ছাতকে প্রাইমারি স্কুলগুলো শিশুবান্ধব হয়ে উঠছে
আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক থেকে: ছাতকে ২০টি সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়কে শিশু শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত উন্নয়ন ও মেরামতের টাকায় রঙিন করে তোলা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার শতাধিক স্কুলে-স্কুলে উন্নয়নে ছোঁয়া লেগেছে।
উপজেলার ছৈলা আফজলাবাদ ইউপির আয়না নদীর পুর্ব পাড়ে নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশ মুখ ও দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বাংলা-ইংরেজি বর্ণ। শ্রেণিকক্ষ ও ভবনের চারপাশে জাতীয় ফলমুল, দেশ-প্রকৃতি, ছোটদের মিনা কার্টুনসহ নানা মণীষীর ছবি। এমনিভাবেই রঙ-তুলির আঁচড়ে স্কুলগুলোকে শিশুবান্ধব করার সব রকম চেষ্টার কাজ চলছে।
উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে ২০টি স্কুল রঙিন সাজে সেজেছে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন ছোট বেলা থেকেই শিল্পমনা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে, জানছে দেশ-প্রকৃতি সমন্ধে। আরও বেশি করে স্কুলগামী হচ্ছে তারা।
সরেজমিন বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়গুলোকে রঙিন করে সাজানো হচ্ছে। রঙ তুলির ছোঁয়ায় বিদ্যালয়গুলো এখন যে কারো দৃষ্টি কাড়ে। অনেক স্কুলের আঙিনায় স্থাপন করা হচ্ছে শহীদ মিনার। অনেক বিদ্যালয়ের দেয়াল যেন রংধনুর সাতরঙে রাঙানো। মাঝে মাঝে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আঁকা ছবি। শিক্ষার্থীরা স্কুলে প্রবেশের আগে এসব ছবির মণীষীদের সাথে পরিচিত হচ্ছে প্রতিদিন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চারুশিল্পীরা দেয়ালে দেয়ালে এঁকেছেন ছোটদের মিনা কার্টুন, ফুল-ফল ও পশু-পাখির ছবি। এছাড়া প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আঁকা হচ্ছে বাংলাদেশের মানচিত্র ও গুণীজনের প্রতিকৃতি। লেখা আছে নানা ধরণের নীতিবাক্য। কোথাও পাশেই দাঁড়িয়ে গভীর মনযোগ সহকারে ছবি আঁকা দেখছে শিশু শিক্ষার্থীরা।
এখন পর্যন্ত উপজেলার ২০টি স্কুলে এমন আঁকিবুঁকির কাজ করা হয়। সরকারি স্লিপ ফান্ডের টাকা ব্যয়ে পর্যায় ক্রমে উপজেলার ১৫০টি স্কুলে এমন কাজ করা হবে বলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানান, শিশুদের শৈশবকে আক্ষরিক অর্থেই সাতরঙা করতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সূত্রটি একটি সরকারি জরিপের উল্লেখ করে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিভিন্ন কেজি স্কুল এবং নামি দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুকে ভর্তি করাতে চান অভিভাবকরা। কেবল নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রাহী হচ্ছে না। সব স্তরের শিক্ষার্থী টানতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ, ভবন সংস্কার, প্রাচীর তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিদ্যালয়ের ভেতর-বাহিরে চাকচিক্য করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মনিটরিং কর্মকতা জানান, প্রতিটি প্রাইমারি স্কুল পিইডিপি-৪ এর আওতায় স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (স্লিপ) অংশ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছে। তাছাড়া ছোট খাট মেরামতের জন্য অনেক বিদ্যালয় বরাদ্দ পেয়েছে। এ টাকায় গ্রাম ইউপির, উপজেলাগুলোর বিদ্যালয় শিশুবান্ধব করার কাজ চলছে। শিশুরা যেন আনন্দঘন পরিবেশে লেখা্পড়া করতে পারে সে উদ্যোগ নেয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে স্কুলগুলোর ভিতরে বাইরে সংস্কার চলছে, রঙ- তুলির কাজ চলছে। বিবর্ণ, মলিন স্কুলগুলো হয়ে উঠছে ঝকঝকে।
উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো হচ্ছে, বেরাজপুর, নোয়াপাড়া, গোবিন্দগঞ্জ মড়েল, ৪৭ নম্বার আলমপুর, লাকেশ্বর, কৃঞ্চনগর, জাউয়া, নোয়াগাও আব্দুল জব্বার, বাগইন, তাজপুর, উজিরপুর, নানশ্রীমিত্রগাও, মল্লিকপুর, খাসগাও, দক্ষিনকুশী, ৯১নং নোয়াগাও, লক্ষীপুর, সুলেমানপুর, শিবনগরসহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো শিক্ষক শিক্ষিকারা তাদের মনের মতো সাজিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারন সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, মাওলানা ফিরোজ আহমদ, মোস্তাক আহমদ, মাওলানা সামছুর রহমান, মানিক মিয়া, নুরুল হক, সালেহ আহমদ কবির, পুরবী রায়, জয়ন্তী রানী দেব নাথ, রেজ্জাদ আহমদ, আব্দুল বাসিদ, খলিলুর রহমান, সৈয়দা ফাতেমা বেগম, রহিমা বেগম, জমির আলী, জাকারিয়া, আছমা বেগম, রুকসানারা বেগম সহ অর্ধশতাধিক এলাকাবাসী জানান, সুন্দর মন, সুস্থ পরিবেশ খুব বেশি প্রয়োজন। স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হওয়ায় পড়া শোনায় মনযোগী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এতে শিশুরা বেশি করে স্কুলমুখী হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আনন্দের সাথে পড়াশোনা করছে তারা। এমন উদ্যোগে শিক্ষকরাও উদ্দীপ্ত।
বিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষার্থী মাহজাবীন মালিহা, সাগর, রুবেল, সুরাইয়া বলছিল, ‘এখন স্কুলে এসে আর বিরক্ত লাগে না। সাজানো গেছোনো বিদ্যালয়, এটা আমাদের জন্য খুব আনন্দ লাগে। একই সাথে এ স্কুলে লেখাপড়া করতে পেরে আমরা খুব বেশী খুশি। এখন স্যাররা যতক্ষণ ছুটি না দেয় ততক্ষন আমরা স্কুলে থাকি। স্কুল সুন্দর হয়েছে তাই আর স্কুল পালাতে ইচ্ছে করে না বলে তারা জানায়। যে দু’ চারজন যায় তারা ক্ষুধা লেগে যাওয়ার জন্য যায়।
এব্যাপারে নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক রেজ্জাদ আহমদ জানান, স্কুলকে রঙিন করলে একদিক থেকে যেমন বিদ্যালয়টি দৃষ্টি নন্দন হচ্ছে তেমনি শিশুদেরকেও আকর্ষণ করছে। বিদ্যালয়ে এখন শিশুরা আসে আনন্দ চিত্তে।
এব্যাপারে শিক্ষিকা হোসেনেয়ারা বেগম ও তার স্বামী আব্দুল লতিফ জানান, স্বপ্নের কোনো শেষ নেই। স্বপ্নের মতো করে রঙিন সাজে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সাজানো হচ্ছে। এতে ব্যাপকভাবে সাড়া দিচ্ছে শিশুরা।
এব্যাপারে শিক্ষিকা রহিমা বেগম ও শিক্ষক রেজ্জাদ আহমদ জানান,স্কুলকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলায় স্কুলের প্রতি শিশুদের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলে মনে হয়।
এব্যাপারে উপজেলার শ্রীনগর গ্রামে আবদুস সাত্তার জানান, কিছুদিন আগেও নোয়াপাড়া গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটি ছিল ভাঙাচোরা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ত শ্রেণিকক্ষে। আর এ কারণে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না যেতে নানা ফন্দি আঁটত। এখন স্কুলটি নানা রঙে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সাজানো হয়েছে গোটা স্কুল প্রাঙ্গণ। আর এতে শিশুরা নিজ উদ্যোগেই স্কুলে যাচ্ছেন প্রতিদিন।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা মাসুম মিয়া জানান, শিক্ষার্থীদের শিল্পমনা মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এবং স্কুলমুখী করতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্কুলে এমন পরিবেশ পেলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে আনন্দ পাবে। পড়াশোনায় মনযোগী হবে এবং ঝড়ে পড়া রোধ হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি অর্থায়নে স্কুলগুলোকে স্মার্ট স্কুলে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। স্কুলগুলোতে ভিন্নতাও আসছে। স্কুলগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করতে দেয়ালে নানা রঙের রং তুলি, ছবি ও কার্টুন আঁকা হয়েছে। যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হয়। শিশু শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠ দান করানো হচ্ছে। এতে শিশুদের এক ঘেয়েমি বা বন্দীদশা থাকছে না। স্কুলগুলো হয়ে উঠেছে শিশুদের জন্য আনন্দ মুখর।
Related News
সুনামগঞ্জে বৃদ্ধা ও যুবকের মরদেহ উদ্ধার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ডোবা থেকে এক বৃদ্ধা এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা থেকে একRead More
টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে পর্যটকের মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে এসে ট্যাকেরঘাট এলাকায় হার্ট অ্যাটাক করে আশিষRead More



Comments are Closed