মৌলভীবাজারে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। সোমবার বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পানি তেমন একটা বাড়েনি। তবে ডুবে যাওয়া রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব এলাকার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০টি স্কুল, প্রাইমারী ও মাদ্রাসা পর্যায়ে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়, কুশিয়ারা নদীর পানি কিছুটা কমলেও শেওলায় ৭২ সেন্টিমিটার ও শেরপুরে ২৪ সেন্টিমিটার বিপদ সীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ওই নদীর পানি না কমা পর্যন্ত এই তিন উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি তেমন একটা উন্নতি হবে না বলে জানা গেছে। বানবাসি মানুষদের মার্চ মাসের দূর্যোগের পর দফায় দফায় আশ্রয় কেন্দ্র সহ আক্রান্ত এলাকায় ত্রান সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়।
জানা যায়, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উজানে থেকে নেমে আসা পানিতে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বন্যা আক্রান্ত এলাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন করে উঁচু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বড়লেখা-মৌলভীবাজার সড়কের কয়েকটি স্থানে বন্যার পানিতে রাস্তা তলিয়ে গিয়ে জেলা সদরের সাথে বড়লেখা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
অনেকেই নিজ বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় জুড়ী উপজেলা পরিষদ, কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের ভেতর সহ কুলাউড়া পৌর এলাকার ৩টি ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়ন, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের কাদিপুর, নাজিরাবাদ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
বড়লেখায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। মৌলভীবাজার-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কে ঝুকি নিয়ে এতদিন ২-৪টি যানবাহন চলাচল করলেও সড়কে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। গত ৩ সপ্তাহ ধরে উপজেলার ৫ ইউনিয়নের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। ঘর-বাড়ি নিমজ্জিত হয়ে রান্নাবান্না করার মতো শুকনো কোন জায়গা না থাকায় লোকজন সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া গৃহহীন মানুষগুলো এখনও সরকারি ত্রাণ সহায়তা পায়নি। দূর্গত এলাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার তালিমপুর ও বর্নি ইউনিয়নের প্রত্যেকটি গ্রামের শতভাগ ঘরবাড়ির আঙ্গিনা, বসতঘর ২ থেকে ৫-৬ ফুট পর্যন্ত বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকতে দেখা গেছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় বাজার-হাট করাও তাদের সম্ভব হচ্ছে না। হাজার হাজার পানিবন্দী মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বন্যা দুর্গত এলাকায় এখনও সরকারী ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়নি বলে লোকজন অভিযোগ করেন। রান্না করার মতো কোন শুকনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। এরমধ্যে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সুজানগর ইউনিয়নের ছিদ্দেক আলী বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরত ভোলারকান্দি গ্রামের খেলারুন বেগম, মনোয়রা বেগম ও লালী বেগম বলেন, ১১দিন থাকিয়া ই-স্কুলে আছি। গত রাইত (রাত) আফালে (তুফানে) আমার বাড়ির ঘর, টিন আওরে (হাওরে) উড়াইয়া নিছেগি (নিয়ে গেছে) আইজ (আজ) খবর আইছে গ্রাম থাকি। হুরুতার বাবা (সন্তার বাবা) গেছইন দেখাত। খুব বেশি আফাল (তুফান) দিছে। মাইনসে (মানুষে) আইয়া কইরা সব ভাসাইয়া নেরগি। ই-খানো খানির (খাবারের) সমস্যায় আছি। আশ্রয় কেন্দ্রে এখন পর্যন্ত হুইপ সাবের ৫’শ টাকা, লুঙ্গি, সেমাই, চিনি, তেল, পিআই’র (পিআইও) ৫’শ টাকা আর ইউএন (ইউএনও) সাহেবের কিছু চিড়া, মুড়ি ছাড়া এখন পর্যন্ত সরকারি কোন সায্য (সাহায্য) পাইছি না। খুব কষ্টে আছি আমরা।’
ওই উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের ১০টি, প্রাইমারী পর্যায়ের ৩৬টি ও মাদ্রাসা পর্যায়ে ৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকেছে। কোন কোনটির মাঠ ছাড়াও স্কুলের শ্রেণী কক্ষ, অফিস রুম তলিয়ে গেছে। ৬ জুলাই থেকে অর্ধবার্ষিক ও প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণার চিন্তা ভাবনা করছে।
বড়লেখা বাস-মিনি বাস মালিক সমিতির সভাপতি ফয়জুল ইসলাম বড়লেখা-মৌলভীবাজার সড়কে বাস সার্ভিস বন্ধের সর্ম্পকে জানান, ‘ঈদের পরদিন থেকে আমরা জেলা চাঁদনীঘাট মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আনছার আলীর সাথে যোগাযোগ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা ও পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গাড়ি উল্টে যায়। এ পর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে বাস চালানো সম্ভব নয়।
