Main Menu

মূল্যবোধের অবক্ষয়: সমাজে অস্থিরতার লক্ষণ

এ এইচ এম ফিরোজ আলী: সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, আইন এসব কোনটাই মানব হত্যা সমর্থন করে না। তারপরও প্রতিদিন খুন-খারাবি, নারী-শিশু অপহরণ, হত্যা, নির্যাতন সহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ ঘটছে। প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ঘটনা প্রকাশ ও প্রচারিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতন এখন সমাজের নিত্যসঙ্গী। একটি ঘটনার চেয়ে অপর ঘটনাটি হয় বেশি মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক।
পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা এমনিতেই অবহেলিত। তারপরও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে মেয়েরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট গণমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু সমাজের কতিপয় বখাটেদের আচরণে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার অগ্রযাত্রা শুধু বাধাগ্রস্থ হচ্ছে না, এ সমাজ ক্ষত-বিক্ষতও হচ্ছে। সমাজে কিছু নোংরা, নষ্ট বখাটেপনার চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসিদের হাতে সমাজ কলংকিত হচ্ছে। এ সভ্য সমাজে স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালবাসা শ্রদ্ধা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা নিষ্ঠুরতার কবলে পড়েছি। রিশা-নিতু-মিতু, তনু-সলতানা সহ অগনিত মানব সন্তান আধুনিক সভ্য সমাজের অসভ্যদের হাতে খুন হচ্ছে। এসব শিশু হত্যাকান্ড সমাজ ও দেশের সবকিছু ধূলোয় মিশিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ‘দৈনিক ইত্তোফাক পত্রিকার প্রথম পৃষ্টায় দুই কলামে, “মাদারীপুরে বখাটে কুপিয়ে হত্যা করলো স্কুল ছাত্রীকে” শিরোনামে, একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদে স্কুল ড্রেস পরনে মায়াবী মুখের চেহারায় ঘুমন্ত একটি মেয়ের ছবিও ছিল। মেয়েটির বয়স হবে ১৪/১৫ বছর। তার নাম নিতু মন্ডল। তার পিতার নাম নির্মল মন্ডল এবং মাতার নাম নিশা মন্ডল। নিতুর মায়াবী মুখের স্নিগ্ধ হাঁসিমাখা পত্রিকায় ছাপানো ছবিটি প্রতিটি হৃদয়বান মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে। দেশের হাজার হাজার কচি কোমল সুন্দরী মেয়ের মতো এ মেয়েটিকে খুন করলো বিকৃত মানসিক কুরুচিপূর্ণ এক বখাটে। তার নাম মিলন মন্ডল। সে নিতুর প্রাইভেট শিক্ষকও বটে। বখাটে মিলন এ অবুঝ মেয়েটির কাছে প্রেম নিবেদন করেছিল। নিতু প্রেমের আবদার প্রত্যাখান করায় মেয়েটিকে জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করে মিলন। মেয়েটির জীবন-যৌবন বা প্রেম সম্পর্কে বুঝার মতো বয়স হয়তো এখনো হয়নি। সে মানুষের মতো মানুষ হয়ে মা-বাবার মুখে হাঁসি ফুটাতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটির সব আশা-আকাঙ্খা ধূলোয় মিশিয়ে গেছে বখাটের একখানা ছুরির (চাকু) আঘাতে। ঘাতক শিক্ষকের ছুরিকাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয় নিতুর দেহ। মেয়েটিকে হারিয়ে এলাকাবাসী স্তব্দ। নিতুর মা-বাবা-স্বজনদের আর্তনাদে সেখানকার আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। তাদের শান্তনা দেয়ার কেউ নেই। মাদারীপুরের কালকিনী উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের আলিসারকান্দি গ্রামের মেয়ে ও নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল নিতু। একই গ্রামের বীরেন মন্ডলের ছেলে মিলন মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে উত্যক্ত করে আসছিল নিতুকে। ১৮ সেপ্টেম্বর ঘটনার দিন নিতু স্কুলে যাওয়ার পথে মিলন তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর পূর্বক রাস্তার পাশে একটি বাঁশ বাগানে নিয়ে ধর্ষনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু নিতু তার সতীত্ব রক্ষায় বাঁধা দিলে খুনের নেশায় মেতে উঠে ঘাতক মিলন। মেয়েটিকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে মিলন। নিতুর আর্তচিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গেলে