নন্দিনী হত্যা: বিধানের মৃত্যুদ্বন্ড, বাবা মা’র ৫ বছর কারাদ্বন্ড
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: লালমনিরহাটের আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলায় প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রের মৃত্যুদন্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদ্বন্ড এবং তার বাবা রনজিৎ কুমার, মা মমতা রানীকে ৫ বছর করে কারাদ্বন্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদ্বন্ড দিয়েছেন আদালত।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক হায়দার আলী আসামীদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষনা করেন।
দন্ডিতরা আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের বাসিন্দা। তারা সবাই একই পরিবারের। মৃত নন্দিনী রায় একই গ্রামের নলনী মোহনের ৭ বছরের মেয়ে।
মামলার এজাহারে প্রকাশ, গত ১৫ জুন বিকেলে নিখোঁজ হয় স্কুল পড়ুয়া শিশু নন্দিনী রায় (৭)। পরদিন তার বাড়ির পিছনে ভুট্টাক্ষেতের নরম মাটি দেখে সন্দেহ হলে তা খুড়ে বস্তাবন্দি নন্দিনীর লাশ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। সন্দেহ থেকে স্থানীয়রা প্রতিবেশি বিধান চন্দ্র ও তার বাবা রনজিৎ কুমারকে তার বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। এ সময় উত্তেজিত জনতা বিধান চন্দ্রের বাড়ি আগুনে পুড়ে দেয়।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকসহ জেলা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপর স্থানীয়রা হামলা চালিয়ে আসামী ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এতে পুলিশ সুপারসহ প্রায় ৩৫ জন পুলিশ আহত ও জেলা প্রশাসকসহ ৫টি গাড়ি ভাংচুর করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
এ ঘটনায় ১৬ জুন নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহন বাদি হয়ে বিধান চন্দ্রকে প্রধান করে তার বাবা রণজিৎ কুমার মা মমতা রানীকে অভিযুক্ত করে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বিধান চন্দ্র হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এ মামলায় পলাতক থাকা বিধানের মা মমতা রানীকেও গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
মামলাটি তদন্ত শেষ করে তদন্ত কর্মকর্তা উপ- পরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ মোঃ আইয়ুব তুহিন গত ১৩ আগস্ট আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। এরপর ১৬ আগস্ট আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ১৭ আগস্ট থেকে ১৯ আগস্ট ৩ দিনে এ মামলার ২৩ জনের স্বাক্ষ শুনানী গ্রহন করেন আদালত। পরবর্তিতে মাত্র ৬ কার্যদিবসে ২৩ আগস্ট আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার রায় ঘোষনা করেন আদালত।
রায়ে বলা হয়, আলোচিত নন্দিনী হত্যার দায়ে আসামী বিধান চন্দ্রকে মৃত্যুদ্বন্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদ্বন্ড এবং তার বাবা রণজিৎ কুমার ও মা মমতা রানীকে ৫ বছর করে কারাদ্বন্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা আনাদায়ে আরও ৩ মাসের কারাদন্ড প্রদান করা হয়। আসামীদের হাজতবাসের সময় সাজা থেকে বাদ যাবে বলেও রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।
আদালতের এ রায়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করে নিহত নন্দিনীর বাবা নলনী মোহন বলেন, ন্যায় বিচার পেয়েছি। রায়ে আমরা সন্তষ্ট। তবে এ রায় দ্রুত কার্যকর করে দৃষ্ঠান্ত স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, মাত্র ৬ কার্য দিবসের মধ্যে লালমনিরহাটের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনায় বিধান আদালতকে জানায়, কয়েক বছর আগে তার মা মমতা রানী অন্যের সংসারে যাওয়ায় তাকে তালাক দেন তার বাবা রণজিৎ কুমার। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন রণজিৎ। কিন্তু কিছুদিন পরে বিধান আলোচনা করে মাকে তাদের সংসারে ফিরে আনেন। এতে ওই সমাজ থেকে তাদেরকে এক ঘরো করা হয়। যা নিয়ে শিশু নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহনের সাথে তাদের ঝগড়া বিবাদ হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় বিধান চন্দ্র। সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে নলিনীর পরিবারের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করতে থাকে। দীর্ঘ এক বছর আগের ঝগড়ার ক্ষোভ মিটাতে কিছুদিন আগে নন্দিনীর বড় ভাই যোতিষ্ঠিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু স্খানীয়দের কারনে সেটা করতে ব্যর্থ হয় বিধান।
প্রতিশোধের দ্বিতীয় পরিকল্পনা মোতাবেক সোমবার বিকেলে নন্দিনী ও অপর এক শিশুসহ বাড়ির উঠানে মোবাইলে টিকটক দেখছিল বিধান। এরপর অপর শিশুটি চলে গেলে তার মোবাইলে চার্জ শেষ হয়। তখন মোবাইল চার্জে দিয়ে বিস্কিট মুখে দিয়ে পুনরায় উঠানে আসে বিধান। এ সময় শিশু নন্দিনী রায় বিস্কিট চাইলে তাকে বিস্কিট দিতে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এরপর শিশু নন্দিনীকে বিস্কিট খাইয়ে গলাটিপে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভড়িয়ে রাখে বলে দাবি করেছে ঘাতক বিধান।
স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দিতে ঘাতক দাবি করে প্রথমে নিজ বাড়ির পাশে পাটক্ষেত গর্ত করে লাশ পুতে রাখতে। স্থানীয়রা জানতে পেলে তিনি (বিধান) জানান ছাগল মারা গেছে তা পুঁতে রাখতে হবে। দুর্গন্ধ হবে জন্য স্থানীয়রা বাঁধা দিলে পরিকল্পনা পাল্টে নন্দিনীর বাড়ির পিছনের ভুট্টা ক্ষেতে গর্ত করে এবং বিকেল ৫টার পরেই সুর্যের আলোতে নন্দিনীর বাড়ির সামনে দিয়ে তারই বস্তাবন্দি নন্দনীর লাশ নিয়ে তারই বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে পুঁতে রাখে খুনী বিধান চন্দ্র। এতসব কাজ করার সময় বিধানের বাড়িতে কেউ ছিল না। বাবা মা দু’জনে বাড়ির বাহিরে থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ প্রশমিত করে বলে দাবি ঘাতকের। খুনী বিধান চন্দ্র এমন ভাবেই নন্দিনী হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন আদালতে।
Related News
নন্দিনী হত্যা: বিধানের মৃত্যুদ্বন্ড, বাবা মা’র ৫ বছর কারাদ্বন্ড
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: লালমনিরহাটের আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলায় প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রেরRead More
চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার ভয়ে তিনজনকে হত্যা, আদালতে বাবুলের স্বীকারোক্তি
Manual8 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলায় ধরা পড়ার ভয়ে তিনজনকেRead More



Comments are Closed