ইউএনও এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতিদিনের বৃষ্টির কারণে হাওরে পানি বাড়ছে আর বসতি এলাকা নিমজ্জিত করছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে মোট ১১৫টি দুর্গত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রেগুলো পরির্দশন করেছি। বন্যা দুর্গতদের জন্য ৩৯ মেট্রিক টন জিআর চাল ও জিআর ক্যাশ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্ধ পাওয়া গেছে। এগুলো দ্রুত বিতরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া আরও বরাদ্ধের প্রাপ্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
একই ভাবে কুলাউড়া উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। ঈদের আগের দিন ২৫ জুন থেকে ফের অবনতি শুরু হয়। বর্তমানে তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ৫টি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে বানভাসি মানুষের সংখ্যা।
উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, ২৪ জুন থেকে ফের ভারী বর্ষণের ফলে আর সীমান্তের ওপার থেকে আসা ঢলে বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। ইউনিয়নের সাদিপুর, মহেষগৌরী, মদনগৌরী, কাইরচাক, কাড়েরা, জাব্দা, শশারকান্দি এলাকার ৮০ ভাগ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া। হাওর এলাকায় গত ৩ মাস থেকে গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছে মানুষ। গোখাদ্য সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মমদুদ হোসেন জানান, তার ইউনিয়নে দুটি আশ্রয় কেন্দ্রে জালালাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ছিলো ১৫টি পরিবার ২৯ জুন বৃহস্পতিবার আরও ২টি পরিবার নতুন এসেছে। শ্রীপুর মাদ্রাসা কেন্দ্রে ১২টি পরিবার ছিলো বেড়েছে নতুন ৩টি পরিবার। ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণবাজার, পূর্বগুড়াভুই, কানুপট্রি, ১নং ওয়ার্ডের শ্রীপুর ও লামাপাড়া, ৩নং ওয়ার্ডে নাছনী এবং ৭নং ওয়ার্ডের উত্তর হিঙ্গাজিয়া গ্রাম বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ।
কাদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ হাবিবুর রহমান ছালাম জানান, উচাইল হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ১৪টি ও ছকাপর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৪টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। যেভাবে পানি বাড়ছে তাতে আশ্রিতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান। ছাড়া বরমাচাল ইউনিয়নের রাউৎগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ১০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাছাড়া জয়চন্ডী ইউনিয়নে কুলাউড়া শাহবাজপুর রেললাইনে আরও ৫-৭টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
কুলাউড়া পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের দেখিয়ারপুর ও ১নং ওয়ার্ডের সোনাপুর, বিহালা ও আহমদাবাদ এলাকায় বন্যায় শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের ঘরে বন্যার পানিতে। তাছাড়া এসব এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুলগুলো বন্যা কবলিত। শনিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা। কিন্তু বন্যা কবলিত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস নেয়া সম্ভব হবে না।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বি জানান, ২২ জুন বন্যার্থ মানুষের জন্য ৪৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্ধ আসে। যেগুলো ২৯ জুন থেকে বিতরণ শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৫টি আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়া কুলাউড়া ইয়াকুব তাজুল মহিলা কলেজ ও রাবেয়া আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও দুটি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্তী জানান, বড়লেখা, কুলাউড়া ও জুড়ি উপজেলার সোনাই, জুড়ী নদী ও শতাধিক পাহাড়ি ছড়া দিয়ে হাকালুকিতে বৃষ্টির পানি নামে। এ সব ছড়া দিয়ে ভারতের পানিও নামে। আর হাকালুকি হাওরের পানি কুশিয়ারা নদী দিয়ে বের হয়। বর্তমানে কুশিয়ারা নদীর যে স্থান দিয়ে পানি নামে সেখানে বিপদ সীমার ২৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে তাই পানি বের হতে না পেরে পানিতে ফুলে ফেঁপে গিয়ে এই তিন উপজেলার গ্রামগুলো পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কুশিয়ারার পানি নেমে গেলে তখন অন্তত শহর ও শহরতলীর পানি নেমে যাবে।
Related News
মৌলভীবাজারে পানিতে ডুবে ২ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের জুড়ীতে বরশি দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে পানিতে ডুবে দুই শিশু শিক্ষার্থীরRead More
শ্রীমঙ্গলের ভুনবীর ইউনিয়নে ফলদ, ভেষজ ও বনজ বৃক্ষচারা বিতরণ
সালেহ আহমদ (স’লিপক): পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বিপ্লব জোরদারের লক্ষ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২নংRead More



Comments are Closed