সুনামগঞ্জে কলেজছাত্রী অপহরণ মামলার ৮ আসামীই অধরা
হাবিব সরোয়ার আজাদ, সুনামগঞ্জ থেকে: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার কলেজ পড়ুয়াকে মেয়েকে অপহরণের ঘটনায় উপজেলা ও জেলা জুড়ে চলছে তোলপাড়। শুরু থেকেই তদন্তের নামে থানা পুলিশের কালক্ষেপন ও ভিকটিম উদ্ধারের নামে গড়িমসির ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং সুশীল সমাজ ক্রমশই ফুঁসে উঠছেন।
সরেজমিনে গিয়ে ভিকটিমের পরিবার ও মামলার এজাহার সুত্রে জানা যায়, উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধার বাদাঘাট সরকারি ডিগ্রী কলেজে পড়ুয়া মেয়ে তার বোনের বাড়ি লাকমায় বেড়াতে গেলে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প এলাকা থেকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঈদুল আযহার দিন বাদাঘাট ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রেনু মিয়ার পরিবারের লোকজন অপহরণ করে নিয়ে যায়। ১৫ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা তার মেয়ের অপহরণের ঘটনায় রেনু মিয়া সহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের তদন্তভার দেয়া হয় বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির এসআই একেএম জালাল উদ্দিনকে।
ঐ মুক্তিযোদ্ধার দাবী এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর ইউপি সদস্যের পুত্র হাকিকুল ইসলাম ঘরে সাত স্ত্রী থাকার পরও তার কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে যৌন হয়রানী করলে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট তাকে ৩ মাসের কারাদন্ড প্রদান করেন। ঐ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে প্রভাশালী ইউপি সদস্য তার লোকজন দিয়ে কলেজ পড়য়া মেয়েটিকে অপহরণ করিয়ে ইউপি সদস্য নীজ বাড়ি ঘাগড়া গ্রামে ও অন্যান্য আত্বীয় স্বজনের বাড়িতে ৭দিন জিম্মি করে রেখে ছেলেকে কারামুক্ত করতে নানা কৌশল অবলম্বন করে। পরবর্তীতে বিষয়টি জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড পর্যন্ত গড়ালে জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নির্দেশে থানা পুলিশ কিছুটা নড়েচড়ে বসে।
থানা পুলিশ অপহৃতাকে ১৯ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে ইউপি সদস্যের পরিবারের লোকজনের হেফাজত থেকে উদ্ধার করে। প্রথম দফায় পুলিশ সোমবার রাতে ফাঁড়িতে আর দ্বিতীয় দফায় মঙ্গলবার সকালে থানায় ভিকটিমকে নিয়ে ঐ এসআই বিষয়টি নিষ্পক্তির জন্য তোড়জোড় শুরু করেন।
২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ঘাগড়া গ্রামের মৃত আবদুল মন্নানের ছেলে ইউপি সদস্য রেনু মিয়া, একই গ্রামের ওসমানগণীর ছেলে কামরান মিয়া, রঞ্জু মিয়ার ছেলে কামাল মিয়া, তার সহোদর সোহেল মিয়া, মৃত আসকর আলীর ছেলে দুলাল মিয়া, নুর মোহাম্মদের ছেলে মালু গণী মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে উজ্জল মিয়া, মৃত আবদুল করিমের ছেলে সেলিম সহ ৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা রেকর্ডভুক্ত করা হয়।
এদিকে ২০ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ভিকটিম জবানবন্দি দিতে গেলে রেনু মিয়ার পরিবারের কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ জন লোক আদালতের বাইরে মহড়া দিয়ে ভীতির সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে মামলার বাদী ও ভিকটিম আদালতের শরানাপন্না হলে আদালত থেকে পুলিশী প্রহরায় তাদেরকে গ্রামের বাড়িতে পৌছে দেয়া হয়। শুধু এখানেই শেষ নয় ভিকটিমকে উদ্ধারের পর সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে থানায় নেয়ার সময় প্রভাববিস্তারের জন্য ভিকটিমের সাথে অভিযুক্তদের পরিবারের বেশ ক’জন সদস্যও থানা পর্যন্ত গিয়েছেন। অপহরণ ও উদ্ধারের নামে প্রহসনের ঘটনার সাথে থানার এসআই একেএম জালাল উদ্দিন মোটা অংকের উৎকোচ নিয়ে পরোক্ষ ভাবে মদদ দিচ্ছেন বলে ঐ মুক্তিযোদ্ধা অভিযোগ তুলেছেন।
তবে এসআই একেএম জালাল উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি আইনের বাইরে কিছুই করিনি।
এদিকে মামলা দায়েরের পর থেকেই মামলা তুলে নেয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যদেরকে নানাভাবে আসামী পক্ষের লোকজন হুমকি ধামকি দিয়ে গেলেও পুলিশ বলছে আসামীদের গ্রেফতারে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাদীর দাবী আসামীরা বীরদর্পে টাকা আর লাঠির জোড়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মেয়েটি বর্তমানে ভয়ে কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
অভিযোগে রয়েছে ইউপি সদস্য রেনু মিয়ার মদদে তারই গুণধর পুত্র হাকিকুল (৩৮) একটি সংখ্যালঘু পরিবারের মেয়ে সহ ইতিপূর্বে সাতটি বিয়ে করে। বিয়ের কিছ দিন পরই স্ত্রীদের নানা রকম নির্যাতন করে বাড়ি থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এ ঘটনায় অপমাণে হাকিকুলের বাদাঘাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক কিশোরী কন্যা আত্বহত্যা করে মৃত্যু বরণ করেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার ইউপি সদস্য রেনু মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তার পুত্রের সাত বিয়ের কথা স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে দুই স্ত্রী তার ঘরে আছে, অন্যারা যে যার মত চলে গেছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে অপহরণের সাথে তিনি জড়িত নন বলে দাবী করেন।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার হাজি নুরুল মোমেন বৃহস্পতিবার দুপুরে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান হলেও এখনো তারা সবদিক দিয়েই বঞ্চিত। একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে অপহণের পর ১০দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি। তিনি এ প্রহসন বন্ধ করে অবিলম্বে আসামীদের গ্রেফতার করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশের প্রতি আহবান জানান। অন্যথায় সারা জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুশিয়ারী দেন।
তাহিরপুর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ বৃহস্পতিবার জানান, আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশী চেষ্টা অব্যাহত আছে।
Related News
শান্তিগঞ্জে ৮ বছর ধরে অকেজো কোটি টাকার সোলার প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে বসানো এক কোটি ৪৭ লাখRead More
দিরাইয়ে টিনের চালে ষাঁড়, কৌতূহল উঠলো কিভাবে?
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পথ হারিয়ে একটি ষাঁড় দোকানের টিনের চালে উঠে আটকা পড়ারRead More



Comments are Closed