Main Menu

সিলেটে এক সাথে দুই বোনের মৃত্যু নিয়ে রহস্য!

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: সিলেট নগরীর এয়ারপোর্ট থানাধীন মজুমদারী কোনাপাড়া এলাকায় বাসার খোলা ছাদে গলায় ওড়না পেচিয়ে দুই বোনের মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মৃতরা হচ্ছে- ওই এলাকার মৃত কলিম উল্যাহর কন্যা রানী বেগম (৩৮) ও ফাতেমা বেগম (২৭)।

এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের জানান, কোনাপাড়া ৩১ নম্বর বাসায় দুই বোন প্রায়শ ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হতো। সোমবার দিবাগত রাত ৯টা হতে ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে বাসার খোলা ছাদে রডের সাথে ওড়না পেছিয়ে তারা আত্মহত্যা করেছে মর্মে পুলিশ ধারণা করছে। খবর পেয়ে এয়ারপোর্ট থানার ওসি খান মো: মঈনুল জাকিরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরীর পর লাশ দুটি উদ্ধার করে। লাশ দুটি ময়না তদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।

আশরাফ উল্যাহ তাহের জানান, এটি হত্যা না আত্মহত্যা-পুলিশ এটি তদন্ত করে দেখছে। এ বিষয়ে আইনানুগ পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দুই বোনের লাশ উদ্ধারের পর প্রতিবেশী বা স্বজনদের সাথে কথা বলে যেটুকু জানা গেছে তাতে বিয়ে শাদি নিয়ে একটা হতাশা থাকতে পারে। তাঁদের সকলের অনেক বয়স হলেও এখনো বিয়ে হচ্ছে না। তাছাড়া এরা নানা কারণে অনেকটা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে আমরা এখনই কোন বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারছিনা। আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত প্রয়োজন।

এদিকে দুই বোনের লাশ উদ্ধারের ব্যাপারে আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মফিজুল ইসলাম বলেন, সকাল ৬ টার দিকে আশপাশের লোকজন জানালা দিয়ে তাদের দুই বোনের লাশ বাসার ছাদের রডে ঝুলে থাকতে দেখে চিৎকার শুরু করেন। তখন আমাদের খবর দেওয়া হয়। আমরা গিয়ে দেখি নিজেরা ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে। তখন লাশগুলো উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক ভাবে এটি আত্মহত্যা হিসেবেই মনে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা কিছুটা মানসিক ভাবে অস্বাভাবিক ছিলেন। কারো সাথে তেমন মিশতেন না। কোন মোবাইল ফোনও নেই। বাসায় ল্যান্ড ফোন আছে। এক বোনের বিয়ে হলেও অন্য ভাই-বোনের অনেক বয়স হলেও বিয়ে হচ্ছে না। তাছাড়া প্রতিবেশী কারো সাথে তেমন সম্পর্ক নেই। সব মিলে মানসিক সমস্যা থেকেই তারা হয়ত আত্মহত্যা করে থাকতে পারে। তবে বিস্তারিত তদন্ত করে বের করা হবে। আরও কোন কারণ আছে কি না সেটাও জানা যাবে।

তবে ঘটনার পর থেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের আচরণ সন্দেহজনক বলে জানিয়েছেন এলাকার কাউন্সিলর। তাই তিনি ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদি বলেন, পরিবারের সদস্যারা একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছে। ফলে পুরো বিষয়টা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।

তিনি জানান, মৃত কলিম উল্লাহর মেয়ে রানী বেগম নবম শ্রেণি এবং তার বোন ফাতেমা বেগম মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। এছাড়া নিহতদের আপন চার বোনের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছে। তিনি যুক্তরাজ্যে থাকেন। বাকিদের বিয়ে হয়নি।

তিনি বলেন, ‘তাদের চাচাতো ভাই আমাকে যেটা বললেন যে, কাল (সোমবার) রাতে নাকি দুই বোন দা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে চাচার বাসায় যান। তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, তাদের সমস্যা কী হয়েছে? চলো, আমিও তোমাদের বাসায় যাবো। তখন ওই দুই বোন নাকি বলেছে, তুমি যেও না; গেলে তোমাকেও তারা মারবে। এই ‘তারা’ আসলে কারা? কে তাদেরকে মারতে চেয়েছিল?”

