Main Menu

ভূমধ্যসাগরে সিলেটি ৯ যুবকের সলিল সমাধি

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: চার দেশ ঘুরেও ইতালিতে পৌছা হলো না সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের চার যুবকসহ ৯ জনের। এরধ্যে ৩ জন একই পরিবারের। তারা হলেন ফেঞ্চুগঞ্জ উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়নের মুহিদপুর গ্রামের আবদুল আজিজ, লিটন মিয়া ও আহমদ হোসেন। নিখোঁজের তালিকায় আরো রয়েছেন গোলাপগঞ্জের দুই জন, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার একজন ও হবিগঞ্জ সদরের দুইজন। এরা সকলেই গত ৯মে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের অথৈ জলে ডুবে প্রান হারান।

সাগরে নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন- সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কটালপুর এলাকার মুয়িদপুর গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে আবদুল আজিজ (২৫), একই গ্রামের মন্টু মিয়ার ছেলে আহমদ (২৪), সিরাজ মিয়ার ছেলে লিটন (২৪), উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের ভেলকোণা গ্রামের ওয়ারিছ আলী আয়াজ আহমদ (২৮), ফেঞ্চুগঞ্জের দিনপুর গ্রামে নানাবাড়ীতে বসবাসকারী গোলাপগঞ্জ উপজেলার মানিকোণা হাওরতলার মৃত রফিক উদ্দিনের ছেলে আফজাল মাহমুদ (২৫), গোলাপগঞ্জ উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর গ্রামের ইয়াকুব আলীর ছেলে কামরান আহমদ মারুফ (২৩), মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল গ্রামের বাসিন্দা আহসান হাবিব শামীম (১৯), হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লেকড়া গ্রামের হাজি আলা উদ্দিনের ছেলে আবদুল কাইয়ুম (২২) ও আবদুল জলিলের ছেলে আবদুল মোক্তাদির (২২)। তারা দু’জনই হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের অনার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন।

সাগরে নিহত ফেঞ্চুগঞ্জের আজিজ আহমদের বড় ভাই মফিজ আহমদ বলেন, নিহতদের মধ্যে লিটন তার আপন চাচাতো ভাই। আর আহমদ হোসেন ফুফাতো ভাই। গত শনিবার বিকেলে তাদের মৃত্যুর খবর জানান তিউনিশিয়ায় সাগরে নৌকা ডুবি থেকে বেঁচে যাওয়া তার চাচা বিলাল আহমদ। উদ্ধার হওয়া তার চাচা বিলাল ১১ঘন্টা সাগরে ভেসেছিলেন। পরে মাছ ধরার ট্রলারে জেলেরা তাদের কয়েকজনকে উদ্ধার করে তিউনিশিয়া উপকূলে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

তিনি বলেন, গত বছরের ৪ ডিসেম্বর সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশন মার্কেটের ইয়াহিয়া ওভারসীজের মাধ্যমে তাদের ইতালি পাঠানোর জন্য জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা করে চুক্তি হয়। কথা ছিল সরাসরি ফ্লাইট দেবে। কিন্তু তাদের তিন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়াতে নিয়ে রাখা ৫ মাস। এই সময়ে ৩/৪ দিন পরপর তাদের খেতে দেওয়া হতো।

মফিজ আহমদ বলেন, কয়েকদিন আগে কথা বলেছিলাম, না খেয়ে তাদের মুখের ভাষায়ও পরিবর্তন হয়ে গেছে। ট্রেভেলসের মালিক এনাম আহমদের কাছে মানুষ ফেরত চাইলেও ওদের জিম্মি রেখে আরো ৩ লাখ টাকা করে বাড়তি আদায় করেছে। এখন আর কিছুই প্রয়োজন নেই, কেবল ভাইদের মরদেহ ফেরত চান তিনি।

সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া বিলাল আহমদের বরাত দিয়ে মফিজ আহমদ আরো বলেন, ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী এনাম বলেছিলেন, তাদের জাহাজে পাঠানো হবে। কিন্তু পাঠানো হয়েছে নৌকাতে। আর ৪০ জনের নৌকায় তুলা হয়েছিল ৮০ জন।

নিহত লিটন মিয়ার শোকে আর্তনাদ করা তার বাবা সিরাজ মিয়া খানিকটা কথা বলেন গণমাধ্যমের সামনে। তিনি বলেন, সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া তার ভাই গত শুক্রবার বিকেলে প্রায় ৪ মিনিট কথা বলেছে। সে কাদছে, আর বলছে আমার চোখের সামনে তিন সন্তান (ভাতিজারা) ভেসে গেছে। ওদের মৃত্যু না হয়ে আমার কেন মৃত্যু হলো না-বিলাপ করে বলছে বিলাল। সে নিজেও ১১ ঘন্টা সাগরে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। জেলেরা তাকে উদ্ধার করে তিউনিশিয়ায় নিয়ে গেছে। সেখানে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। ছেলেদের মরদেহ কোথায় কিছুই জানেনা সে।

তিনি বলেন, দালালচক্র প্রথমে তাদেরকে নিয়ে যায় ভারতে। সেখানে কিছুদিন রেখে নিয়ে যায় শ্রীলংকায়। এরপর শ্রীলংকা থেকে লিবিয়া। এভাবে তাদের নিয়ে যাওয়ার খবর কয়েকদিন ধরে শুনতেছি। এভাবে পাঠাবে জানলে আমার সন্তানকে পাঠাতাম না। এলাকার লোকজন জানান, ছেলেগুলো খুবই ভাল ছিল। তারা ইউরোপ যাওয়ার জন্য দালালের খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে। নিহতদের মরদেহগুলো উদ্ধার করে পরিবারের কাছে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তারা।

৪নং কুশিয়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কুতুব উদ্দিন জানান, আমরা চাই ছেলেগুলোর মরদেহ ফেরত আনতে সরকার যেনো ভুমিকা রাখে। অন্তত তাদের পরিবার যেনো স্বজনদের মরদেহগুলো ফেরত পায়।

এদিকে, ঘটনার খবর জানতে পেরে ইয়াহিয়া ওভারসীজ বন্ধ করে পলাতক রয়েছেন মালিক। গত শনিবার সকাল থেকে ট্রাভেলসটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান মার্কেটের লোকজন।

ফেঞ্চুগঞ্জ উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহমেদ জিলু ও উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমরান আহমদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান ‘নৌকাডুবিতে নিহত হওয়ার খবর শোনার পর বাড়িতে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’

গত বৃহস্পতিবার (৯ মে) গভীর রাতে লিবিয়া উপকূল থেকে ৭৫ জন অভিবাসীবাহী একটি বড় নৌকা ইতালি পাড়ি জমায়। ভূমধ্যসাগরে গিয়ে নৌকাটি ডুবে গেলে প্রায় ৬০ জন অভিবাসী প্রাণ হারান। এর অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট। সংস্থাটি বলছে, গভীর সাগরে বড় নৌকা থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি নৌকায় তোলা হলে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি ডুবে যায়। এরমধ্যে ১৬ জনকে উদ্ধার করে ১১ মে শনিবার সকালে জারযিজ শহরের তীরে নিয়ে আসেন তিউনিসিয়ার জেলেরা। উদ্ধার হওয়া অভিবাসীরা জানান, সাগরের ঠাণ্ডা পানিতে প্রায় আট ঘণ্টা ভেসে ছিলেন তারা।

0Shares





Related News

Comments are Closed