Main Menu

প্রসঙ্গ: ছাত্ররাজনীতি, ছাত্র সংসদ ও আমার আক্ষেপ

মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম: ছোটবেলা থেকেই ছাত্ররাজনীতির প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ থেকে স্কুলে পড়াকালীন সময়েই সম্পৃক্ত হই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাথে। এখনও ছাত্রদলের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে সাধ্যমত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী হয়ত আরো ২/৪ বছর ছাত্র রাজনীতি করা যাবে। তারপর ইতি টানতে হবে। তবে মনের মধ্যে একটা আক্ষেপ থেকেই গেল। অনেকেই ভাবতে পারেন পদ পদবীর আক্ষেপ। না, মোটেই নয়। আমার আক্ষেপটা হচ্ছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। নিয়মিত ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে অনেক আগে। ছাত্র জীবন শেষ হয়ে গেল অথচ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দেখাই পেলাম না। নিজেকে যাচাই করার সুযোগও পেলাম না। তাহলে কিসের ছাত্ররাজনীতি করছি আমরা। রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নগণ্য কর্মী থাকলেই সমস্যা ছিল না যদি ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতাম।
যেহেতু ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই সেহেতু ক্যাম্পাসের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের দাবী-ধাওয়া নিয়ে কথা বলা কিংবা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থন লাভেরও কোন আগ্রহ নেই আজ কালকার ছাত্র নেতাদের। একারণে ছাত্র রাজনীতি হয়ে উঠেছে পাড়া-মহল­া এবং-পেশী শক্তি নির্ভর। আর এতে করে একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনগুলোও এখন মেধাশূণ্য হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব দেখা দিতে পারে।
নির্দিষ্ট সময় শেষে একটি সনদ প্রাপ্তিই উচ্চ শিক্ষার মূল লক্ষ্য নয়। উচ্চ শিক্ষা পরিপূর্ণ করার জন্য দরকার কিছু অনুষঙ্গের, যা একজন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক গুণের বিকাশ ঘটায়। আর এ অনুষঙ্গগুলোর অধিকাংশই পূরণ করে থাকে কোন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ।
ছাত্র সংসদ হল কোন প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম পরিচায়ক এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের একটি সহযোগী মঞ্চ যা শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কথা বলে, নায্য আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হারাচ্ছে যোগ্য-মেধাবী নেতৃত্ব। যারা কিনা আগামী বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে আসবে। আর ছাত্র রাজনীতি হয়ে উঠেছে নিজ দল কেন্দ্রিক রাজনীতি। বর্তমান কালে ছাত্রনেতারা তাদের দলের নেতা মাত্র-সত্যিকারের ছাত্র সমর্থনপুষ্ট ছাত্রনেতা নন।
যোগ্য, মেধাবী ও গুণগত রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বার্থে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরী হলেও দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন বন্ধ রাখা হয়েছে। ছাত্র রাজনীতিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় নতুন করে নেতৃত্ব তৈরির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ‘নেতৃত্ব তৈরির কারখানা’ এ ছাত্র সংসদকে কেন, কাদের স্বার্থে অচল করে রাখা হয়েছে?
১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে প্রকৃত ও নিয়মিত ছাত্ররা সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পার্লামেন্ট নির্বাচন তো থেমে নেই, তাহলে সারাদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেমে আছে কেন? ঠিকভাবে নির্বাচন হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতো এবং ছাত্র রাজনীতি ভাল জায়গায় যেতো। কিন্তু তা থেকে আমরা দূরে সরে আছি। আমরা লক্ষ্য করি যে, প্রতি বছরই শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হচ্ছে; নির্দিষ্ট সময়ে ডীন এবং সিনেট ও সিন্ডিকেট নির্বাচন হচ্ছে। অথচ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ছাত্র সংসদের দাবী উঠলে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদেরকে মিডিয়া প্রশ্ন করলে বলা হয়, ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে, এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটতে পারে। যেখানে সরকারগুলো তাদের শাসনে গোটা দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বড়াই করে বেড়ান, সারাদেশে সরকারি বেসরকারি বহু সমিতি, সংগঠন ও পেশাজীবি সংগঠনের নির্বাচন হচ্ছে, সেখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা উঠলেই তারা উল্টো সুর গাইতে থাকেন।
দেশের রাজনৈতিক দূরবস্থার কারণে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের হীন স্বার্থ হাসিলের পায়তারার কারণে ছোটবেলা থেকে পোষা একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু হলো। এতে যে শুধু আমাদের মত নগণ্য কর্মীর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে-এমন নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সারাদেশের ছাত্ররাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সৃষ্টিতে। কেননা ছাত্র সংসদ হচ্ছে নেতা সৃষ্টির কারখানা। যারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিপক্ষে কিংবা যাদের কারণে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে তারা আজকের এই কলুষিত ছাত্ররাজনীতির জন্য দায়ী। ক্যাম্পাসের ছাত্র-ছাত্রীদের ভোটে নেতা নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা থাকলে কথিত ছাত্রনেতারা ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকতেন। ছাত্ররাও তাদের যোগ্য প্রতিনিধি বাছাই করার সুযোগ পেত। ছাত্রনেতারা দক্ষতার সহিত আগামী দিনের নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলি অর্জন করতে পারতেন।
কিছুদিন আগে ষাটের দশকের একজন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি (যিনি সুনামগঞ্জের একটি আসন থেকে মহান জাতীয় সংসদেরও সদস্য ছিলেন এবং একাধিকবার ছাত্র সংসদের নেতা ছিলেন) আলাপচারিতার এক প্রসঙ্গে বললেন, ‘ছাত্র সংসদ ছাড়া কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা এবং ছাত্র রাজনীতির কোন মজাই নেই।’ কথাটি শুনে নিজেকে বড়ই অযোগ্য এবং হতভাগা মনে হলো।
তাই বর্তমান ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায়ের আগে দেশপ্রেমিক নেতা এবং বিশেষ করে সাবেক ছাত্রনেতা ও ছাত্র সংসদের নেতাদের প্রতি অনুরোধ- ছাত্র রাজনীতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দেশের সকল ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। মেধাবী এবং যোগ্যদেরকে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিন।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী।

Share





Related News

Comments are Closed