Main Menu

চীন ভারত দ্বন্দ, বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ কর্তা হওয়া?

আতিকুর রহমান: বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির পাতা খুললেই ভারত-চীন দ্বন্দ আমাদের চোখে ফুটে উঠে। এই দ্বন্দ প্রতিনিয়ত ব্যক্তিগত দ্বন্দ ছাড়িয়ে,আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভীষণ প্রভাব ফেলছে।
তাদের এই দ্বন্দের সর্বশেষ উদাহরণটি আমরা দেখতে পাই, গালওয়ান উপতক্যায় সংঘটিত দুই দেশের সৈন্যদের মুখোমুখি সংঘর্ষে, যেখানে ২০ জনেরও অধিক সৈন্য মৃত্যুবরন করেন।তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন, এক সময়ের বন্ধুপ্রতীম দুই দেশ হঠাৎ কেন শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠল!

সু-প্রাচীনকাল থেকে চৈনিক সভ্যতার সাথে সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মিল আছে। বলা হয়ে থাকে বৌদ্ধ ধর্ম ভারত থেকে চীনে প্রচলন হয়েছে, ইভেন উভয় দেশ বৃটিশ শাসনের ভুক্তভোগী প্রথমদিকে চীন, ভারতের মধ্যে সম্পর্ক এতই অন্তরঙ্গ ছিল যে, নেহেরু যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন একটি উক্তি প্রচলিত ছিল, ‘হিন্দি চিনি ভাই ভাই’।

জাতিসংঘ থেকে ভারতকে ভেটো ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তাব দিলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। নেহেরুর এই সিদ্ধান্ত আজও ভারতবাসীকে পুড়ায় নেহেরুর বক্তব্য ছিল ভারত শান্তিপূর্ণ দেশ, ভারতের ভেটো ক্ষমতার প্রয়োজন নেই। আর চীন এ সুযোগ গ্রহন করে এবং এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হয়।

মাও শাসন কালীন সময়ের প্রভাবশালী নেতা ডিং জিয়াও পিং জাতিসংঘে বক্তব্য কালে বলেছিল, “চীন কখনো বিশ্বের সুপার পাওয়ার হতে চায় না, কোন দিন হবেও না, যদি চীন কখনো সুপার পাওয়ার হতে চায় তাহলে ভেবে নিও চীন তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়েছে। তখন চীনের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে পুরো বিশ্ব যেন চীনকে রুখে দেয়”।

তার এই বক্তব্যই প্রমাণ করে চীনে নীতি ছিল অন্তর্মুখী। কিন্তু সময়ের পথ পরিক্রমায় চীন আজ পৃথিবীর সুপার এক নাম্বার পাওয়ার হওয়ার দ্বার প্রান্তে।

১৯৪৭-৬২ সাল পর্যন্ত ভারত তার প্রতিবেশী দেশ গুলোর সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। নেহেরু সরকার ‘পাঞ্চশীল’ নামক প্রোগ্রামের পরিকল্পনা করে যা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি।

কিন্তু দুই দেশের বর্তমান রাজনীতিবিদের অদক্ষতা আর স্বার্থপর নীতির কারনে সে সম্পর্ক আজ পুনরায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

আজ ভারতের থেকে চীন শতমাইল সামনে এগিয়ে। সেটা হোক অর্থনীতি,শিক্ষা, গবেষনা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। চীন সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও দুই দেশেরই আছে পারমানবিক অস্ত্র।

চলুন দেখে নেয়া যাক, বন্ধুপ্রতীম এই দুই দেশের সম্পর্ক কিভাবে তিক্ততায় পৌছাল।চীন ভারত সম্পর্কের অবনতির প্রধান কারন সিমান্ত সমস্যা। ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৩৮৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সীমানা রয়েছে চীনের,যাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অমিমাংশিত সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

দুই দেশেই বৃটিশদের অধীন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৮৪০-এর দশকে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসে চীন। ১৯শ শতকে অভ্যন্তরীণ বিপ্লব এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের ফলে চীনের শেষ রাজবংশ কিং রাজবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯১১ সালে চীনা জাতীয়তাবাদীরা শেষ পর্যন্ত এই রাজতন্ত্রের পতন ঘটায়। এর আগে ১৯২৮ সালে জাতীয়তাবাদীরা প্রজাতান্ত্রিক চীন প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে এবং চীনের মূল ভূখণ্ডে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

