Main Menu

শিক্ষকতায় কোটার দৌরাত্ম্যে উপেক্ষিত মেধা!

স্বপন তালুকদার: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অসংগতি অভাব নেই। দেশের শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তি মাত্রই মনে করেন সর্বস্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় নানান অসংগতি রয়েছে। সব অসংগতি একসাথে দুর করা সম্ভবও নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় অসংগতি শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিতে। শিক্ষার মত সেক্টরে শিক্ষক নিয়োগে যদি অসংগতি থাকে অন্যসব অসংগতি দুর করার কোন মানেই থাকে না। শিক্ষক শিক্ষার শ্রেষ্ঠ উপাদান। তাই শিক্ষক নিয়োগের এই অসংগতিটি আগে দুর করা দরকার। শিক্ষার মূলভিত্তি প্রাথমিক স্তর। আর এই স্তরে শিক্ষক নিয়োগে সবচেয়ে বড় অসংগতিটি প্রকট আকারে বিদ্যামান। ঘুষ-দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের বিস্তার তো আছেই। দীর্ঘদিন যাবৎ কোটা সংরক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অসংগতি।
মান সম্মত শিক্ষা জাতির প্রতিজ্ঞা। এই শ্লোগানটি সামনে নিয়ে আমরা এবছরের প্রথম দিনে উৎসব করে তিন কোটির উপরে শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে প্রায় ৩২ কোটি নতুন বই তুলে দিয়েছি। বিশ্বে অনেক দেশের জনসংখ্যাও এত নয়। আমরা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অন্তত শিক্ষার ক্ষেত্রে সংখ্যাগত দিকটি অতিক্রমে নি:সন্দেহে ভালো করেছি। প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়ে শিশুসহ প্রায় শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি হওয়াটা বড় অর্জন। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতায় এটা কম কৃতিত্ব নয়। বর্তমানে আমাদের লক্ষ্য শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এ লক্ষ্য অর্জন আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পরতে পারে, যদি না গুণগত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ গুলো সময় মত অনুধাবন করে এখনই যথাযথ পরিকল্পনার কথা ভাবা না হয়। বিগত বছর গুলোতে আমাদের সংখ্যাগত অর্জন আশা জাগানিয়া হলেও শিক্ষার মান নিয়ে নানা বিতর্ক। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ শিক্ষক অভিভাবকদের ক্ষোভ বিবেচনায় নিলে বলতেই হয় আমাদের শিক্ষার বর্তমান মান নিচের দিকে ধাবমান,তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের শিক্ষার নিম্নমানের অনেক কারন রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে স্বল্প বিনিয়োগ এবং শিক্ষক নিয়োগে কোটা সমস্যা। মেধাবীদের এক পাশে ঠেলে কোটার আধিক্য দশকের পর দশক চালু থাকায় নাকাল হচ্ছে মেধাবীরা।শিক্ষকতা পেশা অন্য সব পেশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা ব্যবসা-বানিজ্য,যোগাযোগ, এমনি অফিসিয়াল নানা পেশায় জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষা হচ্ছে বিনিয়োগের শ্রেষ্ঠ স্থান এখানে জোড়াতালির কোন সুযোগ নেই, যার প্রভাব আমাদের প্রতিটা ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। শিক্ষক এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর সংস্পর্শ একজন মানব শিশুর বিকাশ, নৈতিক, মানবিক, সামাজিক, নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক গুণে :গুণান্বিত হয়ে পরিপুর্ণ মানুষ রূপে গড়ে উঠবে। তাই শিক্ষক হবেন নানা গুণে গুণান্বিত অধিকতর যোগ্যতা সম্পন্ন মেধাবী। জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনে তাঁরা বলেছেন, যে দেশের শিক্ষক যত জ্ঞানী সেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তত উন্নত। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের ভালো বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণ, আধুনিক সুযোগ সুবিধা ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে সুসজ্জিত ক্লাশ রুম ইত্যাদি দিয়ে, যদি যোগ্যতা সম্পন্ন জ্ঞানী শিক্ষক দিতে না পারি,আমাদের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি মেধাবীদের আসার সুযোগ না থাকে, আমাদের সব আয়োজন ব্যর্থ হতে বাধ্য। জাতিসংঘ মনে করে আজকের শিশুকে আগামীতে কি অজানা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে, তা কেউ আগাম বলে দিতে পারেন না।তাই একজন যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকই পারেন আজকের শিশুর আগামীর অজানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে। কিন্তু দু:খের সাথে বলতে হয় আমরা স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরও শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে উপজাতি কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, মহিলা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, জেলা কোটা, পোষ্য কোটাসহ নানাবিদ কোটার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে আসছি। এমনিতেই আমাদের দেশে যে কোন সেক্টরে নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। ঘুষ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগীতা তো আছেই। ফলে শিক্ষক নিয়োগের গুণগত মানের বিষয়টি তেমন অর্থবহ আলোচনায়ই আসে না।