Main Menu

গৃহকর্মী পেশা : কর্মীর আর্তনাদ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : গৃহকর্ম পৃথিবীর পুরনো পেশাসমূহের একটি। বিশাল জনগোষ্ঠী গৃহাভ্যন্তরে তাদের শ্রম বিনিয়োগ করে। তাদের অনেকেই গৃহকর্তা কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়। গৃহকর্মী নির্যাতন অতি পুরনো সামাজিক ইস্যু হলেও বর্তমানে তা ভয়াবত আকার ধারণ করেছে। প্রচলিত নানা আইন দিয়েও কাঙ্খিত মাত্রায় এর প্রতিরোধ সম্বব হচ্ছে না। গ্রামীণ পরিবার থেকে শুরু করে ক্রমপ্রসারমান নগর জীবনের পারিবারিক আবাস্থল, মেস এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডরমিটরি প্রভূতি গৃহকর্মীদের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। শহরে বসবাসরত নাগরিকদের চাহিদা ও অধিকতর আর্থিক সুবিধা বিবেচনায় প্রান্তিক জনপদের দরিদ্র পরিবারের প্রধানত নারী ও শিশু গৃহকর্মীগণ এসব স্থানে গৃহকর্মে নিয়োজিত হয়। সাধারনত নগরবাসী মানুষের গৃহের সার্বিক নিরাপত্তা এবং গৃহকর্তা ও গৃহের সদস্যদের প্রতি আনুগত্যের বিবেচনায় নারী গৃহকর্মীদের অধিকতর সুবিধাজনক বিবেচনা করার ফলে সার্বক্ষণিক গৃহকর্মী হিসেবে নারী ও শিশু গৃহকর্মী নিয়োগের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদানের বিশেষ প্রবণতাও লক্ষণীয়। আনুগত্য প্রাপ্তির এ মানসিকতার মাঝে বিকৃতি ও লক্ষ্য করা যায়, যা গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়ে থাকে। আবহমানকাল থেকে এ জাতীয় নির্মম নির্যাতন নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফিরছে। শুধু দৈহিক নির্যাতনই নয়, ইদানীং অহরহই ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা।

এহেন অন্যায়-অবিচারের প্রতি মানসিক কারণেই আমাদের যেমন আছে ক্ষোভ, তেমনি রয়েছে সহমর্মিতা সহানুভূতি। কিন্তু এ অবস্থা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেই। এমনকি আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও কার্যকর ভূমিকা গৌণ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অসহায় এই দেশগুলোর পক্ষে আইনী প্রতিকার পাওয়া ও সম্বব হয় না। জাতীয় পত্রিকাগুলোতে এদের নির্যাতনের খবর প্রতিদিনই দেখা যায়। বাস্তবে নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের চেয়ে শত সহস্র গুন বেশি। লোকলজ্জার ভয়ে এসব নির্যাতিতরা বা এদের হতভাগ্য অভিভাবকেরা আইনের দরজা পর্যন্ত আসতে পারে না, সুবিচার তো বহু দূর। অন্যদিকে বেত্রাঘাত, গরম খুন্তির ছেঁকা, গরম ইস্ত্রির ছেঁকা, গরম পানি ঢেলে দিয়ে গা ঝলসে দেয়া এবং লাঠিপেটা করা ইত্যাকার শাস্তি নিত্য-নৈমত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যান নীতি’ ২০১৫ মতে, ‘গৃহকর্ম বলতে রান্না ও রান্না সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক কাজে সহায়তা, বাজার করা, গৃহ বা গৃহের আঙ্গিনা বা চত্বর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং গৃহের অন্যান কাজ যা সাধারণত: গৃহস্থলি কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া ও পোশাক পরিচ্ছদ ধোয়া, গৃহে বসবাসরত শিশু, প্রবীণ কিংবা প্রতিববন্ধী ব্যক্তির যত্ন ইত্যাদি কাজও গৃহকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে নিয়োগকারীর ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত বা মুনাফা সৃষ্টি করে এমন কাজ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন (আই এল ও) গৃহকর্মের সংজ্ঞায় বলেছে: Domestic work” means work performed in or for a household or households গৃহে কৃত কোনো কাজ অথবা গৃহ সংক্রান্ত কোনো কাজ গৃহকর্ম বা গৃহশ্রম বলে গণ্য হবে।

গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ মতে, ‘গৃহকর্মী বলতে এমন কোন ব্যক্তিকে বোঝাবে যিনি নিয়োগকারীর গৃহে মৌখিক বা লিখিতভাবে খন্ডকালীন অথবা পূর্ণকালীন নিয়োগের ভিত্তিতে গৃহকর্ম সম্পাদন করেন। এ ক্ষেত্রে মেস বা ডরমিটরি ও গৃহ হিসেবে বিবেচিত হবে। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন (আইএলও) গৃহকর্মীর সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে: Any person engaged in domestic work within an employment relationship. কোনো ব্যক্তি যদি নিয়োগপ্রাপ্ত অবস্থায় কোনো গৃহকাজে লিপ্ত থাকে তবে সে গৃহকর্মী হিসেবে বিবেচিত হবে।

গৃহকর্মীগণ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে বিশ্বব্যাপী কর্মীরসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং তারা শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। তারা ব্যক্তিগত গৃহকর্মের ভিত্তিতে কাজ করে প্রায়ই কোনরকম সুস্পষ্ট নিয়োগচুক্তি ছাড়া, নিবন্ধন ছাড়া এবং তারা শ্রম আইনের সুবিধা তেমন পায় না। গৃহকমীরা কখনো ফুলটাইম, কখনো পার্টটাইম ভিত্তিতে কাজ করে। তারা নিয়োগ প্রাপ্ত হয় একক বাড়িওয়ালা কিংবা একাধিক ব্যাক্তির পক্ষ থেকে।তারা বাড়ির মালিকের সাথে বা নিজ দায়িত্বে অন্য কোথাও বসবাস করে। বর্তমানে গৃহশ্রমিকরা প্রায়ই খুবই কম বেতন, অধিক কর্মঘন্টা, নির্ধারিত সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা, শারীরিক-মানসিক ও যৌন হয়রানি চলাফেরার স্বাধীনতা বাধা সহ নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে গৃহশ্রমিক নির্যাতন আশংকাজনকভাবে বেড়েছে। সরকারী উচ্চ পর্যায়েরর কর্মকর্তা, পুলিশ ও সামরিক কর্মকর্তা, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, এনজিও কর্মী, খোলোয়াড় এবং চিত্রনায়িকার বাড়িতেও ঘটেছে গৃহকর্মী নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না, বিচার পাচ্ছে না ভুক্তভোগী দরিদ্র অসহায় পরিবার। ধর্ষিতা নারী কখনও বা কলঙ্ক ঘোচাতে নিজেই জীবন বিসর্জন দেয়।