ঘাতক মিলন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু যেতে পারেনি। সাহসী জনতা মিলনকে আটক করে গনধোলাই দিয়ে থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। নিতুকে হাসপাতালে নেয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। ঘাতক মিলন মন্ডল কালকিনী সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের মার্কেটিং বিষয়ে বিএ (অনার্স) ৩য় বর্ষের ছাত্র। নিতুর পিতা নির্মল মন্ডল মিলনকে আসামী করে মামলা দায়ের করলে মিলন আদালতে তার ছাত্রী নিতুকে হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারা মতে জবানবন্দী দিয়েছে। নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থী ঘাতক মিলনের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। মিলনের ছাত্রী নিতু প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় গলায় ও পেটে ছুরি মেরে হত্যা করার ঘটনা চরম বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। যৌনক্রিয়া সম্পন্ন করতে ছাত্রীকে জঙ্গলে হত্যা করা একমাত্র ইতর প্রাণীর পক্ষেই সম্ভব। বলা যায় মিলন মানুষ নামের এক পাগলা কুকুর।
picগত ২৪ আগষ্ট বুধবার কাকরাইল ফুটওভার ব্রিজের ওপর দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে আহত হয় সুরাইয়া আক্তার রিশা নামের আরেকটি মেয়ে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরনের কারণে ঘটনার পাঁচদিন পর রিশার মৃত্যু হয়। ১৩/১৪ বছরের বয়সী রিশা কয়েক মাস পূর্বে মাকে নিয়ে স্কুলের ড্রেস বানাতে রাজধানী ঢাকার ইষ্টার্ন মলি­কা শপিং শপের বৈশাখী নামক একটি টেইলার্সে গিয়েছিল। সেখানে কু-নজর পড়ে ওবায়দুল নামের আরেক বখাটের। ওবায়দুল উক্ত টেইলারিংয়ের কাপড় কাটার মাস্টার। দোকানের রিসিটে রিশার বাসার ঠিকানা ও ফোন নাম্বার থাকায় ভদ্রবেশী এ বখাটে প্রায়ই ফোন দিত রিশাকে। মেধাবী মেয়ে রিশা বিরক্ত হয়ে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেয়। তাতে বখাটে ওবায়দুল আরও বেশী ক্ষিপ্ত হয়। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে উত্যক্ত করতো রিশাকে। বখাটে মিলনের মতো ওবায়দুলও কচি মেয়ে রিশার নিকট প্রেম নিবেদন করেছিল। কিন্তু ১৩/১৪ বছরের মেয়ে রিশার মাথায় প্রেমের ধারণাটি এখনও জন্মায়নি। বলতে গেলে প্রেম-টেম বোঝার মতো তার বয়স পুরোপুরি হয়নি। কিন্তু উন্মাদ ওবায়দুল ছুরিকাঘাত করে মেয়েটির জীবন প্রদীপ নিবিয়ে দেয়। চেষ্টা করলে হয়তো মেয়েটিকে বাঁচানো সম্ভব হতো। কিন্তু ভাবতেও অবাক লাগে আহত রিশাকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য স্কুলের গাড়ীটি দিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষার নিকট কাকুতি-মিনতি করলেও পাষান্ড অধ্যক্ষা গাড়ীটি দেননি। অনেক বিলম্বে রিশাকে রিক্সাযোগে হাসপাতালে পাঠানো হলে রিশার মৃত্যু হয়। ৩১ আগষ্ট নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় বাজারের মাংস ব্যবসায়ী দুলাল হোসেন ও ইজিবাইক চালক ইসমাইল হোসেন অত্যন্ত কৌশলে ওবায়দুলকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
চলতি বছরের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের আলিপুর এলাকার একটি কালভার্টের পাশের জঙ্গল থেকে সোহাগী জাহান তনু নামের আরেক তরুনীর লাশ উদ্ধার করা হয়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী নাট্যকর্মী তনুর মৃত্যুর ঘটনা দেশবাসী ভুলতে পারেননি। তাকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সারাদেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও প্রকৃত খুনি এখনোও ধরা পড়েনি। ময়নাতদন্ত নিয়ে নাটকের ঘটনা দেশবাসী জানেন। শেষ পর্যন্ত তনুর বিচারপ্রার্থী মা-বাবার ভাগ্যে কি ঘটবে তা জানিনা।