অপরদিকে ভারতের কথাতো জানাই আছে। সমস্যার সূত্রপাত হয় যখন, ব্রিটিশরা ১৯১৩ সালে সিমলা চুক্তি করে একটি সীমান্তরেখা একেঁছিল, ম্যাকমোহন লাইন এবং অন্যান্য লাইন।চীনকে ওই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করায় , সেটা চীন কখনো মানেনি। কিন্তু ব্রিটিশদের চিহ্নিত সেই সীমারেখাই ভারত বরাবার দাবি করেছে।

কিন্তু চীনের হিসেব অনুযায়ী অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সীমান্তরেখা ছিল, তাতে অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখের কিছু অংশ তৎকালীন চীন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কাজেই দুপক্ষের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে।

শুধু তাই-ই নয়,১৯৪৭ সালে ভারত সরকার মার্কিন বিমানবাহিনীকে ৬টি বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। এই ঘাঁটিগুলো থেকে মার্কিন বাহিনী চীনের ভেতর কমিউনিস্ট বাহিনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এর পাশাপাশি ১৯৫০ সালে যখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বা গণপ্রজাতন্ত্রী চীন তিব্বত পুর্নদখল করে, তখন সেখানে একটি গেরিলা গোষ্ঠী চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালায়। এই গেরিলা গোষ্ঠীকে গোপনে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র মদত যুগিয়েছিল।

১৯৫৯ সালে গণচীনের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের স্বাধীকারের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়। তখন দলাই লামার নেতৃত্বে অসংখ্য তিব্বতি ভারত সরকারের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় বসবাস আরম্ভ করেন। সেখানেই ভূতপূর্ব স্বাধীন তিব্বতের নির্বাসিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যা চীন ভাল চোখে দেখেনি।

আর এর প্রেক্ষাপটেই কিন্তু ১৯৬২ সালের যুদ্ধ হয়েছিল। যেখানে চীন আকশাই চীন দখল করে।এছাড়া অরুণাচল প্রদেশকেও চীন নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে থাকে।
এছাড়া ব্রক্ষপুত্র নদ নিয়েও ভারত ও চীনের সম্পর্ক চিড় ধরার অন্যতম কারন।কেননা চীন ব্রক্ষপুত্র নদে বাঁধ দেয়ার পরিকল্পনা করছে।

তাছাড়া চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্প এবং পাকিস্তানের সাথে চীনের অতি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভারতের মাথা ব্যাথার কারন।কেননা এই প্রকল্পের আওতায় ভারত সংলগ্ন পাকিস্তান সীমান্তে প্রচুর স্থাপনা নির্মান করছে চীন।যা ভারতের নিরাপত্তায় হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে।

পাশাপাশি মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বঙ্গোপসাগর এর তীরে বন্দর নির্মান,পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর,শ্রীলংকার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে চীন।এর মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হচ্ছে।এটিও ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে।যা ভারত চীন সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আরেকটি কারন।

এছাড়া তাইওয়ান এর সাথে ভারতের গভীর বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনীতিক সম্পর্ক সাধনের চেস্টা সম্পর্ক অবনতির আরেকটি কারন, কেননা তাইওয়ানকে চীন নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগর কেন্দ্রিক আমেরিকা,অস্ট্রেলিয়া, জাপান এর জোট ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নে ভারতের যোগ দিতে চাওয়া, চীনের প্রতিষ্ঠিত আসিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগর কেন্দ্রিক কয়েকটি দেশের বাণিজ্য জোট RCEP তে ভারতের যোগ দেয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা না করা দুই দেশের সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার অন্যতম কারন।

এভাবে একে একে বিপদজনক গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারর ও চীন।তারা উভয়ই মনে করছে,আধিপত্য বিস্তারের এ মাঠের লড়াইয়ে তারা লাভবান হবে।বরং তারা যে আশা করেছিল তার কিছুই পাবে না।

বরং তারা নিজেদেরকে নিজেদেরই আপন সীমানায় কোণঠাসা করার চেস্টা করছে। যা শুধু তাদের নিজেদেরই নয়,পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন দেখা যাক, আমাদের দুই বন্ধুপ্রতিম পারমানবিক শক্তিধর দেশ কি সিদ্ধান্ত নেয়…!!!

আর আমার মতো সাধারন মানুষের একটাই প্রত্যাশা, “শুভ বুদ্ধির উদয় হোক দুই দেশের।”

লেখক: শিক্ষার্থ, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

0Shares





Related News

Comments are Closed