অল্প কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া গৃহশ্রমের ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত সাধারণ বৈশিষ্ঠগুলো বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়: গৃহ শ্রমিককে সার্বক্ষণিক বিভিন্ন প্রকৃতির শ্রমি দিতে হয়। ফলে শ্রমিককে কাজ করতে গৃহ মালিকের বাড়িতেই অবস্থান করতে হয়; গৃহকর্মীদের ঘুমানোর জন্য (গৃহ মালিকের বাড়িতে) কোন নিরাপদ নিধারিত স্থান থাকে না। গৃহ শ্রমিকের মালিকের ঘরের মেঝেতে বা পরিত্যক্ত কোন অরক্ষিত ঘরে বা ঘরের অনিরাপদ বারান্দায় থাকার ব্যবস্থা হয়। এক্ষেত্রে তাদের মানবিক মর্যাদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না; গৃহ মালিক কর্তৃক পুরানো থালা বাসন গ্লাসে সর্বশেষ ও নিম্ন মানের কম পরিমান খাবার দেওয়া হয়; গৃহ শিশু শ্রমিককে শোয়ার বিছানা, চাদর, পরিধানের বস্ত্র পুরনো, অপরিচ্ছন্ন, পরিত্যক্ত ও অপরিষ্কার খাবার দেওয়া হয়। শ্রমে বা কাজে যোগ দেযার অধিকার থাকলেও শ্রম থেকে অব্যাহতি পাওয়ার অধিকার থাকে না। মালিকের বাড়িতে অসুবিধা হলে শ্রমিককে পালিয়ে গিয়ে অব্যাহতি নিতে হয়। গৃহ মালিকের পরিবারের সদস্যগণের নিকট থেকে গৃহকর্মীরা সাধারণত মানবিক আচরণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়; কান অনুষ্ঠান, ধর্মীয় বা সামাজিক পর্বে নিম্নমানের নতুন কাপড় দেয়া হয়; গৃহকর্মে শিশুদের নিয়োগে গৃহকর্তাদের বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। কারণ, শিশু শ্রমিকরা বাধ্য ও অনুগত থাকে এবং পরিবারের সকলের নির্দেশ নির্বিবাদে ও প্রতিবাদহীনভাবে পালন করে; বিশ্রাম, বিনোদন, অবসর যাপনের সুযোগের অভাব এবং গৃহ মালিকের শিশু সন্তানদের সঙ্গে মুক্তভাবে খেলাধুলা করার অনুমতি সীমিত; সবার পরে ঘুমাতে দেয়া হয় এবং সবার আগে ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য করা হয়।

কর্মস্থানের খারাপ পরিবেশ, শ্রমিকদের শোষণ, অশোভন আরচরণ ও মানবাধিকার লংঘনসহ গৃহকর্মীদের নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগাইজেশন আইএলও গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা, কর্মস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। আইএলও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৃহকর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন দেশের সরকার, এ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সামর্থ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, শ্রমিক সংঘটনগুলোকে আর্থিক, নৈতিক ও আইনী সাহায্য প্রদান করে। তাছাড়া Domestic worker convention 2011.। এ গৃহীত সনদ নং ১৮৯ এবং পরামর্শ ২০১ বাস্তবায়নে আইএলও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নসদ নং ১৮৯ গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় একটি যুগান্তকারী আর্ন্তজাতিক পদক্ষেপ। এতে গৃহকর্মীদেরকে অন্যান্য শ্রমিকের মতোই বিবেচনায় আবহান জানানো হয়েছে। এই কনভেনশনে নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহে গৃহকর্মীদের ন্যূনতম স্বার্থ রক্ষার অংগীকার করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন, কাজ করার মৌলিক অধিকার, নিয়োগ দেওয়ার পদ্ধতি ও শর্ত, কর্মঘন্টা, পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, বেসরকারী নিয়োগ এজেন্সি, বিরোধ নিষ্পত্তি, অভিযোগ ও জরবদস্তি। সনদ নং ১৮৯ অনুযায়ী গৃহকর্মীদের সাথেও এখন থেকে লিখিত চুক্তি করতে হবে। এছাড়া তাদের অন্তত একদিন সাপ্তাহিক ছুটির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এবং বার্ষিক ছুটি ও অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে কোনভাবেই গৃহকর্মীদের কাজে বাধ্য করা যাবে না। নতুন সনদ নং ১৮৯ ও পরামর্শ নং ২০১, পূর্ববর্তী আইএলও সনদ নং ১৩৮ এবং ১৮২ এর আলোকে গৃহীত হলে ও এটি পূর্ববর্তী সনদ ২টির (১৩৮ ও ১৮২০ জন্য সম্পূরক। আইএলও সনদ নং ১৩৮ (ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত)- এর মাধ্যমে মূলত শিশুশ্রমকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে ও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কোনো শিশু যেন ন্যূনতম যেন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করার পূর্বে শ্রমে নিযুক্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং এ সনদে কাজে যোগদানের ন্যূনতম বয়স ১৫ বছর নির্দিষ্ট করা হয়েছে। যদিও প্রয়োজনে ও ব্যতিক্রম হিসেবে এ বয়স ১২ বছর ও হতে পারে। অন্যদিকে আইএলও সনদ নং ১৮২-তে নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রম নিরসন সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়েছে। এই সনদ অনুসারে, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, পর্ণোগ্রফির মতো কাজে শিশুকে ব্যবহার দাসত্বসদৃশ শ্রম যেমন শিশু পাচার ও বিক্রয়, ঋণদাসত্ব ইত্যাদি কাজ নিকৃষ্ট ধরনের কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ সনদের উদ্দেশ্যে শিশু শব্দটি ১৮ বছরের কম সকল ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে। স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ এসব সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে ও তার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা কীভাবে তৈরি করবে সে সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা পরার্মশ ২০১-তে দেয়া হয়েছে। গৃহ শ্রমিকদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ আইএলও সনদ নং ১৩৮ ও সনদ নং ১৮৯ এ বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত স্বাক্ষর করেনি। যদি ও বাংলাদেশ জাতিসংঘ গৃহীত United Nations Convention on the Rights of the child (UNCRC) এবং আইএলও গৃহীত কনভেনশন নং ১৮২ (নিকৃষ্ট ধরনের শিশুশ্রম সম্পর্কিত) সহ শ্রমবিষয়ক প্রায় ৩৩ টি আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে।

