Main Menu

মানব সভ্যতায় কাগজ শিল্প

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: বর্তমান সভ্যতায় আমরা বিজ্ঞানের অবদানকে অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের যা কিছু দিয়েছে তার প্রত্যেকটিরই ভালো-দিক মন্দ দিক আছে। কিন্তু সভ্য জগতের শুরুর দিকের মানুষ আমাদের যা দিয়েছে তার মন্দ দিকের চেয়ে ভালোর দিকই বেশি। উদাহরণ হিসেবে আমরা কাগজের কথা বলতে পারি। কিন্তু এই কাগজ আমরা আলাদীনের প্রদীপের মতো একদিনেই পাইনি। অনেক অনেক সংস্কারের পর আমরা এই কাগজ পেয়েছি।

কাগজের কথা আলোচনার পূর্বে আমাদের জানতে হবে কাগজ কেন দরকার? কাগজের প্রয়োজনীয়তা মানুষের মনে কেন উদয় হল? জানতে হবে কাগজের বইয়ের অক্ষর মালা কোথা হতে এল।

সবচাইতে পুরোনো লেখা হল-ছবি এঁকে লেখা। ছবি আঁকতে আঁকতেই মানুষ একদিন অক্ষরের সৃষ্টি করে ছিলো। ছবি এঁকে লেখার নাম চিত্রলিপি। আর চিত্রলিপির প্রথম প্রচলন হয় মিশর দেশে। ছবি আঁকা হতো পাহাড়ের গায়ে দাগ কেটে। প্রাচীনকালে অনেকগুলো গুহাচিত্র আবি®কৃত হয়ে ছিল ফান্সে ও স্পেনে।

১৮৭৯ সালে স্পেন দেশের সাউটুওলা নামের এক প্রতœতত্ত¡বিদ একদিন তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের হাত ধরে আলতামিরা গুহার মধ্যে ঢুকলেন, পরীক্ষা করবেন বলে। হঠাৎ মেয়েটির নজর পড়ল গুহার ছাদের নিচে। মেয়েটি চিৎকার করে উঠল-বাবা টেরো টেরো! ‘টেরো’ শব্দের অর্থ ষাঁঢ়। মেয়েটি যে ছবিগুলোকে ষাঁঢ় বলেছিলো তা ছিলো আসলে কতকগুলো বাইসনের ছবি। প্রত্নতত্তে¡র আবিষ্কারে যারা নাম লিখিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সাউটুওলার মেয়েটিই সবার চেয়ে ছোট।

আলতামিরার মত আর একটি গুহা লামকো আবিষ্কার হয়েছিল ১৯৪০ সালে। ফ্রান্সের পেরিগর প্রদেশের এক বনময় মালভূমি থেকে মাত্র তিনশ ফুট নীচে ভেজের নদীর উপত্যকা আর তারই অনতি দূরে মঁতিনিয়াক শহরে অবস্থিত ‘লাস্কো’ গুহা।

লাসকো গুহার দেয়াল আর ছাদে আঁকা ছিলো বিরাট বিরাট ষাঁঢ়ের ছবি। এছাড়া ঘোড়া, হরিণ ও নানান প্রাণী এবং জন্তু জানোয়ারের মূর্তি। প্রস্তর যুগের গুহাগুলোর মধ্যে লাস্কোর স্থান অনেক উচ্চে।

ভাষা সৃষ্টি মানুষের একটি বিরাট কীর্তি। ভাষা মানুষের চিন্তার বাহন। ভাষা সৃষ্টি হয়েছে বলেই মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা হয়েছে। চিন্তা করার ক্ষমতা যদি মানুষের না হত তবে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ হত না।

কথিত আছে ছবি থেকে অক্ষরের সৃষ্টি হয়েছে। ছবি এঁকে কোন কিছু লেখলে তার অর্থ এক একজনের নিকট এক একরকম হয়। ফলে ছবির ভাষা মানুষকে বিপদগ্রস্থ করে ফেলে।

