আয়েশা রা. তার কক্ষে থাকাবস্থায় প্রিয়নবি সা. মাথার নাগাল পেতেন। (বুখারি : ২০৪৬)
*ওজর ছাড়া এতেকাফকারী এমন কোন কাজ করবে না যা এতেকাফকে ভঙ্গ করে দেয়, আল­াহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কাজসমুহকে নষ্ট করো না।’
*ঐ সকল কাজ যা এতেকাফের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে, যেমন বেশি কথা বলা, বেশি মেলামেশা করা, অধিক ঘুমানো, ইবাদতের সময়কে কাজে না লাগানো ইত্যাদি।
*এতেকাফকারী মসজিদে অবস্থানকালে ক্রয়-বিক্রয় করবে না, কেননা নবী সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়াসাল­াম মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। (মুসনাদে আহমদ : ৬৯৯১)
এমনিভাবে যা ক্রয় বিক্রয়ের কাজ বলে বিবেচিত যেমন বিভিন্ন ধরনের চুক্তিপত্র, ভাড়া, মুদারাবা, মুশারাকা, বন্দক রাখা ইত্যাদি। কিন্তু যদি মসজিদের বাহিরে এমন ক্রয়-বিক্রয় হয় যা ছাড়া এতেকাফকারীর সংসার চলে না তবে তা বৈধ বলে বিবেচিত হবে।
*মসজিদে বায়ু ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আনাস রা.’র হাদিসে এসেছে, যখন বেদুইন লোকটি মসজিদে প্রস্রাব করেছিল তখন রাসূল সা. বলেছিলেন:অর্থাৎ: মসজিদ প্রস্রাব, ময়লা-আবর্জনার ফেলার নয়, বরং মসজিদ অবশ্যই আল­াহর জিকির এবং নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য। (মুসলিম : ২৮৫)
মহান আল­াহ তাআলা আমাদের সবার জন্য মাহে রমজানে আত্মিক শুদ্ধির পথ যেনো উন্মুক্ত করে দেন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।

Share





Related News

Comments are Closed