জাতিসংঘ গৃহীত Universal Declaration of Human Rights বা সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিক জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে ধর্ম, গোত্র, গাত্রবর্ণ, জেন্ডার, ভাষা, রাজনৈতিক বা ভিন্নমত, জাতীয় অথবা সামাজিক উৎস ((Origin), সম্পদ, জন্ম বা অন্যান স্ট্যাটাস নিরপেক্ষভাবে সমান।

অনুচ্ছেদ ১২ অনুযায়ী কোন ব্যক্তির পরিবার, গৃহ ও পত্র যোগযোগ এ সকল ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতামূলক হস্তক্ষেপ বা বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং তার সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত করা যাবে না। অনুচ্ছেদ ২৩, ২৪ ও ২৫ এ সকল শ্রমিকের সমান কাজে জন্য সমান মজুরি নীতির ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত মজুরির বিনিময়ে স্বাধীনভাবে কর্ম নির্বাচন, নির্ধারিত কর্মঘন্টা, সাময়িক ছুটিসহ বিশ্রাম ও বিনোদন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বসবাস, পরিবারসহ মানবিক মর্যাদার সাথে জীবনযাপন এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্মক্ষম প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্মের অধিকার হচ্ছে তার অধিকার, কর্তব্য এবং মর্যাদার বিষয় এবং শ্রমিকের প্রাপ্য পরিশোধের মূলনীতি হল শ্রমিকের সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মসম্পাদন এবং সম্পাদিত কাজ অনুযায়ী শ্রমের মুল্য পরিশোধ। অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের আশ্রয়লাভে সমঅধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩৪ এ সকল প্রকার জবরদস্তি শ্রম ((Forced Labour) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু সংবিধানে এসব মূলনীতির আলোকে গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে একটি নীতিমালা ছাড়া সুনির্দিষ্ট ও পরিপূর্ণ কোন আইনী কাঠামো পরিলক্ষিত হয়নি। অবশ্য কোন কোন আইনের বিচ্ছিন্ন কিছু ধারা রয়েছে। এ পর্যায়ে গৃহকর্মী নির্যাতন প্রতিরোধে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ইংঙ্গিত দেওয়া হলো:

গৃহকর্মী নির্যাতনের প্রায় প্রতিটি ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৪ (খ) ধারায় মামলা হয়। কিন্তু এ আইনটিতে আসামিদের সাজা দেয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। এ আইনে কেবল দাহ্য পদার্থ দ্বারা পুড়ে গেলে সাজার সুযোগ আছে। কিন্তু বেত্রাঘাত, গরম খুন্তি, লোহা, ইস্ত্রির ছ্যাঁকা গরম পানি ঢেলে দেয়া এ আইনে অন্তর্ভুক্ত হয় না। তাই গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় দন্ড বিধির (২৩, ২৪, ২৫, ২৬) ধারায় মামলা করলে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়।

