Main Menu

ওসমানীনগর ট্রাজেডি, বাবা-ছেলের পর মেয়েও না ফেরার দেশে

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের ওসমানীনগরে অচেতন অবস্থায় উদ্ধারের পর মারা যান যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও তার ছেলে মাহিকুল ইসলাম। বাবা-ছেলের পর এবার মেয়ে সামিরা ইসলামও মারা গেছেন।

শুক্রবার (৫ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাপসাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাঈন উদ্দিন সামিরার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

গত ২৫ জুলাই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমোতে যান প্রবাসী পরিবারের ৫ সদস্য। তারা হলেন- যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম (৫০), তার স্ত্রী হুছনারা বেগম (৪৫), ছেলে সাদিকুল ইসলাম (২৫), ছোট ছেলে মাহিকুল ইসলাম (১৮), ও সামিয়া ইসলাম (২০)। তাদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম ও ছেলে মাহিকুল ইসলাম মারা যান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় অন্যদের ওসমানী ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে মা ছেলে সুস্থ হয়ে গত বুধবার বাসায় ফিরেন। কিন্তু ১১দিনেও ফিরেনি সামিরার জ্ঞান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিষক্রিয়ায় সামিরার কিডনী, লিভার কাজ করছিল না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের চিকিৎসায় বোর্ড গঠন করে। সামিরাকে বাঁচাতে প্রাণান্তর চেষ্টা করেও অজ্ঞান অবস্থায়ই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন তিনি।

এদিকে, সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে হুছনারা বেগম ও বড় ছেলে সাদিকুল ইসলাম জানতে পারেন বাবা-ছেলের মৃত্যুর খবর। দুই প্রিয়জনদের হারানোর যন্ত্রণায় ব্যাকুল মা ছেলের জন্য আরেক দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল সামিরার মৃত্যু।

স্থানীয়রা জানান, যুক্তরাজ্য থেকে গত ১২ জুলাই তারা দেশে আসেন। গত ১৮ জুলাই সিলেটের ওসমানীনগরের তাজপুরে একটি ফ্লাটের ২ তলার একটি ইউনিটে ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। মূলত ছেলের চিকিৎসার সুবিধার্থে বাসা ভাড়া করে তারা এখানে উঠেছিলেন।

স্বজনদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ২৫ জুলাই রাতের খাবার শেষে প্রবাসী রফিক মিয়া তার স্ত্রী সন্তানসহ একটি কক্ষে এবং রফিকুল ইসলামের শশুর আনফর আলী, শাশুড়ি বদরুন্নেছা, শ্যালক দেলোয়ার হোসেন, শ্যালকের স্ত্রী শোভা বেগম ও মেয়ে সাবিলা বেগম (৮) অন্যান্য কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন ২৬ জুলাই মঙ্গলবার সকালে বাসার সুস্থ স্বজনরা ডাকাডাকি করে প্রবাসী রফিকুল ইসলামসহ তার স্ত্রী-সন্তানরা ঘরের দরজা না খোলায় ৯৯৯ নম্বরে কল করেন।

২৬ জুলাই দুপুর ১টার দিকে ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজার হুলিয়ারবন্দ এলাকায় তাজপুর ইউপি চেয়ারম্যান ঝলক পালের মালিকানাধীন ভবনের ২য় তলার একটি ফ্লাট থেকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী পরিবারের ৫ সদস্যকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পুলিশ এসে বাসার দরজা ভেঙে তাদের অচেতন অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তবে বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হতে পারে এমনটি ধারণা করলেও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছাতে ভিসেরা প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

এদিকে, গত ৩ আগস্ট বুধবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ওসমানীনগরের তাজপুরস্থ স্কুল রোডের বাসায় ফিরে যান সামিরার মা হোসনে আরা বেগম ও ভাই সাদিকুল ইসলাম। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হলেও তাদেরকে আরও কয়েকদিন নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হবে বলে জানিয়েছেন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আবদুল গাফ্ফার।

