Main Menu

ভয়াবহ বন্যায় সিলেট-সুনামগঞ্জে ২০ লাখ মানুষ পানিবন্দী

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা ভয়ঙ্কর রুপ ধারন করেছে। কোথাও কোন ঠাঁই নেই। নগর থেকে অজোপাড়া গাঁ- সবখানেই অথৈ পানি। নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। পানির স্রোত অসহায়ত্বের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে। ভেঙ্গে যাচ্ছে কাঁচা ঘর-বাড়ী। পানির উপর ভাসছেন মানুষ, ভাসছে প্রাণীকুল। স্তব্ধ জাহাজের মতো যেন ভেসে আছে সিলেট। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বন্যার এমন লোমহর্ষক চিত্র দেখেননি সিলেটবাসী। মানবিক সংকটের এই দু:সময়ে মানুষের পাশে দাড়িয়েছে সেনাবাহিনী। আজ শনিবার থেকে নৌবাহিনীও উদ্ধার কাজে নামবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যা দেশের আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। উজান থেকে আসা ঢলে এই বিভাগের ৮০ শতাংশ এলাকা এখন পানির নিচে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের ৯০ শতাংশ এলাকা ডুবে গেছে। বাকি মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা শহরের কিছু উঁচু স্থান, পাহাড়ি এলাকা এবং ভবন ছাড়া সবখানে এখন পানি। আগামী দুই দিনে এই পানি আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভুইয়া বলেন, দেশের একটি বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ ডুবে যাওয়ার মতো বন্যা এর আগে বাংলাদেশে হয়নি। সিলেটে এর আগে যত বন্যা হয়েছে, তা মূলত হাওর এলাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার গ্রাম, শহর ও উঁচু এলাকাও পানির নিচে চলে গেছে। আর আগামি সোমবারের আগে এই পানি নামার সম্ভাবনা কম। কারণ, উজানে আগামী দুই দিন অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

এদিকে, বন্যা পরিস্থিতির ভয়ঙ্কর অবনতি হওয়ায় দেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সিলেট ও সুনামগঞ্জ। অধিকাংশ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে গেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে ও দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো সিলেটের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। হুমকীর মুখে পড়েছে সিলেটের কুমারগাঁওয়ের বিদ্যুতের গ্রিড লাইনের সাব স্টেশন। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ওসমানী বিমানবন্দর। ২০ জুন পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে সবকটি ফ্লাইট। স্থগিত করা হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। ক্যাম্পাস তলিয়ে যাওয়ায় শাবির ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে ভাসমান সিলেট বিভাগ কার্যত এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অনিশ্চয়তার এক জনপদে পরিণত হয়েছে।

যেদিকে চোখ যাচ্ছে মানুষের করুণ অসহায়ত্ব দেখা যাচ্ছে। প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় মানুষগুলো কোনরকম সড়কে উঠার আর্জি জানাচ্ছেন। আর সড়কে উঠতে পারলেই একটু আশ্রয়ের আশায় সিলেট শহরমুখী হচ্ছেন তারা। ইতিমধ্যে জেলা-উপজেলার আশ্রয় কেন্দ্রগুলো বানভাসী মানুষে ভরে গেছে। সিলেট নগরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও অসহায় মানুষে ঠাসা। নগর থেকে গ্রাম সর্বত্র খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি সংকট চরমে। অর্ধাহারে অনাহারে পানির সাথে যুদ্ধ করছেন সিলেট-সুনামগঞ্জের অন্তত: ২০ লাখ মানুষ। এমনটাই বলছেন প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা।