গৃহভৃত্য নিবন্ধন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ তে বলা হয়েছে, ভৃত্য বা গৃহকর্মী নিয়োগের ১৫ দিনের মধ্যে নিকটস্থ থানায় এর নিবন্ধন করাতে হবে। এতে নারী ও শিশু পাচার রোধে মজবুত বিধান রাখান হয়েছিল। কিন্তু এ আইনটি বাস্তবে কার্যকর করা হয়না। তবে এ বিষয়ে The Prevention and Suppression of Human Trafficking Act. (Act. 3 of 12) নামে নতুন আইন করা হয়েছে।

গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা নামে একটি নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে সরকারের মন্ত্রিসভা। এর ফলে গৃহকর্ম শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং সবেতনে চার মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছাড়া ও অন্যান্য ছুটি ভোগ করতে পারবেন গৃহকর্মীরা। এই নীতিমালা অনুমোদন পাওয়ায় শ্রম আইন অনুযায়ী গৃহকমীরা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাবেন। নীতিমালায় গৃহকর্মীদের বিশ্রামের পাশাপাশি বিনোদনের সময় দেয়ার ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গৃহকর্মীদের শ্রমঘন্টা এবং বেতন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ঠিক করবে। শ্রমঘন্টা, বিশ্রাম ও বিনোদন সম্পর্কে নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৭.৪ এ বলা হয়েছে: প্রত্যেক গৃহকর্মীর কর্মঘন্টা এমনভাবে বিন্যস্ত করতে হবে, যাতে তিনি পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পান। গৃহকর্মীর ঘুম ও বিশ্রামের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্থান নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অনুমতি নিয়ে গৃহকর্মী সবেতনে ছুটি ভোগ করতে পারবেন।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে গৃহকর্মীর মজুরি নির্ধারিত হবে। পূর্ণকালীন গৃহকর্মীর মজুরি যাতে তার পরিবারসহ সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপনের উপযোগী হয় নিয়োগকারীকে তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে গৃহকর্মীর ভরণ পোষন, পোশাক পরিচ্ছেদ, দেয়া হলে তা মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে। তবে ১২ বছর বয়সের কাউকে গৃহকর্মী রাখতে হলে তার আইনানুগ অভিভাবকের সঙ্গে তৃতীয় কোনো পক্ষের উপস্থিতিতে নিয়োগকারীকে আলোচনা করতে হবে। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতিতে এই আলোচনা, চুক্তি, সমঝোতা বা ঐক্যমতের সময় নিয়োগের ধরন, তারিখ, মজুরি, বিশ্রামের সময়ও ছুটি, কাজের ধরন, থাকা খাওয়া, পোশাক, পরিচ্ছেদ এবং গৃহকর্মীর বাধ্যবাধকতা এসব বিষয়ের উল্লেখ রাখতে বলা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, অসুস্থ অবস্থায় কোনো গৃহকর্মীকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। নিয়োগকারীকেই নিজের অর্থে গৃহকর্মীর চিকিৎসা করাতে হবে। এছাড়া গৃহকর্মীকে তার নিজের ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে হবে। কর্মরত অবস্থায় কোনো গৃহকর্মী দূর্ঘটনার শিকার হলে চিকিৎসাসহ ক্ষয় ক্ষতির ধরন অনুযায়ী নিয়োগতকারীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

গৃহকর্মীর সঙ্গে অশালীন আচরন, দৈহিক বা মানসকি নির্যাতন করা যাবে না উল্লেখ করে নীতিমালায় ৭.১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: কোন ক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি কোনো প্রকার অশালীন আচরণ অথবা দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। গৃহকর্মীর উপর কোনো রকম হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারের উপর বর্তাবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যান মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী প্রদান করবে। নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা আগত অতিথিদের দ্বারা কোন গৃহকর্মী কোনো প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যেমন- অশ্লীল আচরণ, যৌন হয়রানি বা নির্যাতন কিংবা শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। গৃহকর্মী নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানা যেন দ্রুত ওকার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সে জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাপ্তরিক নির্দেশনা জারি করবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় গৃহকর্মীর প্রতি নির্যাতনের প্রতিকারে প্রয়োজনে আন্ত:মন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে হয়রানি ও যৌন নির্যাতন কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মামলা সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত হবে। যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের বিভাগের নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে।