অনেকদিন আগে পারস্যদেশে দারাউস নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি একবার সাইথিয়ান নামে একটি রাজ্য আক্রমণ করেন। সাইথিয়ার দূত দারাউসের কাছে একখানি ছবি নিয়ে এলো। ছবিটিতে আঁকা ছিল একটি পাখি, একটি ব্যাঙ, একটি ইঁদুর ও তিনটি তীর।

ছবি দেখে দারাউস ভাবলেন,তাঁর তীরের ভয়ে সাইথিয়ানরা তাদের জল ও স্থল ভাগ তার হাতে তুলে দিতে চায়। কিন্তু সাইথিয়ানরা সেই রাতেই আক্রমণ করল দারাউসকে।

তিনি সাইথিয়ানদের কা- দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না। সাইথিয়ানরা তাঁর হাতে দেশ তুলে দেওয়ার বদলে তাঁকে আক্রমণ করে বসলেন কেন? তিনি নতুন করে ছবির অর্থ বুঝার চেষ্টা করলেন। এই ছবিগুলোতে বলা হয়েছিলো, পারস্যবাসীরা যদি পাখির মত পালিয়ে না যায়, ইঁদুরের মত গর্তে না ঢোকে আর ব্যাঙের মত না লুকায় তবে সাইথিয়ানদের তীর থেকে পারস্যবাসীদের রেহাই নেই।

ছবির সাহায্যে কোন সংবাদ দিলে এমন ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য সুমের দেশেরর প্রাচীন অধিবাসীরা লেখায় এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। দেখা এবং ভাবা এই দুটো জিনিস মিলিয়ে যে নতুন লেখার রূপ পায় তা চিত্রলিপির উন্নত অবস্থা যার নাম ভাব-ব্যঞ্জক লিপি। সুমেরে লিপি আবিস্কৃত হওয়ার পর মিশর দেশেও লেখার প্রচলন হয়েছিল।

মিশর দেশের প্রাচীন লিপির নাম ছিল “দেব-ভাষা’’ যা সৃষ্টি হয়েছিল যীশু খ্রীস্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগে। ইংরেজিতে ওই ভাষাকে ‘হায়ারো গ্লিফিক’ বলে।

পাঁচ হাজার বছর হলো মানুষ লিখতে শিখেছে। আর লেখা আবিষ্কারের প্রায় এক হাজার থেকে দেড় হাজার বছর পরে লেখার ইতিহাসে বর্ণমালার আবির্ভাব ঘটেছে। বর্ণমালা আবিষ্কারের প্রথম কৃতিত্ব অর্জন করেছিল সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন। মিশর দেশে পিরমিডের গায়ে যে সব খোদাই করা অক্ষর আছে লেখার ইতিহাসে ওটাই সবচাইতে পুরনো।

বৌদ্ধ রাজ অশোকের জন্মের চার হাজার বছর আগে আসিরিয়া ও বেবিলন দুইটি দেশছিল ওই দুটি দেশের অধিবাসীরাই প্রথম ছোট ছোট পাথরের উপর লেখার প্রচলন করে।

আসিরিয়ার রাজা আসুর বনিপাল তাঁর রাজধানী নিনেভের লাইব্রেরীর জন্য লোকদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করার হুকুম দিয়েছিলেন। তাঁর চেষ্টায় নিনেভের লাইব্রেরীতে বাইশ হাজারেরও বেশী পাথুরে বই সংগ্রহ হয়েছিল।

১৭৯৯ সালে ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সৈন্যে অফিসার বৌসার্দ মিসরের রশিদ নামক জায়গা থেকে রসেটা নামক একখানি মূল্যবান পাথর আবিষ্কার করেন। পাথর খানি লম্বায় সাড়ে তিন ফুট, চওড়ায় আড়াই ফুট আর পুরু প্রায় এক ফুট। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রসেটা পাথর খানি সংরক্ষিত আছে। বিখ্যাত প-িত শাপোলিয়ঁ এবং টমাস ইয়ং প্রায় তেইশ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে রসেটা পাথরের লিপির পাঠাদ্ধোর করেন।

