কমলগঞ্জে মণিপুরি তাঁতপল্লীতে ঈদের ব্যস্ততা
প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার): পাহাড় আর চা বাগান পরিবেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম পর্যটন উপজেলা কমলগঞ্জ। এ উপজেলায় বসবাসরত আদিবাসীদের মধ্যে অন্যতম মণিপুরী স¤প্রদায়। এ স¤প্রদায়ের ৯৫ শতাংশ মহিলা জড়িত তাঁত শিল্পের সঙ্গে। ঈদকে সামনে রেখে মনিপুরী তাঁত শিল্পীরা সারা বছরের মন্দা ভাব কাটিয়ে এখন শেষ সময়ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের শৈল্পিক ও নান্দনিক ডিজাইন আজ দেশ ছাড়িয়ে ইউরোপ ও আমেরিকাতে স্থান করে নিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রেড ফেয়ারে মণিপুরীরা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
আসন্ন ঈদুল ফিতরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী তাঁতসামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার মণিপুরী অধ্যুষিত প্রায় ৩০টি গ্রামের ঘরে ঘরে চলছে তাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কাজ। কমলগঞ্জের ভানুগাছ বাজার, আদমপুর, মাধবপুর ও গুলেরহাওর এলাকায় মণিপুরী শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, বাঁশের কাজ করা সামগ্রী ও ব্যাগের দোকান খোলা হয়েছে। সব মিলিয়ে ঈদে তাদের তৈরি তাঁতসামগ্রীর ভাল বিক্রি হবে।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে দিন দিন মণিপুরী তাঁতের তৈরি কাপড়ের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা কমলগঞ্জ প্রতিদিন শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন। বেড়াতে আসা পর্যটকরা এখান থেকে মণিপুরি তাঁতের তৈরি বিভিন্ন পোশাক ক্রয় করে থাকেন। বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে মণিপুরী পোশাক হচ্ছে প্রথম পছন্দ। এসব পোশাকের মধ্যে রয়েছে থ্রিপিস, শাড়ি, ফতুয়া, ওড়না, ভ্যানিটি ব্যাগ প্রভৃতি।
মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এখন মহাব্যস্ত মণিপুরি তাঁতশিল্পীরা। উৎসব-পার্বণে ব্যতিক্রমী পোশাকের জোগানদাতা হলেন মণিপুরি তাঁতশিল্পীরা। মণিপুরি চাদরের সুনাম দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে। এছাড়া ব্যতিক্রমী পোশাক হিসেবে ঈদ আর পূজায় মণিপুরি তাঁতশিল্পীদের তৈরি কাপড়ের চাহিদা বাড়ে। জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর, মঙ্গলপুর, রাণীরবাজার, কালারায়বিল, ভানুগাছ, বালিগাঁও, ইসলামপুর, তিলকপুর, ঘোড়ামারা, কোনাগাঁও, ছনগাঁও, তেতইগাঁও, হকতিয়ার খোলা, জালালপুর, কেওয়ালীঘাট, ভানুবিল, বন্দেরগাঁও, কান্দিগাঁও, ছয়চিরী, ভান্ডারীগাঁও, গঙ্গানগর, মকাবিল, গুলেরহাওর, টিলাগাঁও, মাঝেরগাঁও, নয়াপত্তন, হীরামতি গ্রামসহ প্রায় ৩০টি গ্রামে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে মণিপুরী তাঁতীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে উৎপাদিত দ্রব্য বিক্রি করতে দোকানিরা বসেছেন বিভিন্ন আইটেমের সামগ্রী নিয়ে। কমলগঞ্জের মণিপুরীদের তাঁতে উৎপাদিত বিভিন্ন সামগ্রী স্থানীয়ভাবে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্রয় করে থাকেন। এ সব সামগ্রী আবার স্থানীয় গ্রামগুলোর দোকানগুলোতে বিক্রি করা হয়।