গৃহকর্মী তার কর্মরত পরিবারের সদস্য বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ও বৃদ্ধ বা অন্য কোন সদস্যের প্রতি কোনরুপ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বা পীড়াদায়ক আচরণ করতে পারবে না। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে নিযোগকারী তার নিয়োগ বাতিল করতে পারবে এবং তার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। নিয়োগকারী পূর্ণকালীন গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ছবিসহ সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে পারবেন। নীতিতে যাই থাকুক না কেন গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারী মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে কোন বাধা কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।

কাউকে না জানিয়ে গৃহকর্মী চলে গেলে নিয়োগকারী সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করতে পারবেন। তবে অর্থ বা মালামাল নিয়ে গৃহকর্মী পালিয়ে গেলে সেক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন নিয়োগকারী। নিয়োগকারী পূর্ণকালীন গৃহকর্মী নিয়োগ দিয়ে তার ছবিসহ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে হলে এক মাস আগে জানাতে হবে। গৃহকর্মী ও যদি চাকরি ছেড়ে চলে চান; তবে নিয়োগকারীকে তা এক মাস আগে জানাতে হবে। তবে তাৎক্ষণিকভবে কেউ গৃহকর্মীকে চাকরি থেকে বাদ দিলে এক মাসে মজুরি দিয়ে বিদায় দিতে হবে। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি তদারকি সেল থাকবে।

গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা অনুমোদনের আগে Bangladesh National Woman Lawyers Association (BNWLA) এর একটি রিটের প্রেক্ষিতে গৃহকর্মীদের রক্ষায় ও আইনী শূণ্যতা পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের হাইকোর্ট সরকারের উদ্দেশ্যে একটি রুল জারী করে। ২০১১ সালে বিচারপতি এম ঈমান আলী ও বিচার পতি শেখ হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সরকারকে গৃহশ্রমসংক্রান্ত আইনানুগ কাঠামো তৈরিতে ১০টি নির্দেশনা দেন। এ রায়ের আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এটি বাস্তবায়িত হলে আইএলও সনদ ১৮৯ ও পরামর্শ ২০১ এর মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে।

নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১২ বছরের নিচের শিশুদের সব ধরনের শ্রমে (এমনকি গৃহশ্রমেও) নিয়োগ নিষিদ্ধ করা, ১৩-১৮ বছর বয়সের গৃহকর্মে নিযুক্ত শিশুদের নিয়মিত শিক্ষা অথবা কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা, গৃহকর্মীদের শ্রম আইনের অধীনে শ্রমিক সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করা এবং গৃহশ্রমিক প্রতিরক্ষা ও কল্যান নীতি, ২০১০-এর ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা, গৃহশ্রমিকের ওপর সহিংসতামূলক আচরণের মামলাগুলোর নিয়মিত তদারকি করা, নারী ও শিশুদের শহরে পাঠানোর আগে নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদে অভিভাবক কর্তৃক নাম ঠিকানা নিবন্ধন করা, গৃহকাজে নিয়োজিত গৃহকর্মীদের নিবন্ধন ও এ তথ্যগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সরকারের তরফ থেকে নিশ্চিত করা, প্রতি দুই মাস অন্তর একবার গৃহকর্মীদের শারীরিক সুস্থতার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে যত দ্রুত সম্ভব আইন প্রণয়ন করা, গৃহকর্মীদের কাজের সময়সীমা, বিশ্রাম, বিনোদন, বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সুদৃঢ় আইনি কাঠামো তৈরি করা। গৃহকর্মীরা গৃহকাজে নিযুক্ত অবস্থায় কোনো প্রকার অসুস্থতা, আঘাত অথবা দূর্ঘটনার শিকার হলে তাদের যথাযথ চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের নিশ্চয়তা অবশ্যই আইনে রাখা।

লেখক : পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।

 

 

 

0Shares





Related News

Comments are Closed