উত্তরায় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে পাইলটের মৃত্যু, রাজশাহীতে শোকের মাতম
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর মারা গেছেন। দুর্ঘটনার পর তিনি সিএমএইচের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সোমবার (২১ জুলাই) বিকেলে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
তৌকির ৭৬ বিএএফএ কোর্সের বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্তের পর তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট তৌকির পাবনা ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এক বছর আগে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
নিহত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম সাগরের মৃত্যুর খবরে রাজশাহীতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মহানগরীর উপশহরে তার বাসার সামনে দুপুর থেকে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনরা।
সোমবার বিকেলে নগরীর উপশহরের তিন নম্বর সেক্টরের ‘আশ্রয়’ নামের ভাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনরা ওই বাড়িতে এসে ভিড় করছেন।
অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউ কেউ হতভম্ব হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন ‘আশ্রয়’ নামের সেই বাসার সামনে।
রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ৩ নম্বর সেক্টরের ২২৩ নম্বর বাড়িটিতে ভাড়া থাকেন তৌকিরের বাবা তহুরুল ইসলাম, মা সালেহা খাতুন এবং ছোট বোন সৃষ্টি খাতুন। নিহত তৌকিরের বাবা পেশায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পাথর ব্যবসায়ী। আর মা গৃহীনি। আশপাশের মানুষ জানান, এই পরিবার অত্যন্ত মিশুক। তৌকির ছিলেন ভদ্র ও মেধাবী তরুণ।
তৌকিরের পরিবার প্রায় ২৫ বছর ধরে রাজশাহীতে ভাড়া থাকেন। সর্বশেষ তারা ‘আশ্রয়’ নামের এ বাড়িটির তিনতলায় উঠেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি গ্রামে তাদের বাড়ি। তৌকির ছিলেন দুই ভাইবোনের বড়। তার ছোট বোন সৃষ্টি খাতুন রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজে এমবিবিএসের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
সেখানে কথা হয় গাড়িচালক আলী হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার খবরে স্যারেরা (নিহত পাইলটের পরিবারের সদস্যরা) বিশেষ বিমানে ঢাকায় গেছেন। বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে একটি বিশেষ ফ্লাইটে রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে তারা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। সঙ্গে গেছেন তৌকিরের মা-বাবা, স্ত্রী এবং বোন সৃষ্টি খাতুন ও তার স্বামী ডা. তুহিন ইসলাম। এখন বাড়িতে তৌকিরের চাচাতো মামা রফিকুল ইসলাম ছাড়া কেউ নেই।
দুর্ঘটনার খবরে তৌকিরের বাসায় এসেছেন বিমানবাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মোস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, তৌকির নম্র, ভদ্র ও স্মার্ট। একজন দক্ষ মানুষ। শুরু থেকেই তার পাইলট হওয়ার ইচ্ছা। সে পাইলট হিসেবেও ভালো। তাকে ছোট থেকে দেখছি। তার এমন খবরে আমি নিজেও মর্মাহত। গত একমাস আগেও তার সঙ্গে কথা হয়েছে। তার শিক্ষাজীবন ভালো ছিল। পাবনা ক্যাডেট কলেজের আগে রাজশাহী গভ. ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে।
মামা রফিকুল ইসলাম বলেন, বাড়িতে কেউ নেই। তৌকিরের দুর্ঘটনার খবরে সবাই ঢাকা গিয়েছে। তার জন্য দোয়া করা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই। তারা সবাই মানুষ হিসেবে অনেক ভালো। তার মৃত্যুর খবরে স্বজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই গ্রামের বাড়ি শিবগঞ্জ থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা করেছেন। জানি না সর্বশেষ পরিস্থিতি। ঢাকায় স্বজনরা রয়েছেন।
বাসার মালিক আতিকুল ইসলাম বলেন, তৌকির ইসলাম সাগর প্রথমবারের মতো একা প্রশিক্ষণ বিমান চালাবেন এই খবরে পুরো পরিবারের সদস্যরা আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত ছিলেন। দুপুরের পর তারা বিমান বিধ্বস্তের খবর পান। সে সময় জানতে পারেন সাগর ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সাগরকে দেখতে পরিবারের সদস্যরা বিমানযোগে ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে র্যাবের একটি মাইক্রোবাসে করে ভাড়া বাসা থেকে তাদেরকে রাজশাহী শাহমখদুম বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তারা ঢাকা রওনা হন।
আতিকুল ইসলাম আরও বলেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের বাবা মা বোন ও বোন জামাই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তার মৃত্যুর খবর জানতেন না। পরিবারের সদস্যরা জানেন সাগর জীবিত ও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত পাইলটের বড় চাচা মতিউর রহমান বলেন, তার বাবা-মাকে এখনও তৌকীরের নিহতের খবর জানানো হয়নি। গতবছরে তৌকির ইসলাম বিয়ে করেন। এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। তার স্ত্রী ঢাকার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষিকা।
এদিকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় শতাধিক।
প্রসঙ্গত, সোমবার দুপুরে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার দুপুর ১টার পর রাজধানীর উত্তরায় দুর্ঘটনায় পড়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। বিমানটি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে গিয়ে পড়ে এবং বিধ্বস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিমান ও স্কুল ভবনটিতে আগুন ধরে যায়। যে ভবনে এটি বিধ্বস্ত হয় সেখানে বহু স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিল বলে জানা গেছে। যাদের বেশিরভাগই হতাহত হয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপর উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। উত্তরাসহ আশপাশের ৮টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং হতাহতদের উদ্ধার করা শুরু করে। পরে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় বিজিবি ও সেনাবাহিনী। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে হতাহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় দগ্ধ অন্তত ৫০ জনকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। যারা সবাই গুরুতর দগ্ধ হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা এলাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আরও বহু দগ্ধ ও আহত শিক্ষার্থী ভর্তি আছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। দুপুর ১টা ৬ মিনিটে এটি উড্ডয়ন করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি উত্তরা মাইলস্টোন কলেজের ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়।
Related News
ইউরোপের ২৯ দেশের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদেরকে সতর্কবার্তা
Manual3 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: এবার বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে ঢাকায় অবস্থিতRead More
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষ, নিহত ২
Manual8 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ঢাকা-টাঙ্গাইল যমুনা সেতু মহাসড়কে ট্রাক-পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে দুইজন নিহতRead More



Comments are Closed