লোদী বলেন, ‘এই বাসায় কাল (সোমবার) রাতে আসলে কী হয়েছিল, কেনইবা তারা আশ্রয়ের জন্য বেরিয়ে গিয়েছিল, তাদের হাতে দা কেন ছিল, এরপর আশপাশের লোকজন ভোরে তাদেরকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছাদে দেখতে পায়। বিষয়টি নিয়ে আসলে আমি বলতে পারবো না, বলাটা সমীচীনও হবে না। ময়নাতদন্তের পরই জানা যাবে, আসলে কী হয়েছিল। তদন্তসাপেক্ষে আসলে বেরিয়ে আসবে, এই ঘটনার সাথে কারা জড়িত, কী কারণে ঘটনাটি ঘটেছে, কারাইবা তাদেরকে কাল রাতে বাসা থেকে বের হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, কেনইবা তাদের হাতে দা ছিল, তা পরিষ্কার হবে।’

কাউন্সিলর লোদী বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী মনে হয়েছে। তারা তাদের বক্তব্যে একই জায়গায় থাকছেন না। তারা এই এলাকার আদি বাসিন্দা, কিন্তু এলাকায় তাদের সেরকম কোনো সামাজিক সম্পর্ক নেই। একধরনের আইসোলেটেড জীবনযাপন করে তারা। ঘটনাটি শুনে আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।’

এ ব্যাপারে নিহতদের ভাই শেখ সুজন বলেন, সোমবার আমার বোন রানিকে দেখতে এসেছিলেন। এরপর সে রাগ করে ছোটবোনকে নিয়ে চাচার বাসায় চলে যায়। রাতে বাসায় ফিরেনি। সকালে প্রতিবেশীরা ছাদে দুজনের ঝুলন্ত মরদেহ দেখে আমাদের খবর দেন। তখন আমরা দৌড়ে ছাদে যাই। গিয়ে দেখি দুজনের ঝুলন্ত মরদেহ। আমি মরদেহ নিচে নামাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সবাই বলেন, পুলিশ আসুক।’

তিনি বলেন রানী ও ফাতেমা ঘরে দরজা লাগিয়ে শুধু ক্রাইম পেট্রলসহ বিদেশি টিভি চ্যানেলের সিরিয়ালগুলো দেখতেন- এমনটি উল্লেখ করে রাজন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল গত রোববারে। বরের বয়স একটু বেশি, পঞ্চাশ। লন্ডনি, দুই বাচ্চার বাবা। সে (রানী) বিয়েতে রাজি নয়, ঘরে ঝগড়া করছিল। আমরা তাকে বলি- বিয়ের প্রস্তাব মাত্র এসেছে, বিয়ে তো আর হয়ে যায়নি। আস্তে আস্তে কনে দেখাবো; হলে হলো, না হলে নাই।’

রাজন বলেন, ‘এ নিয়ে সে ঝগড়া করে মায়ের সাথে। বোনের সাথেও ঝগড়া করে। সোমবার ঝগড়া করে সে চাচার বাসায় (একই এলাকায়) চলে যায়। প্রায়ই ঝগড়া হলে এভাবে চাচার বাসায় চলে যায়, সেখানে থেকে আসে। আমরা ভেবেছি, চাচার বাসা থেকে সে সকালে আসবে। এই পর্যন্ত আমাদের শেষ।’

এক প্রশ্নের জবাবে রাজন বলেন, ‘তারা রাগ করে এমন কাজ করেছে। আমার যে বড় বোন রানী, তার খুব বেশি রাগ। তার মাথায় সমস্যা আছে। সে ভালো মানুষ এলেও ঝগড়া করে, আত্মীয়স্বজন এলেও ঝগড়া করে। ডাক্তার বলেছে- তার মাথায় সমস্যা, তাকে নিয়ে কেউ কোথাও যেও না।’

‘সে (রানী) আমার আরেক বোনকে (ফাতেমা) নিয়ে মরার কথা বলেছিল। সে বলেছিল, মরবো যখন গা-ঘর জ্বালিয়ে মরবো। বিয়ের আলাপ আসায় তার হিংসে ঢুকেছে যে, আমি বিয়ে করবো কেন। তার মাথা গরম হয়ে যায়। সে নিজে নিজে ফাঁসি লাগিয়ে আমার বোনকে নিয়ে মরেছে।’

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, দুই বোনের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া হতো। এছাড়া তাদের পরিবারে প্রায় সময় পারিবারিক কলহ লেগেই থাকতো।

 

Share





Related News

Comments are Closed