Main Menu

আসামের এনআরসি থেকে বাদ ১৯ লাখ মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশ করা হয়েছে। এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্তি হয়েছে এবং বাদ পড়ছে ১৯ লাখের বেশি মানুষ।

শনিবার (৩১ আগস্ট) সকাল ১০টায় এনআরসি সেবা কেন্দ্র ও সরকারি ওয়েবসাইটে বহু প্রতিক্ষীত এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।

জানা গেছে, ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনের নাম বাদ পড়েছে ওই চূড়ান্ত তালিকা থেকে। তবে গত বছরের ৩০ জুলাই ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন্স (এনআরসির) তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল প্রায় ৪০ লাখ আবেদনকারীর নাম। এরা সবাই বাঙালি এবং বেশিরভাগই মুসলিম। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল তাদের।

চলতি বছরেও প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার আবেদনকারীর নাম বাদ পড়েছে। এনআরসির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি না হয় সে কারণে আসামজুড়েই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই গুয়াহাটিসহ রাজ্যের উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।

এনআরসি তালিকায় নাম উঠেছে কিনা তা এনআরসি সেবা কেন্দ্র অথবা সার্কেল অফিসারের অফিস কিংবা ডেপুটি অফিসারের অফিসে গিয়ে দেখা যাবে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে এই তালিকা দেখা যাবে।
এনআরসির ওয়েবসাইটে গিয়ে এআরএন নম্বর টাইপ করেও দেখা যাবে নাম আছে কিনা। আবেনদনকারীদের জন্য বিশেষ টোল ফ্রি নম্বরেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে (আসামের জন্য-১৫০১৭, আসামের বাইরের জন্য ১৮০০৩৪৫৩৭৬২) ।

আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স বা এনআরসির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। সেটা ছিল ভারত ভাগের চার বছর পর। সে সময় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর লাখ লাখ লোক সীমান্ত অতিক্রম করে নবগঠিত ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

বিপুল সংখ্যক মুসলমানদের আগমন হিন্দু-প্রধান আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানকার অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে এবং নাগরিকত্বের প্রথম তালিকাটি তৈরি হয়।

এই সমস্যা আবার দেখা দেয় ১৯৭০ সালে যখন বাংলাদেশে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয়। সে সময় লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে ভারতে চলে যায়। এদের একাংশ আসামে আশ্রয় নেয়।

অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) ১৯৭৯ সালে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। এতে দুই হাজার সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসী প্রাণ হারান। এদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলমান।

আসু এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল এই প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসে। ওই চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে আসামের বাসিন্দা, কেউ এমনটা প্রমাণ করতে না পারলে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে। আর তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি কখনই বাস্তবায়ন করা হয়নি।

অভিজিৎ শর্মা নামের এক ব্যক্তি ২০০৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোটের কাছে এক পিটিশন দায়ের করেন এবং এনআরসি তালিকা হালনাগাদ করার আবেদন করেন।

২০১৪ সালে আদালত ওই তালিকা ২০১৬ সালের ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে হালনাগাদ করার জন্য কেন্দ্র সরকারকে আদেশ দেয়। কিন্তু এটা ছিল দুঃসাধ্য। কারণ এতে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের দলিলপত্র যাচাই করার ব্যাপার রয়েছে। এই কাজ শেষ করে সরকার ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করে।

যাচাই বাছাইয়ের পর ওই খসড়ার দ্বিতীয় তালিকাটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই। এনআরসিতে যাদের নাম রয়েছে তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে তারা আসামে এসেছেন।

নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাজ্যের সব অধিবাসীকে তাদের জমির দলিল, ভোটার আইডি এবং পাসপোর্টসহ নানা ধরনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়েছিল। এনআরসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে যে, তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু লোকের কাছে তারা চিঠি পাঠিয়েছে এবং কাছের অফিস বাদ দিয়ে বহু দূরের অফিসগুলোতে গিয়ে তাদের কাগজপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

স্থানীয় ভারতীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, তারা মুসলমানদের লক্ষবস্তুতে পরিণত করছেন না। তবে এনআরসির প্রধান প্রতীক হাজেলা বিবিসির কাছে স্বীকার করেছেন যে, যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তারা ভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষ।

তালিকায় নাম না থাকলেও অবশ্য এখনই ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে না। এক হাজার ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল খোলা হয়েছে। যেখানে গিয়ে ১২০ দিনের মধ্যে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণে তথ্য পেশ করতে পারবেন।

অবৈধ অভিবাসীদের ভারত থেকে বের করতে আসাম রাজ্যের নাগরিক তালিকা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর একেই মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আসামের অবৈধ অভিবাসীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে উল্লেখ করেন। আসামের পর ভারতজুড়ে একই প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব কার্ড ইস্যুর নিয়ম চালুর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন অমিত শাহ। এ বছরের জুনে প্রকাশ করা হয় এনআরসির খসড়া তালিকা। বাদ পড়েন প্রায় ৪০ লাখ মুসলমান।

২০১০ সালে যখন এনআরসির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়, তখন থেকেই আন্দোলন শুরু হয় আসামে। বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন কয়েকজন। তালিকায় যাদের নাম আসবে না, তারা ১২০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আপিলেও এনআরসিতে নাম না এলে বাতিল হবে নাগরিকত্ব। এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি লোককে আসামের কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে।

যারা নাগরিকত্ব হারাবেন, তাদের বন্দিশিবিরে নেওয়া হতে পারে। আইনি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন আসামের সংখ্যালঘু ও মুসলিম জনগোষ্ঠী।

এদিকে, নাগরিকত্ব হারানো মানুষদের বন্দিশালায় রাখার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে আসামের ছয়টি কারাগারকে বন্দিশালায় রূপান্তর করা হয়েছে। গোয়ালপারা, ধুবড়িগড়, জোরহাট, শিলচর, কোকড়াঝড় এবং তেজপুর জেলায় জেলগুলোকে বানানো হয়েছে বন্দিশালা। এসব এলাকায় বাঙালিদের বসবাসও বেশি। তড়িঘড়ি করে আরও ১০টি বন্দিশালা নির্মাণের তোড়জোড় চলছে এখন। সেগুলোর কাজও শুরু হয়ে গেছে। আগের ছয়টির মতোই এই বন্দিশালাগুলো প্রস্তুত হচ্ছে বারপেটা, দিমা হাসাও, কামরূপ, করিমগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নওগাঁ, নালবাড়ি, শিবসাগর, সোনিতপুর জেলায়। শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে সে ছবিও প্রকাশিত হয়েছে।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পরই ভারত থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের বের করে দেওয়ার কথা জানায়। দলটির নজর পড়ে আসামে। বিজেপি প্রচার করে, বাংলাদেশ থেকে ‘অবৈধ’ভাবে বাংলাদেশের নাগরিকরা আসামে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে। ২০১৬ সালে রাজ্যটিতে বিজেপি জোট সরকার গড়ে আসাম গণপরিষদ ও বোডোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টের সঙ্গে। উগ্র আসামীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধার কারণে বিজেপির ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্বে’ জোর হাওয়া লাগে। ১৯৮০-এর দশক থেকে বাঙালি ‘অনুপ্রবেশে’র বিষয়ে সরব আসাম গণপরিষদ। এর ফলে আসামে এনআরসির সিদ্ধান্ত হয়। গত চার বছর ধরে সেখানকার বাঙালিরা নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন। অথচ তাদের চৌদ্দপুরুষের বাস আসামেই।

Share





Related News

Comments are Closed