কাগজের অভাবে মানুষ-হাজার হাজার বছর পাথর খোদাই করে লিখেছে। তারপর লিখেছে-চামড়ায়, গাছের ছালে, পাতায়, কাঠে, তামায় এমনকি মমের উপরেও। আগেকার দিনে আমাদের দেশে তাল পাতা, ভূর্জপত্র এবং কলাপাতায় লেখার প্রচলন ছিল।

কাগজ আবিষ্কার মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে একটা বিরাট কীর্তি। কাগজ শব্দটা এসেছে ফারসী ভাষা থেকে। জার্মানরা কাগজকে বলে পেপিয়ার আর ইংরেজরা পেপার। পেপার ও পেপিয়ার কথা দুটো এসেছে প্যাপিরাস থেকে। প্রাচীনকালে মিশরের নীল নদের তীরের জলাভূমিতে লম্বা লম্বা প্রচুর প্যাপিরাস গাছ জন্মাত। প্যাপিরাস দেখতে আমাদের দেশের নল খাগড়ার মত। প্যাপিরাস লম্বা হয় প্রায় আট-দশফুট। প্যাপিরাস দিয়ে শুধু কাগজই তৈরী হত না তৈজসপত্রও তৈরী হত। কাঠ ব্যবহৃত হত লাকড়ি হিসেবে। প্যাপিরাস গাছের ভিতরের অংশ লোকে খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করতো। কিছু কিছু পেপিরির থান একশ’ গজ লম্বা হত তবে প্রস্থে দশ ইঞ্চির বেশি হত না।

লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরীতে প্যাপিরাসের একশ’ কুড়ি ফুট দৈর্ঘ্যরে একখানা পুঁথি আছে।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছর পূর্বে মিশর রাজ সর্ব প্রথম দলিল লেখার কাজে প্যাপিরাস ব্যবহার করেন। ইউরোপের উত্তর দিকে ‘বিচ’ নামে এক ধরণের গাছ জন্মায় প্রাচীনকালে ওই বিচ গাছের কাঠের উপর লেখা হত আর তাই বিচ থেকে হয়েছে ‘বুক’ শব্দের উৎপত্তি।

প্যাপিরাসের পর লেখার জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে চামড়া বা পার্চমেন্ট। পার্চমেন্ট আবিষ্কার হয় আলেকজান্দ্রিয়ার রাজা পঞ্চম-টলেমি ও পারগামোসের রাজা ইউমেনিস এর রেষারেষির ফলে। আলেকজান্দ্রিয়ার রাজা টলেমি একটি লাইব্ররীর গড়েছিলেন। ওই লাইব্রেরীতে বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় সাত (৭) লাখ মতান্তরে চার (৪) লাখ। লাইব্রেরী সমৃদ্ধ করার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে পুঁথি সংগ্রহ করা হত। পারগামোসের রাজা ইউমেনিসও তার রাজ্যে একটি লাইব্রেরী গড়ে তোলার ইচ্ছে পোষণ করেন। এতে রাজা পঞ্চম টলেমি শঙ্কিত হলেন এই ভেবে যে ইউমেনিস যদি আর একটি লাইব্রেরী গড়ে তোলেন তবে তার লাইব্রেরীর মান ক্ষুন্ন হবে।

প্যাপিরাস না পেলে ইউমেনিস বই তৈরী করবে কি দিয়ে? এই ভেবে টলেমি পারগামেন্সে প্যারিাস পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। টলেমির এই ব্যবহারে ইউমেনিসের জেদ চেপে গেল তাঁকে লাইব্রেরী স্থাপন করতেই হবে। টলেমিকে দেখিয়ে দিতে হবে, প্যাপিরাস নাহলেও তাঁর লাইব্রেরীর বইয়ের অভাব হবে না।

