Main Menu

ঈদুল আজহার ইতহাস ও শিক্ষা

এহসান বিন মুজাহির: আগামিকাল ১৩ সেপ্টেম্বর (দশ জিলহজ) মঙ্গলবার সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হবে। মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় দু’টি উৎসবের অন্যতম একটি উৎসব ঈদুল আজহা। পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট একটি আনন্দ উৎসবের দিন। তারা এ দিনে আনন্দ ও আমোদ প্রমোদে মেতে উঠে। তেমনি মুসলিম উম্মাহর জন্য ও রয়েছে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বড় দুটি আনন্দ উৎসবের দিন। নির্ধারিত এ তারিখে মুসলিম জাতি ঈদ উদযাপন করে। ঈদ শুধু আনন্দই নয়, বরং আমাদের জন্য অন্যতম একটি ইবাদতও। পবিত্র ঈদুল আজহা আল­াহর প্রতি আনুগত্য, আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মহিমায় মহিমান্মিত। হজরত ইবরাহিম (আঃ) এবং তার প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) সেদিন আল­াহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশ পালন ও সন্তুষ্টি বিধানের জন্য আত্মত্যাগের এক অনুপম নজির স্থাপন করেছিলেন। মানব ইতিহাসে চির স্মরণীয় সেই ত্যাগের ঘটনার স্মারক কুরবানির ঈদ। আল­াহ তাআলার প্রতি আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য, কি পরিমাণ ত্যাগ ও নিষ্ঠা দাবী করে তাঁর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আঃ) এর আত্ম নিবেদনের এই অভূতপূর্ব ঘটনার মধ্যে। মহান আল­াহ পাকের নির্দেশে এবং তারই সন্তুষ্টি সাধনের জন্য পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন হজরত ইবরাহিম (আঃ)। হজরত ইসমাইল (আঃ)ও একই উদ্দেশ্যে পিতার ক্ষুরোধার ছুরির নীচে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে নিজের গলা পেতে দিয়েছিলেন। আল­াহ রহমানুর রাহিম পিতা পুত্রের এই আনুগত্য আত্মসমর্পন চিত্ততা, ভক্তি ও আন্তরিক পরিচয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। আল­াহ পাকের ইচ্ছায় রক্ষা পেয়েছিল হযরত ইসমাইল (আঃ) এর জীবন। সেদিন সৃষ্টি হয়েছিল আল­াহ ভক্ত পিতা-পুত্রের আত্মত্যাগের অসাধারন দৃষ্টান্ত। এই ঘটনাকে মানব জাতীর সামনে আদর্শ হিসেবে চির জাগরূক করে রাখার জন্যই আল­াহ পাকের তরফ থেকে সেদিন কোরবানীর বিধান প্রর্বতিত হয়েছিল। সেই থেকে এই বিধান অব্যাহত রয়েছে এখন পর্যন্ত যা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কোরবানির ঈদ আমাদেরকে স্মরণ করে দেয় হজরত ইবরাহিম (আ.) আত্মত্যাগ স্মৃতি ও ইসমাঈল (আ:) এর আনুগত্যের ঐতিহাসিক ঘটনা।
কোরবানি নতুন কোন প্রথা নয়, বরং এটা আদিকাল থেকে চলে আসছে। হযরত আদম (আ:) এর যুগে কুরবানির সুচনা হয়েছিল। আদম (আ:) এর সন্তান হাবিল কাবিলের মধ্যে বিবাহ-শাদী নিয়ে যখন মতানৈক্য দেখা দিল তখন আল­াহ তায়ালা তাদেরকে ইখলাসের সঙ্গে হালাল পশু কুরবানি করার নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন তোমাদের মধ্যে যার কুরবানি আমার নিকট কবুল হবে তার নিকট মেয়ে বিবাহ েেদয়া হবে। হাবিল এবং কাবিল কুরবানির নির্দেশ পেয়ে কুরবানি করল। হাবিলের কুরবানি আল­াহর কাছে কবুল হল, কাবিলের হলোনা। কাবিলের কুরবানি কবুল না হওয়ার কারণে সে ক্ষিপ্ত হয়ে হাবিলকে বলল আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলব। এ প্রসঙ্গে আল­াহ তায়ালা ইরশাদ করেন,‘হে নবী আপনি তাদের নিকট যথাযথভাবে আদম (আ:) এর পুত্রদ্বয়ের কথা আলোচনা করেন, যখন তারা মহান রবের নিকট তাদের কুরবানিকে পেশ করল, তখন একজনের কবুল হল অন্যজনের হলো না। যার কুরবানি কবুল হলো না সে ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যজনকে বলল আমি তোমাকে খুন তথা হত্যা করে ফেলবো। পালনকর্তা একমাত্র মুত্তাকীদের কুরবানি কবুল করেন’। (সূরা মায়িদা:২৭)
