Main Menu

বর্ষবরণ, আমাদের প্রত্যাশা

স্বপন তালুকদার: আগামীকাল পহেলা বৈশাখ। বাংলা বর্ষবরণ। মনটা বিশেষ ভালো নেই। অতিবৃষ্টি ও অকাল পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের চারটি জেলার বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের অবস্থা খুবই সূচনীয়। বোরো ফসলই যাঁদের একমাত্র ভারসা। সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ জনগণের বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে এসেছে এবারের বাংলা নববর্ষ। বারবার ভেসে উঠছে এলাকার কৃষকদের সকরুণ মুখের চিত্র। তারপরও বাংলার বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলা নববর্ষ উৎসব। যদিও নববর্ষের সাথে বাংলার কৃষক নানাভাবে নিবিড় সম্পর্কে সম্পর্কিত। যা সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা নববর্ষের উদ্যাপন শুরু। যা বাঙালির সমস্ত ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে তাই কিছু লিখতে বসা। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান। কৃষক বাংলার প্রাণ। এই কৃষকরাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত। যাঁরা কিনা সারাদেশে খাদ্যের যোগান দিয়ে থাকেন। বৈশাখের সঙ্গে বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড় তেমনি গ্রামীন অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। কালের পরিক্রমায় বর্ষবরণে এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের হালখাতার উৎসব এতটা আকর্ষনীয় মাত্রায় দেখা যায় না। পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ বাঙালির বিজয় পতাকা আকাশে তুলে ধরে। এই সংস্কৃতি বিজয়ের ফল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের, সকল বাঙালির এক সার্বজনীন অসা¤প্রদায়িক উৎসব। আমরা বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করি। বাংলা ভাষা বাংলাদেশ নিয়েও আমাদের গর্বের শেষ নেই। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে অনেক উন্নতি হয়েছে। মানুষের মাথা পিছু আয় ১৪ শ মার্কিন ডলারের উপরে। যদিও এই আয় কাগজে হিসেব। গুটি কয়েক অতি সম্পদশালীর আয়ের এভারেজ মাত্র। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরও আয় বেড়েছে সত্য, তবে তা বৈষম্য বৃদ্ধি আগের তুলনায় অনেক বেশি করেছে। যা সামাজিক শাস্তি স্বস্তি বিঘ্নিত করছে।ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। জিডিপি সাড়ে সাত শতাংশ হলেও মূল্যবোধ হারিয়েছে সমাজ সংসার রাষ্ট্র কয়েক গুণ। প্রায় প্রতিদিন খুন হত্যা ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন নারী নির্যাতন চলছে। তরুণরা জড়িয়ে পরেছে জঙ্গিবাদে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা রূপ নিচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রতিহিংসায়। রাকিব, রাজীব, খাদিজা, তনুদের ঘটনা তার জলন্ত উদাহরণ। মানুষ হারাচ্ছে তাঁদের আদর্শ ও মূল্যবোধ। আর বেশি আদর্শ হারাচ্ছে রাজনীতি। আগামী কাল পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। নববর্ষ মানে নতুনকে বরণ, নতুন আনন্দ। এই যে আনন্দ,এই যে উৎসব উল­াস-আনন্দ শুধু একদিনের জন্য নয়। সারা বছর জুড়ে চাই এর প্রভাব প্রতিফলন সকলের মাঝে। নববর্ষে র এই দিনে আমরা সবাই চাই ভালো কিছু পড়তে, ভালো খেতে। একদিন ইলিশের ভাজার সাথে পান্তা খেয়ে নতুন বাঙালিপনার মাঝেই কি আমাদের বর্ষবরণ সীমাবদ্ধ? উন্নয়ন কী শুধু দেশের একটা শ্রেণির উন্নতিতেই সীমাবদ্ধ থাকার নাম? একজন মানুষ দেখতে সুন্দর, চোখ, নাক, কান, মাথা শরীরের সব অঙ্গ ঠিক আছে, কিন্তু তার একটা পা অচল। তাঁকে কী আমরা সুস্থ্য বলতে পারি?আমাদের বাংলাদেশে আমরা কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি, মুজুর, নানা পেশাজীবী মানুষের বাস।