বড়লেখায় মুন্নির মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ‘উধাও’, তালাবদ্ধ ঘর
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। মুন্নির মৃত্যুর পর থেকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির ননদ, মেঝো জা, শাশুড়ি ও মেঝো ভাসুরকে বাড়িতে দেখা যাচ্ছে না। তাঁদের থাকার ঘরগুলোও তালাবদ্ধ। এ ঘটনায় এখনো হত্যা মামলা হয়নি। থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটির তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২৯ আগস্ট বিকেলে মুন্নির শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরের স্টিলের দরজায় তালা ঝুলছে। পাশের ঘরগুলোতেও তালা দেওয়া। এসব ঘরে মানুষের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
তবে পাশের আরেকটি একটি ঘরে মুন্নির বড় জাকে পাওয়া যায়। তিনি ও তাঁর স্বামী—মুন্নির বড় ভাসুর—আলাদাভাবে বসবাস করেন। মুন্নির এক বছর বয়সী কন্যাসন্তান বর্তমানে ওই বড় জায়ের কাছে রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রও জানিয়েছে, মুন্নির ননদ, মেঝো জা, শাশুড়ি ও মেঝো ভাসুর বাড়িতে নেই এবং তাঁদের ঘর তালাবদ্ধ।
মুন্নির মেঝো ভাসুরের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান বলেন, পুলিশ তদন্তকাজে ওই বাড়িতে গিয়েছিল। ওই সময় মুন্নির ননদ, মেঝো জা, শাশুড়ি ও মেঝো ভাসুরকে পাওয়া যায়নি।
মুন্নির পরিবার বলছে, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও তিনি শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন। এর আগে বাবা-মাকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে যেকোনো সময় মেরে ফেলতে পারে।’
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ আগস্ট শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে মুন্নির বিরোধ হয়। একপর্যায়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ। তখন তিনি ভিডিও ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বাবা-মাকে বিষয়টি জানান। মেয়ের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে তাঁর বাবা স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিষয়টি সমাধানের অনুরোধ করেন। পরে এক মুরব্বি তাঁকে ফোন করে জানান, বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পরিচয়ে এক ব্যক্তি মুন্নির বাবাকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি বাথরুমের কাঠের বীমের সঙ্গে মেয়ের ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান বলে পরিবারের দাবি। বাথরুমের দরজা খোলা ছিল বলেও তাঁরা জানান।
ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিরা মুন্নি আত্মহত্যা করেছেন বলে তাঁর বাবাকে জানান। তবে পরিবারের কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হয়নি। তাঁদের দাবি, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও মুন্নি নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন। পরে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। এসব আঘাতের ছবি ও ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মুন্নির ব্যবহৃত মুঠোফোনটি মৃত্যুর পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে ওই ফোন থেকেই বাবা-মাকে ভিডিও ও খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন মুন্নি।
পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, মৃত্যুর আগে যে ফোনে তিনি নির্যাতনের কথা জানিয়েছিলেন, সেটি এখন কোথায়? তাঁদের দাবি, ফোনটি উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে মৃত্যুর আগে মুন্নির সঙ্গে কার কার যোগাযোগ হয়েছিল, কী ধরনের বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল এবং কোনো ভিডিও বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত ছিল কি না, তা জানা যেতে পারে।
২০২৩ সালে বড়লেখা উপজেলার মুড়িরগুল গ্রামের সৌদি আরবপ্রবাসী মামুনুর রশিদ লাভলুর সঙ্গে পারিবারিকভাবে মুন্নির বিয়ে হয়। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের গালিগালাজ এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন তিনি। এসব বিষয় তিনি নিয়মিত বাবা-মা ও স্বজনদের জানাতেন বলে পরিবারের দাবি।
মুন্নির এক বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি অনেক কিছু সহ্য করেই সংসার করছিলেন বলে পরিবারের ভাষ্য। নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছিল। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের।
সম্প্রতি মুন্নির ননদ, ভাসুর, জা ও শাশুড়ি তাঁর বাবার বাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেন বলে পরিবারের অভিযোগ। স্বামীর জন্য সৌদি আরবে গাড়ি কেনার কথা বলে এই টাকা চাওয়া হয়। পরে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিবার পাঁচ লাখ টাকা দেয়। এরপরও টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে মুন্নি বাবা-মাকে তাঁকে মেরে ফেলার আশঙ্কার কথা জানান বলে পরিবার জানিয়েছে।
মুন্নির পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা ঘটনাটি নিয়ে হত্যা মামলা করতে চাইলেও থানায় মামলা নেওয়া হয়নি। একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহল ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তাঁদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার।
পরিবারের পক্ষ থেকে মুন্নির মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, মুঠোফোন উদ্ধার ও ফরেনসিক পরীক্ষা, সুরতহাল প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের ছবি-ভিডিও, ভিডিও বার্তা, খুদে বার্তা ও কলের তথ্যসহ সব আলামত সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যাতে কোনো প্রভাবের কারণে প্রভাবিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ তুলে মুন্নির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায় তাঁর পরিবার।
তবে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটির তথ্যের আলোকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও আলোচনা চলছে। অনেকেই ঘটনাটিকে হত্যা দাবি করে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন। তবে মুন্নির মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনো কারণে—এর উত্তর এখন নির্ভর করছে তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।
Related News
বড়লেখায় মুন্নির মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ‘উধাও’, তালাবদ্ধ ঘর
Manual4 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূ মরিয়ম আক্তার মুন্নির মৃত্যুর ঘটনায় রহস্যRead More
কমলগঞ্জে সততা স্টোরের উদ্বোধন ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
Manual8 Ad Code কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে সততাRead More



Comments are Closed