আজ মক্কা বিজয়ের দিন
মাওলানা মাহমুদুল হাসান: আজ ২০ রমজান ১৪৩৭ হিজরি। মাগফিরাতের দশম ও শেষ দিন। সোমবার থেকে শুরু হবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নাজাতের দশক। রমজানের ২০ তারিখ হলো ইসলাম ও মুসলমানদের অনন্য বিজয়ের দিন। সিয়াম সাধনার মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ অতিক্রম করার পাশাপাশি মুমিন বান্দারা ইসলামের বিজয় কাহিনি ও স্মরণ করেন এই দিনে। এই দিনে পরকালীন মুক্তি শান্তির অমিয় বার্তার সাথে ইহকালের শান্তি সমৃদ্ধি ও সাফল্য লাভের আল্লাহর ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেয়।
আজকের দিনের সাথে ইসলামের ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা মক্কা বিজয়ের বিষয় জড়িয়ে আছে। এটা শুধু ইসলামের ইতিহাস নয়, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুগান্তকারী একটি ঘটনা। পৃথিবীর মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণলাভের সরলপথের দিশা নিয়ে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করেন পবিত্র মক্কা নগরীতে। মানুষের জন্য প্রথম ইবাদতের ঘর হিসেবে বায়তুল্লাহ বা কা’বা শরিফের অবস্থানের কারণে এখানকার বাসিন্দারা গোটা আরব ভূখন্ডে সম্মানিত ছিলেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সাল্লামের রক্ত ও ধর্মের উত্তরাধিকার বহন করছিল কুরাইশ বংশ। তাদেরই মাঝে আবির্ভূত সর্বশ্রেষ্ঠ ও শেষনবী মুহাম্মদ মোস্তফা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শৈশব থেকেই আস্থা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হলেও এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপনে আহ্বান জানানোর কারণে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েন। দীর্ঘ দিনেও ইসলামের আহবানে সাড়া দেওয়া মানুষের সংখ্যা সীমিত থেকে হয়। মহান আল্লাহর আদেশ পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ায় তারা নিপীড়নের শিকার হলেন। তাই মহানবী (সা.) ও মুসলমানরা হিজরত করলেন। নতুন আবাসভূমি মদিনার সব নাগরিককে নিয়ে তারা শান্তিপূর্ণ কল্যাণধর্মী শাসনব্যবস্থার আদর্শ স্থাপন করলেন। কিন্তু অবিশ্বাসীদের বিরোধিতা ও আক্রমণ থেকে নিরাপদ হতে পারলেন না। সশস্ত্র মোকাবেলায় অবতীর্ণ হতে হলো; জয়-পরাজয় মিলিয়ে ইসলামের অগ্রগতি সাধিত হতে লাগল। একপর্যায়ে যুদ্ধবিরতির চুক্তি সম্পাদিত হলো মক্কার কুরাইশদের সাথে। হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে ইতিহাসে খ্যাত এই চুক্তিতে একটি ধারা ছিল, আরবের অন্যান্য গোত্র কুরাইশ কিংবা মুসলিম যে-কোনো পক্ষের সাথে মিত্রতা কায়েম করতে পারবে। এ ব্যাপারে তাদের স্বাধীনতা থাকবে; আর মিত্ররা পরস্পরের সংঘাতে লিপ্ত হলে কোনো পক্ষ তাতে সহায়তা করতে বা জড়িত হতে পারবে না। কিন্তু কুরাইশরা এ ধারাটি ভঙ্গ করে বনু বকর মৈত্রী করে কুরাইশদের সাথে। আর বনু খুজাআর মুসলমানদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করে। বনু বকর ও বনু খুজাআর মধ্যে অনেক আগে থেকে শত্র“তা ও বিরোধ ছিল।
চুক্তির একটি ধারা ছিল, এই দুই গোত্রের মধ্যে কখনো সংঘাত হলে কুরাইশ কিংবা মুসলিম বা কোনো পক্ষে যোগদান বা সহায়তা করবে না। কিন্তু বনু বকর যখন এক সময় সুযোগ বুঝে বনু খুজাআর ওপর হামলা চালায়; কুরাইশরা তখন বনু বকরের পক্ষে যোগ দেয়। এতে বনু খুজাআর কয়েকজন হতাহত হয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ এলে তিনি যাচাই করে ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পান। তাই প্রতিকারের জন্য কুরাইশদের কাছে দূত পাঠান। নিহতদের রক্তপণ আদায় কিংবা অপরাধীদের বয়কট কিংবা চুক্তি বাতিল ঘোষণার আহবান জানান। কুরাইশরা প্রথম দুই বিকল্প প্রত্যাখ্যান করে। তাই তৃতীয় বিকল্প বা চুক্তি বাতিল ঘোষণা অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং মহানবী (সা.) মক্কার উদ্দেশ্যে সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। বস্তুত এটা ছিল ইসলামের বিজয় প্রমাণের একটি উপলক্ষ্য। দশ হাজার মুজাহিদ নিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন মক্কার উপকন্ঠে উপস্থিত হন, তখন কুরাইশরা বুঝতে পারল যে, আজ মুসলমানদের মোকাবেলা করা বা প্রতিহত করা সম্ভব নয়। অতএব অনেকটা বিনা প্রতিরোধে মুসলমানরা মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কুরাইশরা পরাজয় স্বীকার করে নেয়। এ দিন চরম মহানুভবতার পরিচয় দেন মহানবী (সা.)। তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন আর উচ্চারণ করলেন, সেই বাক্যটি-হজরত ইউসুফ (আ.) নিজের ভাইদের উদ্দেশ্যে যা বলেছিলেন। বললেন, তোমাদের বিরুদ্ধে আজ কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত। এটা ছিল অষ্টম হিজরি সনের ২০ রমজানের ঘটনা।
মক্কা বিজয়ের ঘটনা ইসলামের নবী (সা.) জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরবের অন্য সব গোত্র এই ঘটনার জন্য অপেক্ষায় ছিল। সবচেয়ে অভিজাত ও আল্লাহর ঘরের তত্ত্বাবধায়ক গোত্রের ওপর বিজয় ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে তারা নতুন ধর্মের সত্যতার প্রমাণ বলে বিবেচনা করতে থাকে। এ জন্য মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা আসতে থাকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার সংবাদ নিয়ে। গোটা আরব উপদ্বীপের প্রায় সব জায়গায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে।
Related News
রবিউস সানি মাসের চাঁদ দেখা গেছে
ধর্ম ডেস্ক: ১৪৪৮ হিজরি সনের পবিত্র রবিউস সানি মাসের চাঁদ দেখা গেছে। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর)Read More
তাবলিগ জামাতের উভয় পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান মাওলানা মছব্বিরের
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে তাবলীগ জামাতের উভয় পক্ষকে সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারRead More



Comments are Closed