আল­াহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে বিভিন্ন রকমের বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন। কখনো বিপদাপদের মাধ্যমে, কখনো ধন-সম্পদের অনিষ্টের মাধ্যমে, আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতা দিয়ে পরীক্ষা, পরীক্ষা থেকে বাদ যাননি নবী-রাসূলগণও। নবী-রাসূলগণকেও আল­াহ তায়ালা বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা করেছেন। বিশেষ করে আমাদের আদি পিতা হযরত ইবরাহিম (আ:) অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় স্রষ্টার আদেশে স্বীয় সন্তানের কুরবানি।
কোরবানির ঐতিহাসিক ঘটনার সুত্রপাত যেভাবে: প্রথমে হযরত ইবরাহিম (আ.) এর কোন সন্তান ছিল না, তাই তিনি আল­াহর কাছে ফরিয়াদ করে বললেন ‘হে আল­াহ! আমাকে আপনি নেককার সন্তান দান করেন। তাঁর এ দুয়া মহান রাব্বুল্ আলামিনের কাছে কবুল হয় এবং তিনি তাঁকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিলেন। ইবরাহিম (আ:) একদিন স্বপ্নে দেখলেন যে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর কলিজার টুকরা পুত্র সন্তানকে আল­াহর রাস্তায় কুরবানি দেয়ার জন্য। কোন কোন রেওয়াত থেকে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন ইবরাহিম আ: কে পরপর তিনদিন দেখানো হয়। এ প্রসঙ্গে তাফসিরের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহিম আ: এর বয়স যখন তের অথবা পুর্ণবয়স্কে পৌঁছেছিল তখন তাকে এ স্বপ্ন দেখানো হয়েছি । (তাফসিরে মাযহারি)
ইবরাহিম আ: স্বপ্নের আধ্যমে এ নির্দেশ পেয়ে চিন্তিত হয়ে গেলেন । মনে মনে ভাবলেন ইসমাঈল কি মেনে নিবে । সে কি আল­াহর রাস্তায় জান বিলাতে রাজি হবে। তিনি তার ছেলের কাছে গেলেন এবং বললেন আমি স্বপ্নের মাধ্যমে তোমাকে কুরবানি করার নির্দেশ পেয়েছি তোমার কি মতামত ? তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, আব্বা আপনি আল­াহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ পেয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেন। ইনশাল­াহ আমাকে আনুগত্য ও ধৈর্যশীলদের অন্তভূক্ত পাবেন। পুত্র ইসমাইল (আ:) এর মুখ থেকে প্রাণভরা কথা শুনে তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাকে কুরবানি করার জন্য ময়দানে নিয়ে গেলেন। ইসমাাঈল (আ.) এর হাত, পা, বেঁধে জমিনে শুইয়ে দিলেন। ধারালো চাকু দ্বারা তাঁর গলাতে পোঁচ দিতে লাগলেন কিন্তু আল­াহর কি অপার মহিমা ছুরি তথা চাকু দ্বারা গলা কাটবে তো দূরের কথা তার গলায় দাগও বসাতে পারেনি। ইবরাহিম (আ:) নতুন আরেকটি ছুরি হাতে নিলেন এবং পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে লাগলেন তখন গায়েবীভাবে একটি আওয়াজ তার কানে পৌঁছলো, হে ইবরাহিম তুমি মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো, তোমার কলিজার টুকরা সন্তানকে আর কষ্ট দিও না ,এবার তাকে ছেড়ে দাও। তোমার কুরবানি হয়ে গেছে। পুত্রের বদলে তুমি একটি তর-তাজা দুম্বা কুরবানি করো। তখন ইবরাহিম আ: একটি দুম্বা কুরবানি করে আল­াহর নির্দেশ পালন করলে । হযরত ইবরাহিম (আ:) ইসমাইল (আ:) কে কুরবানি করতে গিয়ে শয়তান অনেক কুমন্ত্রণা ও প্রতারণা দেয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করছিলো কিন্তু খলিলুল­াহ শয়তানের সব প্ররোচনাকে পাড়ি দিয়ে মহান রবের নির্দেশ পালনে মনযোগী হলেন । ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত তিনি বললেন যখন ইবরাহিম ছুরি চালালেন তখন জিবরাইল আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, না জানি আমি পৌঁছার আগেই জবাই কাজ শেষ হয়ে যায় কিনা তাই তিনি জোরে জোরে আ্ল­াহু আকবারের ধ্বনি বলে আসছিলেন, আর এ তাকবিরের আওয়াজ ইবরাহিম (আ:) এর কানে পৌছলো তিনি উপরের দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন যে, জিবরাইল আ তাকবির ধ্বনি দিয়ে আসতেছেন তখন তিনি বলে উঠলেন ‘লাইলাহা ইল­াল­াহু আল­াহু আকবার আল­াহু আকবার’ আর এই তাকবীর শুনার পর ইসমাঈল (আ:) পরবর্তী লাইন ‘ওয়ালিল­াহিল হামদ’বলে উঠলেন। (তাফসিরে মাযহারি)
পিতা পুত্রের এই মহাআত্মত্যাগ আজও আমাদেরকে প্রেরণা যোগায়। এই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ রাখার জন্য আল­াহ তায়ালা উম্মতে মোহাম্মদির উপর কুরবানিকে ওয়াজিব করেছেন।
লেখক: সাংবাদিক ও আলেম।

Share





Related News

Comments are Closed