কমলগঞ্জ পৌরসভার সামনে ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কে মণিপুরী মার্কেট “চিত্রাঙ্গদা” মণিপুরি কাপড়ের দোকান ছাড়াও অন্য শপিং সেন্টারগুলোতে মণিপুরি পোশাকের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে। এছাড়াও আদমপুর, মাধবপুরসহ মণিপুরি অধ্যুষিত এলাকায় বেশ কিছু মণিপুরি পোশাকের দোকান গড়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের পর্যটক, দর্শনার্থীরা সেখান থেকেও কাপড় ক্রয় করে থাকেন। ঈদ-পূজা আর শীতের নতুন কাপড় তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন তারা।
আলাপকালে মণিপুরী মহিলা তাঁতি শুক্লা সিন্হা, সীমা সিন্হা, কস্তুরি সিন্হা, চিত্রালী সিন্হা জানান, ঈদের পর দুর্গা পূজা আসছে। বাজারে চাহিদা থাকলেও কাঁচামালের অভাবে চাহিদামতো পাইকারি বিক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করতে পারেন না। কাঁচামাল না থাকায় অনেকে তাঁতের কাপড় বোনা বাদ দিয়েছেন বলে জানান তারা। মণিপুরি তাঁতশিল্পী অনামিকা সিনহা বলেন, ঈদ ও পূজা উপলক্ষে অনেক পাইকারই এসে অর্ডার দিচ্ছেন। সিলেটের বাইরে থেকেও অনেক পাইকার এসেছেন। তবে সুতা না পাওয়ার কারণে সব ক্রেতার চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, মনিপুরি তাঁত কাপড়ের কাঁচামাল এখন সিলেটে পাওয়া যায় না। ঢাকা, নরসিংদী কিংবা চট্টগ্রাম থেকে আনতে হয়।
তাঁতের কাপড় ব্যাবসায়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা আনন্দ মোহন সিংহ বলেন, ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী তাঁতের কাপড় দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। কমলগঞ্জসহ সিলেটের বিভিন্ন স্থানে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মণিপুরি তাঁতশিল্প প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কেন্দ্র। বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করেছে এসএমই ঋণ প্রকল্প। এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় সব মণিপুরী পরিবার থেকেই নারীরা তাঁতের কাপড় তৈরি শিখে নিয়েছেন। তার মতে, শুধু প্রশিক্ষন প্রদান ও তাত ঋন দিলেই চলবেনা সর্বাগ্রে প্রয়োজন মণিপুরি কাপড়ের কাঁচামাল সহজলভ্য করা । প্রীতি মণিপুরী হ্যান্ডিক্রাফটসের স্বত্বাধিকারী এন প্রদীপ কুমার সিংহ জানান, এই শিল্পের বিশ্বব্যাপী প্রসার ও তাঁতীদের রক্ষার জন্য সুদের হার কমিয়ে প্রকৃত তাঁতীদের আরও বেশি করে ঋণ দিতে হবে। মণিপুরী তাঁতীদের জন্য আলাদাভাবে ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
আশানুরূপ সুতা না পাওয়ায় কোয়ালিটিফুল কাপড় তৈরি করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, সুতার অপ্রতুলতা ও মূল্য বৃদ্ধির কারণে তাঁতের কাপড় বুননে অনেকে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ঈদ এবং পরে পূজা ও ঈদুল আজহা এই তিন উৎসবকে সামনে রেখে বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখন মণিপুরি তাঁতগুলো খুব ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছে। তাঁতশিল্পীরা জানান, দেশ-বিদেশে বাহারি মণিপুরি পোশাকের প্রচুর চাহিদা থাকা সত্তে¡ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে। তাই সবার আগে কাঁচামাল প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
Related News
পাখির কলকাকলিতে মুখর নাজিরপাড়া, ১৫ বছর ধরে অতিথিদের মিলনমেলা
মো. সফিকুল আলম দোলন, জেলা প্রতিনিধি,পঞ্চগড়: ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পাখিদের কিচিরমিচির। গাছের ডালেRead More
ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন ৮শ বছরের পুরাতন সেতু
শাহ মনসুর আলী নোমান, লন্ডন থেকে: ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টির উইকলার (Wycoller )গ্রামেRead More



Comments are Closed