মানব শিশুর শিক্ষার ভীত মুজবুতের প্রকৃত সময় প্রাথমিক শিক্ষা স্তর। আমরা যদি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের দিকে তাকাই ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজন প্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে যে বিষয়টা মান সম্মত শিক্ষায় বড় অন্তরায় তা হচ্ছে, ঐ কোটা পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ। এই সব অন্তরায় সমূহের কারণে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সত্যিকার মান সম্পন্ন শিক্ষকের অভাব।প্রাথমিক স্তরের অবস্থা খুবই করুণ।সংবিধানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের জন্য কোটা সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। তবে এই আওতায় পড়ে না এমন কোটাও রয়েছে। আর তা রয়েছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। ফলে কোটার আওতায় চলে গেছে পঁচাশি শতাংশ। মেধা কোটায় রয়েছে মাত্র পনের শতাংশ। আমরা প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকতার মতো পেশায় ৬০% মহিলা কোটায় শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি, যাঁরা কিনা” শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দিবেন, তা কতটা যুক্তি সংগত? সবচেয়ে বেমানান বিষয়টা হচ্ছে মহিলাদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলযোগ্য। মহিলাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি এবং পুরুষ স্নাতক। সমান বেতন স্কেল সমান সুযোগ সুবিধায়। এতে অধিকতর যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হচ্ছে, সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে নিম্ন মেধার প্রার্থীদের। এতে মান সম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। মান সম্মত শিক্ষা ও টেকসই মানব সম্পদ উন্নয়নের স্বার্থে এখনই কোটা প্রথায় শিক্ষক নিয়োগ বাতিল বা কমিয়ে আনা উচিত। একটা সময় মহিলাদের এই সুযোগ দেওয়ার প্রযোজন ছিল,মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য।একটা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী, সেখানে নারীদের উন্নয়নে সমান অংশ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আমাদের দেশের নারীরা শিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিলেন।তাই মহিলাদের উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে উৎসাহিত করতে কোটা প্রয়োজন ছিল।বর্তমানে মহিলারা মুলধারায় চলে এসেছেন। শিক্ষাসহ চাকুরী ক্ষেত্রেও মহিলারা পিছিয়ে নেই। তাই শিক্ষক নিয়োগে আমাদের কোটা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত। তাছাড়া একই পদে পুরুষ ও মহিলা নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা সমান হওয়া আবশ্যক। কোটা প্রথা বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশে আছে এবং তা করা হয় একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কোন পিছিয়ে পড়া স¤প্রদায়, গোষ্ঠী বা দেশের জনসংখ্যার পিছিয়ে পড়া অংশকে উন্নয়নের মুলধারায় নিয়ে আসতে। কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন কোটা চালু রাখা অনেকটা অভিশাপের মত যে কোন সেক্টরের জন্য, শিক্ষার মতো সেক্টরে তো কাম্য নয়ই।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুসারে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম পর্যন্ত চালু হচ্ছে। কোটা পদ্ধতিতে এইচএসসি পাশ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কতটা সুফল আশা করতে পারি! আমাদের শিক্ষার গুণগত মান অর্জনে, টেকসই মানব সম্পদ উন্নয়নে, দুর্নীতি মুক্ত, জঙ্গী ও সন্ত্রাস মুক্ত দেশ গড়তে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আসার সুযোগ করে দিতে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি মুক্ত এবং কোটা প্রথা বিলুপ্ত করা আশু প্রয়োজন। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য চাই অধিকতর যোগ্য শিক্ষক। শিক্ষক নিয়োগে কোটা সংরক্ষণ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তিলে তিলে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার মত।যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষকতা পেশায় কোটার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হোক, যোগ্যতা আর মেধাই হোক শিক্ষকতার পূর্বশর্ত।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট।

Share





Related News

Comments are Closed