তিনি জানান, গত ২৬ জুলাই অচেতন অবস্থায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম, ছেলে সাদিকুল ইসলাম ও মেয়ে সামিরা ইসলামকে ওসমানী হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় মা ও ছেলেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। কিন্তু সামিরার জ্ঞান ফিরেনি।

সামিরা কিডনি ও লিভারসহ কয়েকটি অঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয় বলে জানান ডা. গাফ্ফার।

এদিকে, গত বুধবার হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। তিনি হাসপাতাল ফেরত হোসনে আরা বেগম ও সাদিকুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসময় হোসনে আরা পুলিশ সুপারকে জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে বাসার ভেতর জেনারেটর চলতো। জেনারেটর চালুর পর তার ছেলে মাইকুল ইসলামের শ্বাসকষ্ট হতো। বাসায় জেনারেটর চালু করে পুলিশও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। জেনারেটর চালুর পর উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি উপলব্ধি করেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। পুলিশের ধারণা, ঘটনার রাতে দীর্ঘসময় জেনারেটর চালু থাকায় শ্বাস প্রশ্বাস নিতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও তার ছেলে মাইকুল ইসলাম মারা যান। অচেতন হয়ে পড়েন স্ত্রী ও অপর এক ছেলে ও মেয়ে। জেনারেটরের ধোঁয়ায় কী ধরণের বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে তা নিশ্চিতে ফায়ার সার্ভিসের কাছে আলামত পাঠানা হয়েছে। তবে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতে পুলিশ মারা যাওয়া পিতা-পুত্রের ময়নাতদন্ত ও ওই রাতে গ্রহণ করা খাবারের রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানান, সাধারণত বাসা-বাড়িতে জেনারেটর বাইরে থাকে। কিন্তু ওই বাসার ভেতরে জেনারেটর ছিল। পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য বাসার জেনারেটর চালু করা হলে কিছুক্ষণ পর উপস্থিত পুলিশ সদস্যদেরও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তাই ধারণা করা হচ্ছে ঘটনার রাতে দীর্ঘক্ষণ জেনারেটর চালু থাকায় ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে এই ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে। তবে এখনো নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। জেনারেটরের ধোঁয়া সংগ্রহ করে ফায়ার সার্ভিসের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই ধোঁয়া থেকে কি ধরণের বিষক্রিয়া তৈরি হতে পারে পরীক্ষার পর ফায়ার সার্ভিসের কাছ থেকে তা জানা যাবে।

এই ট্র্যাজেডির প্রকৃত কারণ জানতে মারা যাওয়া পিতা-পুত্রের ময়নাতদন্ত ও ওই রাতে গ্রহণ করা খাবারের রাসায়নিক প্রতিবেদন আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন।

প্রসঙ্গত, গত ১২ জুলাই রফিকুল ইসলাম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেন। এরপর ঢাকায় একসপ্তাহ থেকে গত ১৮ জুলাই তাজপুর স্কুল রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন । ২৫ জুলাই সোমবার রাতের খাবার খেয়ে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের নিয়ে বাসার একটি কক্ষে রফিকুল এবং অপর দুটি কক্ষে শ্বশুর, শাশুড়ি, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী ও শ্যালকের মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে বাসার অন্যান্য কক্ষে থাকা আত্মীয়রা ডাকাডাকি করে রফিকুলদের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ‘৯৯৯’ নাম্বারে ফোন দেন। খবর পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে ওসমানীনগর থানাপুলিশের একটি দল গিয়ে দরজা ভেঙ্গে অচেতন অবস্থায় পাঁচ যুক্তরাজ্য প্রবাসীকে উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রফিকুল ইসলাম ও মাইকুল ইসলামকে মৃত ঘোষণা করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাকি তিনজনকে হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে ভর্তি করা হয়।

Share





Related News

Comments are Closed