লিখার মত অন্য কোন জিনিস আবিষ্কার করবার জন্য ইউমেনিস তাঁর লোকদের হুকুম দিলেন। লোকেরা এটা পরীক্ষা করে ওটা পরীক্ষা করে। শেষে পরীক্ষা করতে করতে আবিষ্ককৃত হলো, চামড়ার উপরে লেখা যায়। চামড়ার উপর লেখার বস্তুর নাম পার্চমেন্ট। পারগামোসের অধিবাসী পার্চমেন্ট তৈরীর কাজে ভেড়ার, গরুর, শুয়োরের এবং ছাগলের চামড়া ব্যবহার করত। প্রায় পাঁচশ বছর দারুণ সংগ্রামের পর পার্চমেন্ট ধীরে ধীরে প্যাপিরাসের স্থান দখল করতে সমর্থ হয়েছিল। চামড়ার মত পাতায় লেখার পদ্ধতিও আবি®কৃত হয় প্রাচীন কালেই।

ভূমধ্য সাগরের সাইরাকিউস নামের দেশে যে সব আসামী নির্বাসন দ- পেত সেখানকার জজ সাহেবেরা তাদের নাম লিখতেন জলপাই গাছের পাতায় । তাল পাতা লেখার কাজে ব্যবহৃত হত সিংহল ও ব্রহ্মদেশে। উড়িষ্যাদেশের লোকেরা লিখত তালিপাত গাছের পাতায়।

আগে আমাদের দেশের যত প্রকার লেখার উপাদান ছিল, তার মধ্যে তালপাতা, কলাপাতা, বটপাতা, তেরেটপাতা, ভূর্জপত্র, তলট কাগজ, পাথর ও ধাতু ফলকই ছিল প্রধান। ভূর্জগাছ সমতল ভূমি থেকে প্রায় চৌদ্দ হাজার ফুট উপরে জন্মাত।

ভারতের হিমালয় পর্বতই ভূর্জগাছের জন্মভূমি, এই গাছের আয়ুষ্কাল মাত্র এক বছর। ভূর্জ গাছের ছালকেই ভূর্জপত্র বলে। ভারতে ধর্মগ্রন্থ, মন্ত্র ও কবচ লেখার কাজে ভূর্জপত্র ব্যবহৃত হত। কাশ্মীরে ভূর্জপত্রই একটার পর একটা সাজিয়ে প্রাচীন পুঁথি লেখা হত।

যখন থেকে লিপির সৃষ্টি হয়েছে তখন থেকেই আর্যগণ ভূর্জপত্রে লিখতে শিখেছে। ভূর্জপত্রের পুঁথি প্রায় তিন চারশ বছর স্থায়ী হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে ভূর্জপত্রের পুঁথি সংরক্ষিত আছে। আমরা যাকে কাগজ বলি তা আবিষ্কার হয়েছে চীন দেশে যীশু খ্রীস্টের জন্মের প্রায় একশ’ বছর পর। সেসময় হোটি ছিলেন চীন দেশের সম্রাট। সাইলুন নামে তাঁর একজন উপদেষ্টা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কারখানা পরিদর্শক নিযুক্ত হন। সাইলুনের মধ্যে কাগজ তৈরীর তীব্র আকাক্সক্ষা দেখা দিয়েছিল। ঐ সময়ে চীন দেশে লেখার কাগজে ব্যবহৃত হত বাঁশের ফলক ও রেশম কাপড়। সাইলুন ভেবে দেখলেন যে, কাপড়ের টুকরো, ফালতুশন, গাছের ছালি, মাছ ধরার ছেঁড়া জাল এবং পুরনো কম্বল দিয়ে কোন উপাদান তৈরি করতে পারলে তার ওপর লেখা সহজ হবে। যেই ভাবনা সেই কাগজ। শুরু হলো সাইলুনের কাগজ তৈরীর প্রক্রিয়া। সাইলুন তাঁর পরীক্ষার ফল যীশু খ্রীস্টের জন্মের পরে একশ পাঁচ সালে সম্রাট হোটিকে জানালেন। সম্রাট সাইলুনকে সম্মান জনক উপাধি দিয়ে প্রাসাদের প্রধান অমাত্যদের একজন নিযুক্ত করেন। শেষ জীবন তার সুখের হয়নি। তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন। সাইলুনের মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য জো জুয়ীর প্রচেষ্টায় কাগজ শিল্পের আরো উন্নতি হয়েছিল।

সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে চীনের অন্তর্গত কোরিয়া থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা কতকগুলো কাগজের পুঁথি জাপানে নিয়ে যায়। জাপানে প্রথম কাগজ শিল্পের গোড়াপত্তন করেন ডোকিও নামে একজন সন্ন্যাসী। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি মুর ও আরবরা চীনাদের সহিত সমরকন্দের যুদ্ধে কয়েকজন চীনা সৈনিক বন্দি হন। আরবরা চীনা বন্দিদের কাগজ তৈরীর কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল ফলে সমরকন্দ কাগজ-শিল্পের একটি বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে সমরকন্দ থেকে কাগজ শিল্পের কায়দা-কানুন বাগদাদেও বিস্তার লাভ করে। বাগদাদ থেকে কাগজ তৈরীর প্রণালী দামেস্কে ও মিশরে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুরগণ স্পেন দেশে কাগজ শিল্পের প্রবর্তন করেন। দিনে দিনে স্পেন থেকেই কাগজ প্রস্তুতের কলা-কৌশল সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

১৪৯০ সালে প্রথম কাগজ-কল স্থাপিত হয় ইংল্যান্ডের হার্ট ফোর্ড শায়ারের স্টিভেনেজ নামক স্থানে। স্থাপন করেছিলেন জন টেট নামে এক বস্ত্র ব্যবসায়ী। কাগজ কলটির নামছিল ‘সিলমিল’। সিলমিলের কাগজে ১৪৯৮ সালে ইংলল্যান্ডের প্রথম বিখ্যাত কবি জিও ফ্রেন্সোরের লেখা ‘ক্যানটারবেরিটলস’ গ্রন্থের উন্নত সংস্করণ ছাপা হয়। কারখানাটি স্থাপনের মাত্র নয় বছর পর মালিকের মৃত্যুতে কারখানাটি উঠে যায়। সিলমিল উঠে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডে প্রায় আশি বছর কাগজ তৈরীর কাজ বন্ধ থাকে।

ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ ১৫৮৮ সালে জন স্পিলম্যান নামক এক লোককে একটি কাগজ কল স্থাপনের লাইসেন্স দেন। কারখানা স্থাপনের মাত্র এক বছর যেতে না যেতেই তিনি আবারও স্পিলম্যানকে লাইসেন্স প্রদান করেন। স্পিলম্যানের তৈরী কাগজ খসখসে ও বাদামী রঙের ছিল। ১৬০৫ সালে রাজা জেমস্ কারখানাটি পরিদর্শনে যেয়ে স্পিলম্যানকে ‘নাইট’ উপাধি দেন।

প্রথম প্রথম কাগজ সাদা-ই তৈরী হত। হঠাৎই একদিন কাগজ রঙিন হল। ১৭৯০ সালে মি. বুটেন্শ নামে ইংল্যান্ডে একজন কাগজ নির্মাতা তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে কারখানা ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ করে তাঁর স্ত্রীর হাত থেকে কাপড়ে দেওয়ার জন্য কিনে আনা নীল রঙের গুঁড়োর পুটলিটা কাগজের মন্ডের মধ্যে পড়ে যায়। রংগুলো তুলবার আগেই ম-ের সঙ্গে মিশে গেল। সেই থেকে তৈরী হলো নীল কাগজ। এখন আমরা বিভিন্ন রকমের যে কাগজ পেয়ে থাকি তা হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই উদ্ভব হয়েছে।

লেখক- গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠান পাড়া (খান বাড়ী) কদমতলী, সিলেট।

 

 

 

 

Share





Comments are Closed