কোন একটা গোষ্ঠীর বা পেশার উন্নয়ন বা জাগরণ বা অংশ গ্রহনে যেমন কোন উৎসব বা অনুষ্ঠান পূরণতা পায় না, তেমনই রাষ্ট্র বা সমাজে একটা বিশেষ অংশের উন্নয়ন বা গোষ্ঠির গুটি কয়েক উন্নয়ন বা একটা বা দুইটি সেক্টরের উন্নয়নই সব নয়। শিল্পে উন্নয়ন হয়েছে, কৃষিতেও সম উন্নতি হওয়া চাই। চাই কৃষকের জীবনযাত্রার মানেরর উন্নয়ন, চাই জীবনের সম নিরাপত্তা ও সম্মান। চাই তাঁতিদেরও উৎসব আনন্দে জাগরণে সমান অংশ গ্রহণ। তেমনি চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠার নিশ্চয়তা, সুস্থ স্বাভাবিক জীবন। সেই উন্নয়নকে তখনই সার্বিক এবং সার্বজনীন বলা সঠিক হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সমান অংশ গ্রহন, সবার স্বাভাবিক চলা বলা। দেশের কৃষক, তাঁতি, মুজুরের যে উন্নয়নে বা উৎসবে স্বত:স্ফূর্ত অংশ গ্রহন নেই, সে উন্নয়ন বা উৎসব পূর্নতা পায় না।
পহেলা বৈশাখে সবাই আনন্দ করি, কেন করি? একদিন সবাই মিলে আনন্দ করি এটাই সব নয়। একদিন ভালো কিছু পড়া বা ইলিশের ভাজি দিয়ে পান্তা খাওয়া বর্ষবরণের তৎপর্য নয়।ইলিশ-পান্তা তো আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়ই। এই ইলিশ প্রজনন মৌসুমে ইলিশের সাথে পান্তা খেয়ে ইলিশ নিধনের উৎসবে পরিনত হয়েছে।
যাক সে কথা, নববর্ষের তাৎপর্যের কথা। নতুন বছরের প্রথম দিনে সবার যেমন ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হোক চাই, তেমনি অন্যকে ভালো কিছু দিতে পারার মানসিকতাও তৈরি হোক তাও তো হওয়ার কথা। নতুন বছর আসে আবার চলেও যায়। জাতীয় জীবন থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে পুরাতন জীর্ন জরাকে মুক্ত করাই হলো বর্ষবরণের তাৎপর্য। নিজে ভালো থাকা বা ভালোবাসা পাওয়ার পাশাপাশি দেওয়ার বিনিময়ের অভ্যাস গড়া জরুরি। নতুন বছর আসে, চাই জীবনের সমাজের রাষ্ট্রেরর নতুনতর পরিবর্তন। নতুন বছর আমাদের পরিবর্তন এনে দিতে পারে না। বর্ষবরণ শেষ আমাদের নতুনতর চলাও শেষ। নতুন একটা জীবনের জন্য নিজের কি দায় এবং কি কর্তব্য তাই আসল। আমরা চাই অনেক কিছু, কিন্তু পাওয়া হয় না। কেন হয় না, সে হিসাব করি না।অন্যের। কাছে প্রত্যাশা করি, নিজের ভুল স্বীকার করিনা, অন্যের দিকে ফিরে থাকাই না। আত্মসমালোচনা এবং আত্মসংযমের শক্তি আমাদের নেই বা কম। মোট কথা, আমাদের পরিবর্তনের চাওয়াতেই সমস্যা। আমরা প্রতি বর্ষবরণের দিনে যত ভালো কিছু ভাবনায় নিগ্ন থাকি তা পরে ভুলে যাই কেন? সারা বছর জুড়ে কি বর্ষবরণের দিনের প্রতিফলন দেখতে পাই। আমরা যদি বিগত বছর গুলোর দিকে থাকাই দেখতে পাই, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, খুন ধর্ষন। অথচ এই আমরাই নতুন বছরের কাছে বর্ষবরণের দিনে কত কিছু আশা করি! আমাদের মানসিকতায় এবং আমাদের ভুল গুলোতে যদি আমরা নিজেরা পরিবর্তন আনতে পারি, নতুন বছরের কি ক্ষমতা আছে আমাদের শান্তি স্বস্তি আনয়নের। তবে মানুষ চাইলে সব পারে।আমরা যদি ক্রিকেটে পরাশক্তিকে পরাজিত করে এশিয়া কাপে রানারআপ হতে পারি, আমরা যদি নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মান করতে পারি, তবে কেন পারব না সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, শিশু ও নারী নির্যাতন মুক্ত এবং ক্ষুধা দারিদ্রমুক্ত শান্তি সমৃদ্ধির সোনার বাংলা গড়তে। আমরা আশা করি জনগণ বান্ধব সরকার হাওর বাসীর এই দুর্দিন মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।সবশেষে বলব, বর্ষবরণ নিয়ে আনন্দ করি, উৎসবে মাতি তারপর যেন ভুলে না যাই এই দিনের স্বপ্ন পুরণের প্রতিজ্ঞার কথা। ইলিশ-পান্তায় উদ্যাপনে যেন ভুলে না যাই। শুধু ভাবনায় নয়, এই নতুন দিনের প্রত্যয় নিয়ে আজকের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে যেন চলি সারা বছর।সকলকে ভালো রাখব, নিজে ভালো থাকব এ প্রতিজ্ঞায় সবাইকে নববর্ষের অগ্রিম শুভেচ্ছা ও সাদর সম্ভাষণ।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিষ্ট।

 

Share





Related News

Comments are Closed