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু সন্ত্রাসীদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন। দুই সন্তানের এ জননীকে গত ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরীর নিজাম রোডে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সরকার ও পুলিশ প্রশাসন বিব্রত অবস্থায় রয়েছেন। দেশে-বিদেশে ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও তদন্তের গতি থমকে গেছে। গণমাধ্যমে এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ব্যাপক আকার ধারন করছে। এ হত্যাকান্ডের সন্দেহের তীর মিতুর স্বামী বাবুল আক্তার ও এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার দিকে। ফেইসবুকে এমনও হাজার ইঙ্গিত বহন করছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মিতু হত্যার রহস্য আটকে পড়ে আছে তদন্তকারী সংস্থার কাছে। এসব চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয়। নামিদামী জাতীয় প্রতিটি দৈনিকের সম্পাদকীয় ও উপ সম্পাদকীয়তে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রশাদ পূর্ব ইউনিয়নের এরালীগুল গ্রামের তেরা মিয়ার মেয়ে সুলতানা বেগমকে একদল পাশন্ড গনধর্ষনের পর হত্যা করে। লাশ ২৫০ ফুট উপরে পাহাড়ে মাটিচাপা দিয়ে গুম করে। এ লোমহর্ষক ঘটনায় ঘাতক আবুল আহমদ ও ছাদেক গত ৩০ সেপ্টেম্বর সুলতানা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবান বন্দী দিয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী স্বাক্ষী নিহত সুলতানার সহপার্টি ফারহানা বেগমের জবানবন্দীও আদালত গ্রহন করেছেন।
এভাবে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে এদেশের নিরীহ মেধাবী ভবিষ্যৎ দেশ ও জাতির কর্ণধার শিশু কিশোরদের হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষনের মামলা।
গত ১৩ আগষ্ট রাতে রাজধানী ঢাকা মিরপুরের সাইক ইনস্টিটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজির স্থাপত্য বিদ্যার শিক্ষার্থী আফসানার লাশ স্থানীয় আল-হেলাল হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায় দুই যুবক। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আফসানা ফেরদৌসির মৃত্যু নিয়ে রহস্যের জাল বুনা হয়েছে।
কয়েক মাস পূর্বে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম রাস্তায় এক গারো তরুনী, বরিশালে চলন্ত বাসে দুই বোন, রাজবাড়ীতে এক মা ও মেয়ে, মৌলভীবাজারের বড়লেখার চতুর্থ শ্রেণির এক শিশু ছাত্রী, বরিশালের গৌরনদী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির এক ছাত্রী, গাজীপুরে এক কিশোরী, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা এক কিশোরী, টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসে এক গার্মেন্টস কর্মী, বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় এক প্রতিবন্ধী তরুনী, ঝিনাইদহে শৈলকূপায় এক গৃহবধূ, ফেনীর সোনাগাজীতে আট বছরের এক শিশু কন্যা, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় এক তরুনী, টাঙ্গাইলের দেলদূয়া উপজেলার এলাসিন নছিমুননেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষনের স্বীকার হয়। ২০১৫ সালে কেবলমাত্র ৮৫ জন আদিবাসী নারী ও শিশু কন্যা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে। ঢাকার আশুলিয়ায় রুমা নামের এক কলেজ ছাত্রিকে অপহরন ও ধর্ষন, পটুয়াখালির গলাচিপায় সামিরা নামে এক গৃহবধুকে হাত-পা বেধে চুলকেটে নির্যাতন করে সমাজপতিরা। জামালপুরের মাধারগঞ্জে আয়শা নামক এক বিধবাকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। সাভারে হাফিজা আক্তার রানী নামের এক মহিলাকে খুন করে তার স্বামী। বরগুনার আমতলী উপজেলার চরগাদিয়ার গ্রামের ছালমা বেগমকে যৌতুকের জন্য অমানসিক নির্যাতন করে তার স্বামী। পাবনার সাথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ী গ্রামের আলমগীর তার স্ত্রী তাজবিনা খাতুনকে পুড়িয়ে হত্যা করে। চট্টগ্রাম নগরীর গোসাইল ভাঙ্গা এলাকার ছেলে সুমিত চৌধুরী, মা কুমকুমকে গলা কেটে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা চেষ্টা চালায়। ফিরোজপুরের জিয়া নগর উপজেলায় ছাত্রী উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় আব্দুল খালিক নামক এক শিক্ষকে মাথা ফাটিয়ে দেয় বখাটে। চাদপুরের হাইমচর উপজেলায় নয় বছরের শিশু জান্নাতুল ফেরদৌসি নামের এক কাজের শিশুকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় রূপসী খাতুন নামক এক শিশু কন্যাকে হত্যা করে মা পালিয়ে যায়। গোপালগঞ্জের গোপালপুর গ্রামের এক মেয়ের পায়ের রগ কেটে দেয় নাহীদ হাওলাদার নামের এক বখাটে। গাইবান্ধার ফলিয়া গ্রামের আতিয়া বেগম নামের এক গৃহবধুকে গাছে বেধে নির্যাতন করা হয়। চাপাই নবাগঞ্জের পাকা ইউনিয়নের কাঞ্চনপাড়া গ্রামের লতিফা ও আখি নামক দুইজনকে ভারতে প্রচার করতে না পেরে হত্যা করা হয়। সিলেটে গোয়াইনঘাটের তুয়াকুল ইউনিয়নের লক্ষীনগর গ্রামের নুরুল ইসলাম ও তার ছোট ভাই ৮ বছরের শিশু মতিউর রহমান ও ১০ বছরের শিশু আজিজুর রহমানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবে প্রতিদিন মানব হত্যার কিংবা সামাজিক অপরাধের তালিকা লম্বা হচ্ছে।
এক বা দুটি ঘটনা হলে তা উড়িয়ে দেয়া যেতো। প্রতি মূহুর্ত, প্রতি ঘন্টায় এমন দুঃসংবাদ দেখতে ও শুনতে হয় আমাদের। সামাজিক অপরাধের গতি প্রকৃতি দেখে মনে হয়, সমাজ যেন অস্থিরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অসহনীয় এমন এক মনুষত্বহীন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে- পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, মানবতা এবং সভ্যতা। এমন অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সু-শিক্ষা, নীতি-নৈতিকতা, ধৈর্য্য, সহনশীলতা, পরমৎসহিষ্ণুতা, ছেড়ে সবাই বড়লোক, স্মার্ট হওয়ার অবিলাসে ব্যস্ত। বুড়োরা জোয়ান, ছেলে মেয়ে হওয়ার স্বপ্নে অপসংস্কৃতির যাত্রা শুরু করেছে। রাস্তাঘাটে-শহরে বন্দরে, হাটে-ঘাটে-মাঠে-মার্কেটে স্মার্টদের কাপড়চোপড় পরিধানের দিকে একটু লক্ষ্য করলে বুঝবেন কোথায় আছেন? এমন সমাজে ঘরে বাইরে কিছু বলতে ও করতে পারা যায় না। এমনই অবস্থায় কে কাকে মূল্যবোধের পথে নিয়ে আসবেন? আমাদের পারিবারিক বন্ধন তিলেতিলে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। একসময় অভিভাবকরা ছিলেন পরিবারের সবকিছু। শিশুরা, মা-বাবা, ভাই-বোন, ফুফা-ফুফু, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পাড়া-প্রতিবেশি সকলের স্নেহে লালিত পালিত হতেন। একে অপরকে মায়া মমতা শ্রদ্ধা ভালোবাসা দিয়ে আগলিয়ে রাখতেন। এখন শিশুরা ফার্মের মোরগের খাঁচার মতো বন্দী অবস্থায় রয়েছে। কেউ কেউ শিশুদের আত্মীয় স্বজনের ধারে কাছেও যেতে দেন না। বিয়ের পর আধুনিক অধিকাংশ মেয়েরা বলবে- তোমার স্বজন ছেড়ে একা বাসায় নিয়ে চলো, না হয় স্বামী বলবে আমার আত্মীয় স্বজনদের কাছে আর থাকবো না। মা-বাবা, ভাই-বোন ফেলে একাকী বাস করতে পছন্দ অনেকেরই। মন্দ কপালের পিতামাতাদের আশ্রয় হয় বৃদ্ধাশ্রমে। একটি একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে বিশটি পরিবার হচ্ছে। তাতে লাভ কিছুই হয়নি। আমাদের পরিবার থেকেই মানবতার ক্ষয় শুরু হয়েছে। এমন অবস্থা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনে পিতা-মাতারাও সন্তানদের প্রতি কোনো খেয়াল নজর রাখছেন না। তাদের সন্তান কে কোথায় যায়, কার সাথে উঠবস করে, তাদের ভালোমন্দ কিছু দেখার যেন সময় নেই। সন্তানের চেয়ে অর্থপ্রাপ্তি বা কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন বড়। টাকা হলেই সবাই বড়লোক। টাকার পিছনে সমাজ ঘুরছে। এমন ভেবেই অভিভাবকের কথা সন্তান মানেনা। শিক্ষকের কথা শিক্ষার্থীর সহ্য হয়না। আইনের মানুষ আইন মানেনা। ধর্মের নামে সকল ধর্মবিরোধী কাজ করে। দেশের সংস্কৃতিকে নির্বাসনে দিয়ে অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টি করে এমন সংস্কৃতি দেশে চলছে। সবাই নিজে রাজা, সন্তান জন্মদান বড় দায়িত্ব নয়, তাকে সমাজ বা রাষ্ট্রের উপযোগী করে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বড় দায়িত্ব। কারণ বুঝতে হবে, সামাজিক রীতিনীতি যখন ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় তখন মানুষের নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। অভিভাবকের দায়িত্বে যারা আছেন, বালিসে মাথা রেখে একটু ভেবে দেখুন, ত্রিশ লাখ শহীদের দেশ কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

Share





Related News

Comments are Closed