বসতবাড়িতে পানির প্রবেশ ঠেকাতে নগরের বাসিন্দারা ইট, সিমেন্ট ও বালুর দোকানে ভিড় করছেন। সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘরে বন্যার পানি প্রবেশ ঠেকাতে বাসিন্দারা ইট, সিমেন্ট ও বালুর দোকানে ভিড় করছেন। ঠেলাগাড়ি, রিকশায় করে বাসাবাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন নির্মাণসামগ্রী। নগরের শেখ ঘাট এলাকায় মেসার্স মুর্শিদ ব্রাদার্স নামের নির্মাণসামগ্রী বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, ইট, বালু ও সিমেন্ট কিনছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। ওই দোকানে ইট, সিমেন্ট ও বালু খুচরা বিক্রি করা হচ্ছিল।

সিলেট নগরের অন্তত অর্ধশত এলাকার পাশাপাশি জেলার কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সদর, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ২ হাজার গ্রাম বন্যার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে শুধু সিলেট জেলার কমপক্ষে ১০ লাখের বেশী মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় বেড়েছে জোঁক, সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব। চলাচলের জন্য মিলছে না নৌকা। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কেউ ঘরের বাইরে বেরোতে পারছেন না। একইসাথে সুনামগঞ্জেও প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

একাধিক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক উপচে পানি তীব্র বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে সীমিত পরিসরে যান চলাচল করছে। অন্যদিকে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় গোয়াইনঘাট উপজেলাও জেলা শহরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বিভিন্ন জেলা উপজেলার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পরশু বৃহস্পতিবার সকালেও যে সড়ক শুকনা ছিল শুক্রবার সেসব সড়ক বা স্থানে হাঁটুর ওপরে পানি। যেখানে হাঁটু পানি ছিলো সেখানে কোমর সমান পানি। পানি দ্রুত বেড়েই চলছে। এভাবে পানি বাড়তে থাকলে সিলেটের কোনো জায়গাই শুকনা থাকবে না’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সিলেটের নদীগুলোর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহমান রয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৩টার হিসাব অনুযায়ী, সুরমার পানি কানাইঘাটে ১২৮ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমার পানি ৭৭ সেন্টিমিটার, সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপষসীমার ১২০ সেন্টিমিটার, সারি নদীতে ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারার বিভিন্ন পয়েন্টেও নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

অপরদিকে, গোয়াইনঘাটের সারি নদী, গোয়াইন, সুনামগঞ্জের যাদুকাটাসহ সবকটি নদী বিপদসীমার উপরে প্রবাহমান রয়েছে। সময় যত যাচ্ছে পানি আরো বাড়ছে বলে জানা গেছে।

এ অবস্থায় বন্যা কবলিত সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় শুক্রবার দুপুর থেকে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে সেনাবাহিনী। দুই জেলার ৮ উপজেলায় সেনাবাহিনীর ৯টি ইউনিট কাজ করছে। নৌকা দিয়ে বাড়িঘর থেকে পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসছেন সেনা সদস্যরা।

সিলেট সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল হামিদুল হক গণমাধ্যমকে জানান, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সিলেটের ৩ উপজেলা ও সুনামগঞ্জের ৫ উপজেলায় সেনাবাহিনী পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারসহ পাঁচটি কাজে তৎপরতা শুরু করেছে। সিলেটের উপজেলাগুলো হচ্ছে সদর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ জেলার সদর, দিরাই, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ।

এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের গণসংযোগ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুৎ স্টেশন এলাকা বন্যাকবলিত হওয়া ঠেকাতে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি অবলোকন করে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে সিলেট জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেন।
মেজর জেনারেল হামিদুল হক আরও জানান, সিলেট কুমারগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি ওঠে বিদ্যুৎ সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকটি খাদ্য গুদাম হুমকিতে রয়েছে। এগুলো রক্ষায়ও সেনা সদস্যরা কাজ করছেন।

এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) সিলেট বিক্রয় ও বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল কাদির জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে জিও ব্যাগ ফেলে সিলেটের কুমারগাঁও বিদ্যুতের গ্রিড উপকেন্দ্রে পানি প্রবেশ ঠেকাতে কাজ করছেন। তাঁদের সঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা কাজ করছেন।

Share





Related News

Comments are Closed